শহরের অন্ধকার নর্দমা, রেস্তোরাঁর পেছনের গলি কিংবা খাবারের গুদাম—মানুষের বসতি যেখানে, সেখানেই ইঁদুরের উপস্থিতি। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ প্রাণীটিকে ঠেকাতে ফাঁদ পেতেছে, বিষ দিয়েছে, নানা উপায়ে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন শহরে ইঁদুরের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ফলে পুরোনো প্রশ্নটিই নতুন করে সামনে এসেছে—ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে বিষ আর ফাঁদই কি একমাত্র সমাধান?
নিউইয়র্কের রবার্ট করিগান সারা জীবন ইঁদুর নিয়েই কাজ করেছেন। রডেন্টোলজি বা ইঁদুরবিষয়ক গবেষণায় পরিচিত এ বিজ্ঞানীর কাছে ইঁদুর একই সঙ্গে আকর্ষণীয় ও বিপজ্জনক প্রাণী। তার ভাষায়, ইঁদুরের প্রতি একজন বিজ্ঞানী হিসেবে তার গভীর আগ্রহ ও সহানুভূতি রয়েছে। কিন্তু মানুষ ও ইঁদুরের একসঙ্গে বসবাস সম্ভব নয়।
গত বছর করিগানসহ ১১ বিজ্ঞানী বিশ্বের ১৬টি শহরের ইঁদুরের সংখ্যা নিয়ে একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা যায়, এসব শহরে ইঁদুরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে এ প্রবণতার সম্পর্ক রয়েছে।
শীতকালে ঠান্ডার কারণে তাদের বংশবিস্তার কমে যায়, কখনো থেমেও থাকে। কিন্তু বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের কারণে শীত আগের তুলনায় উষ্ণ হয়ে উঠছে, ফলে ইঁদুরের প্রজননের সময় ও সুযোগ দুটোই বাড়ছে। একটি পরিবারে বাড়তি কয়েকটি ইঁদুরের জন্ম হয়তো বড় কিছু মনে হয় নয়। কিন্তু লাখ লাখ ইঁদুরের ক্ষেত্রে সেই সামান্য বৃদ্ধিই শেষ পর্যন্ত বিশাল সংখ্যায় পরিণত হয়।
ইঁদুরের বাড়তি সংখ্যা শুধু নগরজীবনের বিরক্তির কারণ নয়। এসব প্রাণী নানা রোগজীবাণু বহন করতে পারে। মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হতে পারে এমন রোগের মধ্যে রয়েছে ওয়েইলস ডিজিজ ও হান্টাভাইরাস। পাশাপাশি ইঁদুর কৃষিপণ্যের ক্ষতি করে এবং বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্রে অন্য প্রাণীর ওপরও চাপ তৈরি করে।
তাই ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে প্রচলিত বিষ প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে ভাবছেন অনেক বিজ্ঞানী ও নগর কর্তৃপক্ষ। করিগানের মতে, বিষ অনেকটা সাময়িক ব্যান্ডেজের মতো—সমস্যার মূল কারণ দূর করে না। বরং বিষ প্রয়োগে ইঁদুরের পাশাপাশি অন্য বন্যপ্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। মানুষের অনিচ্ছাকৃত বিষক্রিয়ার ঘটনাও ঘটে।
এর বিকল্প হিসেবে আলোচনায় এসেছে জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা। ইঁদুরের প্রজনন কমিয়ে ধীরে ধীরে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের এ পদ্ধতি যুক্তরাষ্ট্রে আগ্রহ তৈরি করেছে। ইউরোপেও প্রযুক্তিটি নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। তবে এ পদ্ধতি এখনো পুরোপুরি কার্যকর ও বাস্তবসম্মত কিনা, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে কানাডার আলবার্টা প্রদেশ একটি ব্যতিক্রমী উদাহরণ। ১৯৫০ সাল থেকে সেখানে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত কর্মসূচি চলছে। সীমান্ত এলাকায় ইঁদুর শনাক্ত হওয়ার পর সরকার শুধু বিষ বা ফাঁদের ওপর নির্ভর করেনি; নাগরিকদেরও এ উদ্যোগের অংশ করেছে। নিজ সম্পত্তিতে ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ ও ইঁদুরের উপস্থিতি কর্তৃপক্ষকে জানানোর জন্য আইন করা হয়। পাশাপাশি চালু হয় ব্যাপক জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি।
তবে গবেষকরা বলছেন, ইঁদুরের সমস্যা অনেকাংশে নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। একটি বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানের অপরিচ্ছন্নতা পুরো এলাকার জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারে। তাই ব্যক্তিগত সচেতনতার পাশাপাশি কঠোর স্যানিটেশন আইন ও কার্যকর নজরদারি জরুরি।
দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে