একজন মানুষকে ঘিরে প্রথমে পাঁচজন দাঁড়াল। তারপর দশজন। কেউ বলল, সে চোর। কেউ বলল, সে অপরাধী। আরেকজন দাবি করল, ‘আমি নিজ চোখে দেখেছি।’ সত্যিই সে দেখেছে কিনা, কেউ জানতে চাইল না। কয়েক মিনিটের মধ্যে আগুনের স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ল কথাগুলো। সন্দেহ পরিণত হলো বিশ্বাসে, আর বিশ্বাস পরিণত হলো ক্রোধে। আর তারপর?
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে ‘লিঞ্চিং’ শব্দটির প্রাথমিক ব্যবহারও ছিল এক ধরনের তথাকথিত ‘পপুলার জাস্টিস’-এর সঙ্গে যুক্ত। ঊনিশ শতকের প্রথম দিকে পশ্চিমাঞ্চলের কিছু এলাকায় সরকার ও আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় স্থানীয়রা চোর, প্রতারক বা অপরাধী সন্দেহে মানুষকে শাস্তি দিত। পরবর্তীকালে বিশেষ করে গৃহযুদ্ধের পর লিঞ্চিং ভয়াবহভাবে রূপ নেয় এবং কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত সন্ত্রাস ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্য বজায় রাখার একটি হাতিয়ারে পরিণত হয়। ইকুয়াল জাস্রটিস ইনিসিয়েটিভের গবেষণা অনুযায়ী, ১৮৬৫ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার ‘রেসিয়াল টেরর লিঞ্চিং’ নথিভুক্ত হয়েছে। তাই মবের জনক আধুনিক সোশ্যাল মিডিয়া নয়। এই কালচার বহু বছর ধরেই মানব ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে।
মবের জ্বালানি আসলে রাগ নয়, গুজব
মবের জন্য ঘটনার সত্যতা প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন হয় একটি বিশ্বাস। ‘ও চোর’, ‘ও শিশু অপহরণকারী’, ‘ও আমাদের শত্রু’। এই দাবিগুলোর সত্যতা যাচাই হওয়ার আগেই যদি মানুষ বিশ্বাস করে নেয়, তখন প্রমাণ আর সিদ্ধান্তের মধ্যে ব্যবধান থাকে না।
আধুনিক রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থা গড়ে ওঠার আগেও মানুষ সন্দেহভাজন অপরাধীকে দলবদ্ধভাবে শাস্তি দিয়েছে। কিন্তু পুরোনো মবের একটি সীমাবদ্ধতা ছিল। তাকে মানুষের কাছে পৌঁছাতে হতো পায়ে হেঁটে। একটি গুজব ছড়াতে সময় লাগত। মানুষকে ঘটনাস্থলে যেতে হতো। ভিড়কে শারীরিকভাবে জড়ো হতে হতো। আজ সেই বাধা নেই। একটি পোস্ট। একটি ছবি। কয়েকটি শেয়ার। তারপর হাজার হাজার মানুষ একই অভিযোগ জানতে পারে—অনেক সময় ঘটনাটি সত্য কিনা, সেটি জানার আগেই।
আগে বিষয়টি ছিল— গুজব → মানুষ জড়ো হওয়া → মব। আর এখন, গুজব → পোস্ট → ভাইরাল ক্ষোভ → ডিজিটাল মব → বাস্তব মব।
স্ক্রিনের ভিড়ও কি মব?
একজনের ছবি ছড়িয়ে দেয়া হলো। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ লেখা হলো। কমেন্টে শুরু হলো বিচার— ‘শাস্তি চাই’, ‘ওকে ধরো’, ‘ওকে ছাড়বে না’। কেউ ঘটনাস্থলে নেই। কেউ পুরো ঘটনা জানে না। তবু সবাই জানে, কে অপরাধী। এটাই ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় বিড়ম্বনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিসইনফরমেশন দ্রুত ছড়ানোর পাশাপাশি মানুষের 'গ্রুপ আইডেন্টিটি' ও 'কালেক্টিভ ইমোশন' ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে একত্রিত হতে পারে। ফলে একজন মানুষকে আক্রমণ করতে আজ সবাইকে একই জায়গায় থাকতে হয় না। অনেকগুলো মানুষের একটা গুজবে বিশ্বাস করাই যথেষ্ট।
মবে বিক্ষুদ্ধ ও প্রতিবাদীর দ্বৈরথ
ভিড়ের মধ্যে কেউ কেউ আঘাত করছে। কেউ চিৎকার করছে। আর বাকিরা দাঁড়িয়ে দেখছে। কেউ ভাবছে, অন্য কেউ থামাবে। কেউ ভাবছে, নিশ্চয়ই লোকটি অপরাধী। কেউ প্রতিবাদ করতে চাইলেও একা দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছে। আর কেউ ফোন বের করে ভিডিও করছে। এই দর্শকরাও কিন্তু মবের অংশ। কারণ মৌনতাও সম্মতির লক্ষণ। এই ডিজিটাল যুগে সেই নীরবতারও নতুন রূপ আছে, একজনকে আক্রমণ করা হচ্ছে, আর হাজার মানুষ সেটি দেখছে, শেয়ার করছে, মন্তব্য করছে। একবার ভাবুন তো, একজন মানুষকে একটি ভিড় অমানবিক নির্যাতন করছে। আশেপাশে যারা দর্শক হিসেবে দাঁড়িয়ে দেখছেন, তারা সবাই মিলে যদি বলতে পারেন, ‘এটা অন্যায়, সে অপরাধী হলে তাকে আইনের হাতে তুলে দেয়া হোক’ এই একটি লাইন কি একটা মানুষের জীবন বাঁচাতে পারে না? হয়তো পারে।
মবের প্রভাব ছোট নয়
মব ভায়োলেন্সের ক্ষত শুধু যে মানুষটি আক্রান্ত হয় তার শরীরেই থাকে না, ছড়িয়ে পড়ে প্রত্যক্ষদর্শীদের মনেও। বিশেষ করে শিশু বা সংবেদনশীল মানুষ যদি চোখের সামনে কাউকে নির্মমভাবে মারধর, রক্তাক্ত কিংবা নিহত হতে দেখে, সেই দৃশ্য তার মনে গভীর ভয়, অসহায়ত্ব ও নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। শিশুর কাছে পৃথিবী সাধারণত নিরাপদ থাকার কথা— কিন্তু এমন একটি দৃশ্য সেই বিশ্বাসে ফাটল ধরাতে পারে। পরে দুঃস্বপ্ন, উদ্বেগ, হঠাৎ আতঙ্ক, মানুষের প্রতি অবিশ্বাস কিংবা সহিংস দৃশ্য দেখলেই তীব্র অস্বস্তির মতো প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। আরো ভয়ংকর হলো, বারবার এমন দৃশ্য দেখতে দেখতে মানুষ সহিংসতার প্রতি অসংবেদনশীল হয়ে ওঠে। অন্যের কষ্ট আর আগের মতো নাড়া দেয় না। ফলে মব ভায়োলেন্স একজন মানুষকে শুধু আঘাত করে না; একটি সমাজের নিরাপত্তাবোধ, একজন মানুষের মানবিক সংবেদনশীলতা এবং একটি সম্মিলিত আস্থাকেও ধ্বংস করে দেয়।