স্যামুয়েল ব্যাকেটের ‘ওয়েটিং ফর গডো’ তার চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের কারণে সবসময় সমসাময়িক। এটি যেন ঢাকার জীবন। এ শহরের মানুষ একই রকম ব্যস্ততা, অনিশ্চয়তা, প্রত্যাশা ও অপেক্ষার মধ্য দিয়ে দিন পার করেন।
ঢাকার গড়পরতা জীবন কেমন? ঘুম থেকে উঠে কাজে বের হওয়া, যানজট পেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো, আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলানো, ভবিষ্যতের জন্য কিছু করার চেষ্টা, সন্ধ্যায় ক্লান্ত শরীরে ঘরে ফেরা আবার পরদিন একই জীবন শুরু করা। এ পুনরাবৃত্তির মধ্যেই মানুষ জীবনের মানে, নিরাপত্তা ও মুক্তির সম্ভাবনা খুঁজে বেড়ায়।
ব্যাকেটের নাটকে ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগন একটি গাছের পাশে গডোর জন্য অপেক্ষা করে। তারা গডো সম্পর্কে খুব বেশি নিশ্চিত কিছু জানে না। কখন সে আসবে, আদৌ আসবে কিনা, কিংবা তার আগমনে কী ঘটবে সবই অনিশ্চিত।
ঢাকার মানুষের অপেক্ষা অবশ্য গডোর অপেক্ষার মতো আক্ষরিক নয়। এখানে মানুষ সাধারণত জানে সে কিসের জন্য অপেক্ষা করছে। অপেক্ষা করে ভালো চাকরি, ঋণমুক্তি, সন্তানের ভবিষ্যৎ, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা কিংবা একটু স্বস্তির জীবন। কিন্তু এসব প্রত্যাশার কোনোটিই চূড়ান্ত নয়। একটি অর্জনের পর আরেকটি প্রয়োজন এসে দাঁড়ায়। ফলে জীবনের কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ ক্রমাগত সামনে সরে যায়।
ঢাকার জীবনকে বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়— এখানে মানুষ সবসময় কোথাও যাচ্ছে। রাস্তায় ভিড়, বাসের জন্য অপেক্ষা, যানজটে আটকে থাকা গাড়ি, ফুটপাতে ছুটে চলা পথচারী, অফিসে যাওয়ার তাড়া সবকিছুতেই গতি। কিন্তু এ দৃশ্যমান গতির ভেতরে ব্যক্তিমানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন ঘটছে, তা আলাদা প্রশ্ন। একই পথে যাতায়াত, একই কাজ, একই সমস্যা এবং একই ভবিষ্যতের স্বপ্ন এসবের মধ্যে জীবন কখনো কখনো এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে একই জায়গায় ঘুরপাক খাওয়ার মতো মনে হয়। ব্যাকেটের চরিত্ররা অপেক্ষা করতে করতে যেমন সময় পার করে, ঢাকার মানুষও কখনো ব্যস্ততার মধ্যেই এক দীর্ঘ অপেক্ষার জীবন যাপন করে।
তবে এ অপেক্ষা সম্পূর্ণ নিষ্ফল নয়। একজন তরুণ চাকরি খোঁজে, কারণ চাকরি পেলে তার জীবন কিছুটা স্থির হবে। চাকরিজীবী পদোন্নতির অপেক্ষায় থাকে, কেউ বাড়ির জন্য সঞ্চয় করে, কেউ সন্তানের শিক্ষার জন্য অতিরিক্ত কাজ করে, কেউ বিদেশে যাওয়ার সুযোগের অপেক্ষায় থাকে। এসব অপেক্ষার পেছনে বাস্তব কারণ ও সম্ভাবনা আছে। কিন্তু প্রত্যাশিত অর্জন এলেও সব অনিশ্চয়তা দূর হয় না; নতুন প্রয়োজন, ভয় কিংবা লক্ষ্য সামনে এসে দাঁড়ায়। কিন্তু সে মুক্তি পায় না। সবসময় ভবিষ্যতের প্রত্যাশা তার বর্তমান জীবনকে চালিত করে।
এ প্রত্যাশার সঙ্গে স্বাধীনতার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। ব্যাকেটের নাটকে ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগন চলে যেতে চায়, কিন্তু শেষ পর্যন্ত যায় না। ঢাকার মানুষের জীবনেও এমন দ্বন্দ্ব দেখা যায়। কেউ চাকরি বদলাতে চায়, কিন্তু সংসারের খরচ তাকে আটকে রাখে। কেউ শহর ছেড়ে যেতে চায়, কিন্তু জীবিকা বা পরিবারের প্রয়োজন তাকে ফিরিয়ে আনে। কেউ নিজের পছন্দের কাজ করতে চায়, কিন্তু অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য অন্য কাজ করে যেতে হয়। মানুষের স্বাধীনতা পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়; তবে অর্থ, পরিবার, সামাজিক অবস্থান ও ভবিষ্যতের ভয় তার সিদ্ধান্তকে সীমাবদ্ধ করে।
এ পুনরাবৃত্তির মধ্যে একই অভ্যাস তার কাছে আশ্রয় ও কারাগার হয়ে ওঠে। প্রতিদিনের নির্দিষ্ট কাজ মানুষকে জীবন সামলাতে সাহায্য করে, কিন্তু একই অভ্যাস তাকে এমন এক জীবনেও আটকে রাখতে পারে, যেটি সে আর নিজের বলে অনুভব করে না। সে কাজ করে, কারণ কাজ করতে হয়; আয় করে, কারণ খরচ আছে; যাতায়াত করে, কারণ গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। তখন প্রশ্ন জাগে, সে কি নিজের জীবন পরিচালনা করছে, নাকি জীবনযাপনের প্রয়োজনগুলো তাকে পরিচালনা করছে? একটা নির্দিষ্ট কাজের পর অন্যকিছুর অপেক্ষা। একই বৃত্তে বারবার ঘুরপাক খাওয়া। কিন্তু চূড়ান্ত ভাবে অপেক্ষার শেষ না হওয়া। এখানেই ব্যাকেটের নাটকের সঙ্গে ঢাকার জীবনের একটি গভীর সাদৃশ্য তৈরি হয়।
তবে দুই অভিজ্ঞতাকে এক করে দেখা ঠিক হবে না। ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগনের অপেক্ষায় গডোর আগমনই অনিশ্চিত। ঢাকার মানুষের অপেক্ষার পেছনে থাকে বাস্তব সম্ভাবনা ও পরিশ্রম। অপেক্ষা অনেক সময় ফল তৈরি করতে পারে। কিন্তু কোনো অর্জনই জীবনের সব প্রশ্নের সমাধান করে না।
শহরের মানুষের সম্পর্ক এ অপেক্ষার জীবনকে অর্থও দেয়। ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগনের সম্পর্ক বিরক্তি, নির্ভরতা, বিচ্ছেদের ইচ্ছা ও আবার একসঙ্গে থেকে যাওয়ার টানাপোড়েনে তৈরি। ঢাকার মানুষও পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী ও প্রিয়জনের সঙ্গে সম্পর্কের মধ্য দিয়ে জীবনকে টিকিয়ে রাখে। প্রতিদিনের ক্লান্তি ভাগ করে নেয়া, একসঙ্গে চা খাওয়া, কোনো সমস্যায় সাহায্য করা কিংবা দিনের শেষে কারো সঙ্গে কথা বলা এসব ছোট ঘটনা জীবনের অর্থ তৈরি করে। কিন্তু ভিড়ের মধ্যেও একাকিত্ব থাকে। অসংখ্য মানুষের সংস্পর্শে থেকেও একজন মানুষ নিজের ভয়, হতাশা, ব্যর্থতা কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ একাই বহন করতে পারে।
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এ অস্তিত্বগত প্রশ্নকে আরো তীব্র করে। বাড়িভাড়া, বাজারদর, চিকিৎসা, শিক্ষার খরচ, যাতায়াত ও চাকরির নিরাপত্তা মানুষের চিন্তা ও সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে চাইলেও বর্তমানের খরচ তাকে ব্যস্ত রাখে। কেউ নিজের পছন্দের কাজ করতে চাইলেও জীবিকার প্রয়োজন তাকে অন্য পথে নিয়ে যায়। বেকেটের নাটকের চরিত্রদের ক্ষুধা, ক্লান্তি ও শরীরের কষ্ট যেমন তাদের অস্তিত্বের অভিজ্ঞতার অংশ, তেমনি ঢাকার মানুষের অর্থনৈতিক ও শারীরিক বাস্তবতাও তার অস্তিত্বের প্রশ্নকে প্রভাবিত করে।
ব্যাকেটের নাটকের শেষ দৃশ্যে ভ্লাদিমির ও এস্ট্রাগন চলে যাওয়ার কথা বলে, কিন্তু নড়ে না। ঢাকার মানুষের জীবনেও এমন মুহূর্ত আসে, যখন সে জানে বর্তমান পরিস্থিতি বদলানো প্রয়োজন, কিন্তু বাস্তবে বদল আনতে পারে না। তবে ঢাকার মানুষ সবসময় স্থবির থাকে না। কেউ চাকরি বদলায়, কেউ নতুন ব্যবসা শুরু করে, কেউ গ্রামে ফিরে যায়, কেউ বিদেশে যায়, কেউ একই শহরে থেকেও নিজের জীবনের ধরন বদলে ফেলে। তাই ব্যাকেটের শেষ দৃশ্যকে ঢাকার জীবনের পূর্ণ প্রতিচ্ছবি না বলে, ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও পরিবর্তন ঘটাতে না-পারার একটি বিশেষ অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করা যায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু ভবিষ্যতের নয়, বর্তমানেরও। মানুষ কী এমন কোনো দিনের অপেক্ষায় বেঁচে থাকে, যেদিন সব ঋণ শোধ হবে, সব অনিশ্চয়তা দূর হবে, সব দায়িত্ব শেষ হবে এবং জীবন সত্যিকার অর্থে শুরু হবে? সেই দিন হয়তো কখনো সম্পূর্ণভাবে আসে না। কারণ মানুষের জীবন যতদিন চলবে, ততদিন নতুন প্রয়োজন, সম্পর্ক, সংকট ও প্রত্যাশা তৈরি হবে। ভবিষ্যতের জন্য কাজ করা তাই জরুরি, কিন্তু সেই ভবিষ্যতের অপেক্ষায় বর্তমানকে হারিয়ে ফেলাও বিপজ্জনক।
ঢাকা ‘ওয়েটিং ফর গডো’র মঞ্চ নয়। এ শহরে বাস্তব পরিবর্তন ঘটে, মানুষ কাজ করে, সংগ্রাম করে, সম্পর্ক গড়ে, ব্যর্থ হয়, আবার শুরু করে। কিন্তু ব্যাকেটের নাটকের মতো এখানেও মানুষের জীবনে এমন এক অপেক্ষা আছে, যার কোনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা নেই। পার্থক্য হলো, ঢাকার মানুষ অনেক সময় নিজের অপেক্ষার ফল তৈরি করতে পারে; তার পরিশ্রম, সিদ্ধান্ত ও সম্পর্ক বাস্তব পরিবর্তন আনতে পারে। তবু কোনো পরিবর্তনই জীবনের সব অনিশ্চয়তা দূর করে না। তাই মানুষ অপেক্ষা করে, আবার কাজও করে; হতাশ হয়, আবার আশাও করে। ব্যাকেটের নাটকের অন্ধকারের মধ্যেও যেমন মানুষের উপস্থিতি ও পারস্পরিক সঙ্গ পুরোপুরি বিলীন হয় না, তেমনি ঢাকার ক্লান্তিকর ও অনিশ্চিত জীবনেও মানুষ তার কাজ, সম্পর্ক, স্বপ্ন ও ছোট ছোট আশার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকার অর্থ তৈরি করে চলে।