যুদ্ধের বিভীষিকা শেষ হলেও কম্বোডিয়ার মাটিতে এখনো রয়ে গেছে লাখ লাখ মাইন। আর এ মরণফাঁদ থেকে মানুষকে বাঁচাতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছে এক খুদে হিরো। ইঁদুরটির নাম ‘মাগাওয়া’।
আফ্রিকান এ ইঁদুরটি তার ৫ বছরের ক্যারিয়ারে ১০০টিরও বেশি ল্যান্ডমাইন ও বিস্ফোরক শনাক্ত করে হাজারো মানুষের প্রাণ বাঁচিয়েছে। মাগাওয়ার এ বীরত্বের সম্মানে কম্বোডিয়ার সিয়াম রিপ শহরে তার একটি পাথরের ভাস্কর্য উন্মোচন করা হয়েছে। গত ৪ এপ্রিল ‘আন্তর্জাতিক মাইন সচেতনতা দিবস’ উপলক্ষে বিশেষ এ ভাস্কর্যটি উন্মোচন করা হয়।
বেলজিয়ামের দাতব্য সংস্থা ‘আপোপো’র অধীনে মাগাওয়ার জন্ম ও প্রশিক্ষণ হয়েছিল। ২০১৬ সালে সে তার ক্যারিয়ার শুরু করে। নিজের ঘ্রাণশক্তি কাজে লাগিয়ে বিস্ফোরকের রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করার অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার। টেনিস কোর্টের সমান একটি এলাকা তল্লাশি করতে একজন মানুষের কয়েক দিন সময় লাগলেও মাগাওয়া সেটি মাত্র ২০ মিনিটে করতে সক্ষম ছিল। ওজন কম হওয়ায় তার পায়ের চাপে মাইন বিস্ফোরণের ভয় ছিল না। তার অক্লান্ত পরিশ্রমে প্রায় ১ লাখ ৪১ হাজার বর্গমিটার এলাকা মাইনমুক্ত করা সম্ভব হয়েছে, যা প্রায় ২০টি ফুটবল মাঠের সমান।
২০২০ সালে অসামান্য অবদানের জন্য মাগাওয়াকে স্বর্ণপদক দেয়া হয়। এটি ছিল প্রাণীদের জন্য সর্বোচ্চ সম্মানগুলোর একটি। এই প্রথমবার কোনো ইঁদুর এমন স্বীকৃতি পেয়েছিল। পরে বয়সের কারণে কাজ কমিয়ে আনার পর ২০২২ সালে মাগাওয়ার মৃত্যু হয়।
পিডিএসএর স্বর্ণপদক পরা অবস্থায় মাগাওয়া, যা প্রাণীদের জন্য জর্জ ক্রসের সমতুল্য সম্মান হিসেবে পরিচিত।
আপোপোর কম্বোডিয়া প্রোগ্রাম ম্যানেজার মাইকেল রেইন বলেন, এ ভাস্কর্য বিশ্ববাসীকে মনে করিয়ে দেয় যে কম্বোডিয়াকে মাইনমুক্ত করার কাজ এখনো শেষ হয়নি। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটিকে পুরোপুরি মাইনমুক্ত করার লক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
এদিকে মাগাওয়ার পথ ধরেই এখন কাজ করছে আরো অনেক প্রশিক্ষিত ইঁদুর। তাদেরই একজন রোনিন। এরই মধ্যে সে নতুন রেকর্ড গড়ে আরো বেশি মাইন শনাক্ত করেছে। ২০২১ সাল থেকে কাজ শুরু করে রোনিন এ পর্যন্ত ১০৯টি ল্যান্ডমাইন ও ১৫টি অবিস্ফোরিত বোমা খুঁজে বের করেছে। বর্তমানে কম্বোডিয়ার উত্তর প্রীয়াহ ভিহিয়ার প্রদেশে সে মানুষের প্রাণ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। বিশেষ এ ইঁদুরগুলো শুধু মাইন নয়, যক্ষ্মা রোগ শনাক্ত করতে ও বন্যপ্রাণী পাচার রোধেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কম্বোডিয়ার লাখ লাখ মানুষ এখনো মাইন আতঙ্কে বসবাস করে। মাগাওয়া বা রোনিনের মতো এ ‘হিরো র্যাট’ বা বীর ইঁদুরগুলো তাদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে এসেছে। সিয়াম রিপের এ ভাস্কর্যটি কেবল একটি ইঁদুরের প্রতিচ্ছবি নয়, বরং এটি নিঃস্বার্থ সেবার এক অনন্য প্রতীক।
—বিবিসি থেকে তথ্য ও ছবি নেয়া