সঞ্জীব চৌধুরীর দ্বৈত জীবন

তার ব্যাগে দুটি খাতা থাকত— একটিতে সংবাদ সংক্রান্ত নোট, অন্যটিতে অসমাপ্ত গানের লাইন। কখনো কখনো উভয়ই একসঙ্গে মিলেমিশে যেত, ঠিক যেভাবে জীবন ও শিল্প একে অপরকে ছোঁয়।

শীতের সন্ধ্যাগুলোয় ঢাকা যখন ধীরে ধীরে শান্ত হয়ে আসে, তখনও একটি কণ্ঠ মানুষের হৃদয়ে আজও নাড়া দেয়। মনে হয়, সেই পরিচিত কণ্ঠটি যেন এই শহরের বাতাসে ভেসে বেড়ায়। সেই কণ্ঠস্বরটিই সঞ্জীব চৌধুরীর।

সঞ্জীব চৌধুরী শুধু একজন প্রতিভাবান সংগীতশিল্পী ছিলেন না। তিনি সাংবাদিক, শিক্ষক, মেন্টর এবং চিন্তাবিদও ছিলেন। তার জীবনরেখা বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক মানচিত্রে বিরল। সাংবাদিকতার কঠোরতা এবং সংগীতের সংবেদনশীলতাকে একসঙ্গে বহন করেছিলেন তিনি, এবং কখনোই এ দুই ধারার মধ্যে কোনো প্রতিকূলতা তৈরি হতে দেননি।

২৫ ডিসেম্বর, ১৯৬৪। শীতের কুয়াশায় ঘেরা সময়ে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার মাকালকান্দিতে জন্ম নেন সঞ্জীব চৌধুরী। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি সপ্তম। তার পারিবারিক পরিবেশ ছিল আড্ডা, হাসি-ঠাট্টা, বিতর্ক আর সঙ্গীতের সুরে পূর্ণ। ছোটবেলাতেই তিনি ভীষণ মনোযোগী, পর্যবেক্ষক এবং মানুষের আচরণ গভীরভাবে বোঝার অভ্যাসে গড়ে ওঠেন।

ঢাকায় এসে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে শিক্ষাজীবন, রাজনীতি এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জড়িয়ে ছিল অবিচ্ছেদ্যভাবে। ছাত্রজীবনে তিনি বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নে যুক্ত হন এবং পরে সাংস্কৃতিক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নেন। সভা-সমাবেশে গান শেখানো, অনুষ্ঠান আয়োজন এবং প্রতিবাদের সুর তুলে ধরা—সবকিছুই তার স্বাভাবিক প্রকাশভঙ্গি হয়ে ওঠে। তিনি কখনও স্লোগান দিতেন না; স্লোগান গাইতেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শেষ হওয়ার পর সঞ্জীবের দ্বিতীয় ঠিকানা হয়ে ওঠে সংবাদপত্র। তিনি কাজ করেছেন আজকের কাগজ, ভোরের কাগজ, যায়যায়দিন, এবং পরে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ইটিভি-তে। সব জায়গায় তিনি ছিলেন এক নিরলস সাংবাদিক, যার কাজের মূল বৈশিষ্ট্য ছিল মানুষের জীবন এবং তাদের গল্পের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা।

তিনি সম্পাদনা করেছেন একাধিক জনপ্রিয় পাঠক-সম্পৃক্ত পাতা— ‘ইস্টিকুটুম’ এবং ‘পাঠক ফোরাম’; যেখানে সাধারণ মানুষকে লেখা, প্রশ্ন করা এবং অংশগ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা হতো। সে সময়কার তরুণ সাংবাদিকরা মনে করেন, তিনি প্রতিটি লেখাকে—এমনকি মাত্র পাঁচ লাইনের চিঠিকেও একই গুরুত্ব দিতেন, যেমনটি তিনি ফ্রন্ট-পেজের বড় ফিচারের ক্ষেত্রে দিতেন। সংগীতে খ্যাতি পাওয়া সত্ত্বেও সাংবাদিকতা তিনি ছাড়েননি। তিনি বলতেন, 'সংগীত আমাকে ডানা দেয়, সাংবাদিকতা আমাকে মাটিতে নামিয়ে রাখে।' নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি ঢাকার সংগীতাঙ্গনে সঞ্জীবের পরিচয় হয় বাপ্পা মজুমদারের সঙ্গে। সেই মুহূর্তে জন্ম নেয় ব্যান্ড 'দলছুট'।

দলছুটের প্রথম অ্যালবাম ‘আহ্’ (১৯৯৭) বাংলা ব্যান্ডসংগীতের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে। সঞ্জীবের কণ্ঠ সরল, কিন্তু গভীর আন্তরিকতায় ভরা। শ্রোতারা বিশ্বাস করত, এই গান তাদেরই কথা বলছে, এই গান তাদের জীবনের অনুভূতিকে স্পর্শ করছে।

পরবর্তী অ্যালবামগুলো—‘হৃদয়পুর (২০০০)’, ‘আকাশ চুরি (২০০২)’, ‘জোছনা বিহার (২০০৭)’—দলছুটকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় করে তোলে। সঞ্জীবের লেখা গানে শহরের একাকিত্ব, স্মৃতি, হারানো সময়, প্রেম—এই সব অনুভূতি শ্রোতাদের এক গভীর নস্টালজিয়ার ভেতরে নিয়ে যায়।

সংবাদকর্মী হিসেবে মানুষের গল্পের অভিজ্ঞতা তার গানের ভাষাকে আরো মানবিক এবং বাস্তবধর্মী করেছে। দিনভর তিনি রাস্তাঘাটে মানুষদের গল্প শুনতেন, আর সেই গল্পগুলো রাতের অন্ধকারে গান হয়ে উঠত, যা তার শিল্পকে জীবন্ত করে রেখেছে।

তার কাছে সাংবাদিকতা এবং সংগীত আলাদা দুটি জগত ছিল না। এটি ছিল দুটি প্রকাশভঙ্গি, একই অন্তরের ভিন্ন রূপ। সাংবাদিকতা তাকে শিখিয়েছে সত্য এবং দায়িত্বের মূল্য, সংগীত তাকে দিয়েছে অনুভূতির স্বাধীনতা এবং মানবিক সংবেদন।

তার ব্যাগে দুটি খাতা থাকত— একটিতে সংবাদ সংক্রান্ত নোট, অন্যটিতে অসমাপ্ত গানের লাইন। কখনো কখনো উভয়ই একসঙ্গে মিলেমিশে যেত, ঠিক যেভাবে জীবন ও শিল্প একে অপরকে ছোঁয়।

২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় সঞ্জীবের একক অ্যালবাম ‘স্বপ্নবাজি’, যা ছিল ব্যক্তিগত ও এক গভীর অভিব্যক্তি। ২০০৭ সালে দলছুটের ‘জোছনা বিহার’ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়। কিন্তু অ্যালবাম প্রকাশের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পর, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর, হঠাৎ তিনি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণে আক্রান্ত হন।

দু'দিন পর, ১৯ নভেম্বর, তিনি চলে যান মাত্র ৪২ বছর বয়সে। শেষ ইচ্ছা হিসেবে তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজে দেহ দান করেন, যা গবেষণা এবং সমাজের প্রতি তার দায়িত্বের নিখুঁত উদাহরণ।

সঞ্জীব চলে গেছেন, কিন্তু তার জীবন অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে আছে। ঢাবির টিএসসিতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় ‘সঞ্জীব উৎসব’, এবং তার স্মৃতিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ‘সঞ্জীব চৌধুরী বৃত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ২০২৪ সালে দলছুট প্রকাশ করে তার স্মরণে অ্যালবাম ‘সঞ্জীব। শিক্ষক, সাংবাদিক ও সংগীতশিল্পীরা তাকে স্মরণ করেন 'সত্য ও সংবেদনশীলতার এক অনন্য আদর্শ' হিসেবে।

আরও