যুক্তরাষ্ট্রের ৩২তম প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডিলানো রুজভেল্ট মারা যান ১৯৪৫ সালের ১২ এপ্রিল। তার মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ৩৩তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুম্যান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর থেকে প্রায় পুরো সময় জুড়েই দেশটির যুদ্ধকালীন রাষ্ট্রনীতি-রণনীতি ও কূটনীতির প্রধান তত্ত্বাবধায়ক ছিলেন রুজভেল্ট। এ কাজে তাকে সহায়তা করেছেন ভাইস-প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রুম্যানের পূর্বসূরী হেনরি অ্যাগার্ড ওয়ালেস। কিন্তু বামঘেঁষা চিন্তাচেতনার কারণে ডেমোক্রেটিক পার্টির নীতিনির্ধারণী মহলে তিনি খুব একটা জনপ্রিয় ছিলেন না। এজন্য ১৯৪৪ সালের নভেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য রুজভেল্টের রানিং মেট হিসেবে হেনরি ওয়ালেসকে মনোনয়ন দেয় ডেমোক্রেটরা।
তবে ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পরও রুজভেল্টের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মার্কিন যুদ্ধপ্রয়াসে ট্রুম্যানের ভূমিকা ছিল প্রায় শূন্য। এমনকি ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেয়ার পর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে তার মাত্র দুইবার। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে চারমাসে মার্কিন সিনেটে সভাপতিত্ব করা আর বিভিন্ন পার্টিতে যোগ দেয়া ছাড়া আদতে আর কোনো কাজ ছিল না তার। কোনো কোনো সূত্রে প্রকাশিত তথ্যে এমনও দাবি করা হয়েছে যে পারমাণবিক বোমা নির্মাণের জন্য গোপনে গড়ে তোলা ম্যানহাটন প্রজেক্ট সম্পর্কে ট্রুম্যান জানতে পারেন কেবল প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর।
হিরোশিমায় নিক্ষিপ্ত পারমাণবিক বোমা লিটল বয় ছবি: সংগৃহীত
অনেকটা আকস্মিকভাবেই প্রেসিডেন্ট হয়ে পড়া হ্যারি ট্রুম্যানের সামনে তখন দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার চাপ। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধের ব্যয় বহন করাটা মুশকিল হয়ে পড়েছিল। একই সঙ্গে ইউরোপিয়ান ও প্যাসিফিক থিয়েটারে লড়াই চালাতে গিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছিল দেশটি। বিশেষ করে প্যাসিফিক থিয়েটারে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিচ্ছিন্ন দ্বীপগুলোয় একের পর এক দুর্গম দ্বীপে যুদ্ধ পরিচালনা ও বারবার ঘাঁটি বদল করতে গিয়ে ব্যাপক মাত্রায় লোকক্ষয় ও অর্থব্যয় স্বীকার করে নিতে হচ্ছিল যুক্তরাষ্ট্রকে। বিশেষ করে জাপানিদের যুদ্ধকৌশলের কারণে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেড়ে গিয়েছিল। আত্মঘাতী হামলার মধ্য দিয়ে জাপানি কামিকাজে ফাইটার প্লেনগুলো রীতিমতো গাইডেড মিসাইলে রূপ নিয়েছিল।
হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম ছবি: রয়টার্স
এর মধ্যে ২ মে তারিখে বার্লিনের দখল নেয় সোভিয়েত সৈন্যরা। এক সপ্তাহের মধ্যে আত্মসমর্পণ করে জার্মানি। এর আগে কে কত দ্রুত বার্লিনে পৌঁছে শহরটির দখল নিতে পারে, তা নিয়ে মার্কিন ও সোভিয়েত সেনাদের মধ্যে রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছিল। হিটলারকে পরাজিত করার কৃতিত্ব নিয়ে নেয় সোভিয়েত ইউনিয়ন। বার্লিন দখলের রাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের সুযোগ তৈরি করে নিতে ব্যর্থ হয় যুক্তরাষ্ট্র।
এর আগে ওই বছরের ফেব্রুয়ারিতেই ইয়াল্টা সম্মেলনে ইউরোপিয়ান থিয়েটারে যুদ্ধ শেষ হওয়ার তিন মাসের মধ্যেই সোভিয়েত ইউনিয়ন প্যাসিফিক থিয়েটারে চলমান যুদ্ধে যোগ দেবে বলে রুজভেল্ট এবং চার্চিলকে কথা দিয়েছিলেন স্তালিন। ট্রুম্যান জানতেন, সোভিয়েত ইউনিয়ন মাঞ্চুরিয়ায় জাপানের বিরুদ্ধে আগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহের শুরুর দিকে সমরাভিজান শুরু করতে যাচ্ছে। এছাড়া স্টাভকা হাইকমান্ড (সোভিয়েত সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্যায়) তখন মাঞ্চুরিয়া দখলের পর জাপানের মূল ভূখণ্ডের প্রধান চার দ্বীপের অন্যতম হোক্কাইডোয় সরাসরি অভিযান চালানোর বিষয়টিও বিবেচনা করছিল। এ অবস্থায় ট্রুম্যানের জন্যও যত দ্রুত সম্ভব যুদ্ধ শেষ করা বেশ জরুরি হয়ে পড়ছিল।
১৯৪৫ সালের ২৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও চীন একযোগে ঘোষণা করে পটসডাম ডিক্লারেশন। এতে জাপানের প্রতি নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় জাপানকে ‘চূড়ান্ত মাত্রার ধ্বংসযজ্ঞের মুখোমুখি হতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেয়া হয়।
হিরোশিমায় বোমা নিক্ষেপের অপারেশনাল অর্ডার ছবি: রয়টার্স
জাপানিরা তাতে সাড়া দেয়নি। ততদিনে জাপানিরা দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে পিছু হটে এসেছে। সম্মুখ যুদ্ধ নিজ ভূখণ্ডের যত কাছাকাছি এগিয়ে আসছিল, জাপানিদের প্রতিরোধও তত বাড়ছিল। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি থেকেই জাপানের শহরগুলোয় ‘লো অল্টিচ্যুড নাইটটাইম ফায়ারবম্বিং’ অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিল মার্কিন বিমানবাহিনী। ব্যবহার করা হচ্ছিল ইনসেনডিয়ারি বম্ব বা আগুনে বোমা। এ বোমাবর্ষণ অভিযানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুর তুলনায় জাপানের বেসামরিক জনগোষ্ঠীর ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছিল বেশি।
যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক নথির তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৪ সালের এপ্রির থেকে ১৯৪৫ সালের আগস্ট পর্যন্ত জাপানে বিমানহামলায় প্রাণহানি হয়েছে আনুমানিক ৩ লাখ ৩৩ হাজার মানুষের। আহত হয়েছে ৪ লাখ ৭৩ হাজারেরও বেশি। এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হামলাটি হয়েছিল ১৯৪৫ সালের মার্চে টোকিওতে। ওই সময় এক হামলায়ই ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষের মৃত্যু হয়।
এসব হামলা চলাকালেও ইয়ো জিমা ও ওকিনাওয়ার মতো দ্বীপগুলো দখল করতে গিয়ে জাপানিদের মারাত্মক প্রতিরোধের মুখে পড়ে মার্কিন সেনারা। এসব দ্বীপ দখল হলেও এর জন্য তাদের মূল্য দিতে হয়েছে অনেক বেশি। এর মধ্যে সেপ্টেম্বরের শুরুতে জাপান আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয়ার পরও অব্যাহত ছিল ওকিনাওয়ার প্রতিরোধ।
এমন প্রতিরোধের মুখে দ্রুত যুদ্ধ শেষ করাটা ট্রুম্যানের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। এ অবস্থায় জাপানে পারমাণবিক হামলার আদেশে অনুমোদন দেন তিনি। হামলার ক্ষয়ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞের মাত্রা মার্কিন নীতিনির্ধারকরা আগেই অনুমান করতে পেরেছিলেন। এজন্য পারমাণবিক বোমার লক্ষ্যবস্তু হিসেবে এমন কোনো শহরকে বেছে নিতে বলা হয় যেখানে তখন পর্যন্ত চালানো বিমান হামলায় ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে কম। পারমাণবিক বোমা হামলায় সর্বোচ্চ ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিতে শুরুতে এমন কয়েকটি শহরকে বেছে নেয়া হয়, যেগুলো এতদিনের হামলায় ক্ষতির শিকার হয়েছে সবচেয়ে কম। মার্কিন কর্তাব্যক্তিরা চেয়েছিলেন এ বোমা বিষ্ফোরণের মাধ্যমে জাপানকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার পাশাপাশি আসন্ন স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়নকেও যাতে আতঙ্কিত করে তোলা যায়।
প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে নির্ধারণ করা হয় হিরোশিমা, কোকুরা, নিগাতা ও নাগাসাকি শহরকে। এর মধ্যে হিরোশিমায় জাপানি সামরিক বাহিনীর একটি শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। এছাড়া শহরটিও ছিল ঘনবসতিপূর্ণ। বাদ দেয়া হয় জাপানি সংস্কৃতির অন্যতম প্রাচীন কেন্দ্র কোকুরায় বোমা না ফেলার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আর ঘনবসতিপূর্ণ শহর নিগাতা ও বাণিজ্য কেন্দ্র নাগাসাকিকে তালিকায় রেখে দেয়া হয় বিকল্প লক্ষ্য হিসেবে।
সিদ্ধান্ত হয় প্রথম বোমার বিষ্ফোরণ ঘটানো হবে হিরোশিমায়। এর পর প্রতিক্রিয়া দেখে ফেলা হবে নিগাতায়। তবে পরে খারাপ আবহাওয়ার কারণে নিগাতার পরিবর্তে নাগাসাকিতে দ্বিতীয় বোমাটির বিষ্ফোরণ ঘটানো হয়।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। মারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের তিনিয়ান ঘাঁটি থেকে থেকে হিরোশিমার উদ্দেশে উড়ে যায় একটি বি-২৯ সুপারফোর্ট্রেস বোমারু বিমান ‘এনোলা গে’, যার পাইলট কর্নেল পল ডব্লিউ টিবেটস। উদ্দেশ্য হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা ‘লিটল বয়’ নিক্ষেপ করা। ইয়ো জিমার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় সঙ্গী হয় আরো দুটি বি-২৯ সুপারফোর্ট্রেস ‘দ্য গ্রেট আর্টিস্ট’ ও ‘নেসেসারি ইভিল’। এর মধ্যে দ্য গ্রেট আর্টিস্টের মিশন ছিল বিষ্ফোরণের ব্যাপকতা পরিমাপ করা। আর নেসেসারি ইভিলের কাজ ছিল ছবি তোলা।
স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে হিরোশিমার আকাশে ভূমির ৯ হাজার ৪০০ ফুট উচ্চতা থেকে নিক্ষেপ করা হয় লিটল বয়। নিক্ষেপ করেই উড়োজাহাজের মুখ ঘুরিয়ে নেন পাইলট পল ডব্লিউ টিবেটস। বোমাটির লক্ষ্যবস্তু ছিল হিরোশিমার আইওই সেতু। যদিও তা বিষ্ফোরিত হয় ২৪০ মিটার দূরের একটি হাসপাতালের ওপর। মানবেতিহাসের বর্বরতম এক অস্ত্রের বিষ্ফোরণের প্রথম ধাক্কায়ই ধ্বংস হয়ে যাওয়া এলাকার ব্যাসার্ধ ছিল ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার।