কোকা-কোলার সঙ্গে টক্কর দিয়ে পেরুতে যেভাবে ঘটল ইনকা কোলার উত্থান

পেরুর বহু জাতি ও সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে ‘আমাদের স্বাদ যা আমাদের একত্র করে’–এর মতো স্লোগান দিয়ে ইনকা কোলা দেশবাসীর হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। পেরুর পপুলার মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেস মাকারা-শভিলি বলেন, ‘ইনকা কোলাই প্রথম যারা পেরুভিয়ান পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পেরেছিল।‘

বিশ্বের খুব কম দেশই আছে যেখানে কোকা-কোলা সবচেয়ে জনপ্রিয় কোমল পানীয় নয়। পেরু সেই দুর্লভ দেশগুলোর একটি। সেখানে কোকা-কোলার জায়গা ধরে রেখেছে প্রায় ১০০ বছরের পুরনো একটি স্থানীয় পানীয়— ইনকা কোলা। সোনালি-হলুদ রংয়ের এই সোডা পানীয়টি পেরুর জাতিগত গর্ব ও ঐতিহ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

ইংল্যান্ডের ডনকাস্টার শহরের কয়লাখনি থেকে ১৯১০ সালে পেরু আসা ব্রিটিশ অভিবাসী জোসেফ রবিনসন লিন্ডলি মূলত লিমার কর্মজীবী অঞ্চলে একটি পানীয় কারখানা স্থাপন করেন। ছোট আকারে বিভিন্ন ফ্লেভারের কার্বোনেটেড ফলমূলের স্বাদের পানীয় উৎপাদন করে তিনি ধীরে ধীরে ব্যবসাটি বড় করেন। ১৯৩৫ সালে লিন্ডলি তৈরি করেন ইনকা কোলার গোপন রেসিপি—যেখানে ছিল ১৩ প্রকার মশলা এবং সুগন্ধী উপাদানের মিশ্রণ। কোকা-কোলার পেরুতে আসার এক বছর আগের ঘটনা এটি।

পেরুর বহু জাতি ও সংস্কৃতিকে কাজে লাগিয়ে টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে ‘আমাদের স্বাদ যা আমাদের একত্র করে’–এর মতো স্লোগান দিয়ে ইনকা কোলা দেশবাসীর হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। পেরুর পপুলার মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ আন্দ্রেস মাকারা-শভিলি বলেন, ‘ইনকা কোলাই প্রথম যারা পেরুভিয়ান পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হতে পেরেছিল।‘

১৯০০ সালের গোড়ার দিকে জাপান থেকে প্রায় ১৮ হাজার শ্রমিক পেরুতে চলে আসে। কষ্টসাধ্য কাজ করতে হতো তাদের, থাকতে হতো ভয়াবহ পরিবেশে। চার বছরের চুক্তি শেষে দেশে ফেরার পথ না পেয়ে শহরে বসবাস শুরু করে তারা। ব্যবসায়ী হিসেবে তারা মূলত ‘বোডেগা’ নামে ক্ষুদ্র মুদি দোকান চালাতে লাগল, যেখানে খুবই জনপ্রিয় ছিল ইনকা কোলা।

বিশ্বযুদ্ধের সময় কোকা-কোলা তার বিশ্বব্যাপী বাজারকে প্রসারিত করার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনীর ঘাঁটিতে ৯৫% পানীয় সরবরাহের চুক্তি পায় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রের’ প্রতীক হয়ে ওঠে। কিন্তু ১৯৪১ সালে পেরুতে জাপানিদের প্রতি বৈরিতা বৃদ্ধি পাওয়ায় কোকা-কোলা তাদের দোকানে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।

এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ইনকা কোলা জাপানি মালিকানাধীন দোকানগুলোতে প্রবেশ করে। যুদ্ধকালীন এই পরিস্থিতি ইনকা কোলার বাজারে আধিপত্য প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে এবং জাপানি-পেরুভিয়ান সম্প্রদায়ের সঙ্গে ব্র্যান্ডের একটি শক্তিশালী সংযোগ তৈরি হয়।

লিমার প্রধান চত্বরের কাছে দুপুরের খাবারের সময় ইনকা কোলা পান করছেন একজন খাবার বিক্রেতা। ছবি- আল জাজিরা

দীর্ঘদিন কোকা-কোলার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা চালিয়ে দেশজুড়ে জনপ্রিয়তা বজায় রাখে ইনকা কোলা। তবে ১৯৯৯ সালে অর্থনৈতিক সংকটে লিন্ডলি পরিবার তাদের কোম্পানির ৫০% শেয়ার ২ কোটি ডলারে কোকা-কোলাকে বিক্রি করে।

মাকারা-শভিলি বলেন, ‘তখন অনেক পেরুভিয়ানের কাছে এটিকে ভুল সিদ্ধান্ত মনে হয়েছিল। তবে এখন সেটা অতীত। ব্র্যান্ডটির স্থানীয় গুরুত্ব বুঝে লিন্ডলি করপোরেশনকে দেশীয় মালিকানা ও বিতরণ অধিকার রাখতে দেয় কোকা-কোলা। ফলে ইনকা কোলা আজও পেরুর মানুষের জীবনে ও সংস্কৃতিতে গভীরভাবে বেঁচে আছে।

লিমার ঐতিহাসিক কেন্দ্রের একটি মুদি দোকানের বাইরে ৩৫ বছর বয়সী ট্যাটু শিল্পী জোসেল লুইস হুয়ামানি তিন বন্ধুর জন্য একটি বড় বোতল ইনকা কোলা ঢালতে ঢালতে বলেন, ‘আমরা এর স্বাদের সঙ্গে এতটাই অভ্যস্ত যে, এটি আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। ইনকার মতোই এটা আমাদের ঐতিহ্য।‘

পাহাড়ি অঞ্চলের চাঞ্চামায়োর আদিবাসী সম্প্রদায়ের ২৪ বছর বয়সী সানাকি সামানিয়েগো খাবারের সঙ্গে ইনকা কোলা পান করে বললেন, ‘এটা যেন পুরনো বন্ধুর মতো।‘


আল জাজিরা অবলম্বনে

আরও