হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইডনার লাইব্রেরির গভীরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল ও অনন্য সংগ্রহ—ইসরায়েল ও ইহুদি জাতির ইতিহাস, সমাজ, সংস্কৃতি এবং দৈনন্দিন জীবনের বিপুল তথ্যসম্ভার। এই আর্কাইভ গড়ে তোলার কেন্দ্রে আছেন গ্রন্থাগারিক ড. চার্লস বার্লিন, যিনি প্রায় ছয় দশক ধরে ইসরায়েল সংক্রান্ত প্রতিটি সম্ভাব্য নথি সংগ্রহ করে চলেছেন। এই বিশাল সংগ্রহের প্রধান উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে, ড. চার্লস বার্লিন ইসরায়েলি লেখক হাইম বে’এরকে সরাসরি প্রশ্ন করেছিলেন— ‘আপনারা (ইসরায়েলে) পুরোপুরি নিশ্চিত তো যে আপনারা টিকে থাকবেন?’
এ প্রশ্নটিই এই প্রকল্পের পেছনের বিতর্কিত অথচ অত্যন্ত বাস্তববাদী ধারণাকে তুলে ধরে। যদি কোনো বিপর্যয়ের কারণে ইসরায়েল রাষ্ট্র হিসেবে বিলুপ্ত হয়ে যায় বা সেখানে সমস্ত জ্ঞান ধ্বংস হয়, তবে ইসরায়েলি জীবনের সম্পূর্ণ তথ্য অন্য কোথাও সুরক্ষিত থাকবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপে ইহুদিদের সংগ্রহশালা ধ্বংস হয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা থেকে বার্লিন এই ‘ব্যাকআপ’ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।
হাশোমের হাতসাইর–হাকিবুত্স আরৎসি আন্দোলনের আর্কাইভ পরিচালক দালিয়া মরান ১৯৮৮ সালে হার্ভার্ডের এই প্রকল্প দেখে বিস্মিত হন। এখানে শুধু বই বা জার্নাল নয়, বরং ইসরায়েলি সমাজের ক্ষুদ্রতম দৈনন্দিন চিহ্ন—সিনাগগের পুস্তিকা, কিবুত্সের উৎসবের পতাকা, রাজনৈতিক প্রচারের পোস্টার, শহরের ফোনবুক, এমনকি রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা স্টিকার—সবই সংরক্ষিত।
চার্লস বার্লিন। ছবি- স্টু রোজনার
হার্ভার্ডের জুডাইকা সংগ্রহে আজ প্রায় দশ লাখ আলাদা নথি রয়েছে—ছয় মিলিয়ন ছবি, হাজার হাজার অডিও-ভিডিও রেকর্ড, মানচিত্র, সরকারি প্রতিবেদন থেকে শুরু করে ছোটখাটো বিজ্ঞাপন পর্যন্ত। হার্ভার্ডের বিভিন্ন লাইব্রেরির মোট সংগ্রহের ৫–৭ শতাংশই ইহুদি ও ইসরায়েল সংক্রান্ত।
এই বিশাল প্রকল্পের সূচনা ১৯৬০-এর দশকে, যখন তরুণ চার্লস বার্লিন ইহুদি অধ্যয়নে পিএইচডি সম্পন্ন করে হার্ভার্ডে নতুন প্রতিষ্ঠিত জুডাইকা বিভাগে প্রথম কিউরেটর হিসেবে যোগ দেন। শুরুতে তিনি বই সংগ্রহে মন দেন, পরে উপলব্ধি করেন—ইসরায়েলের দৈনন্দিন, সরকারি, রাজনৈতিক, অ-একাডেমিক প্রকাশনা ভবিষ্যতের জন্য আরো মূল্যবান হতে পারে। তিনি পৃথিবীজুড়ে ‘এজেন্ট’ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন, যারা ইসরায়েলের বিভিন্ন সংস্থা, কিবুত্স, পৌরসভা, দলীয় আর্কাইভ ও ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে উপকরণ সংগ্রহ করে তার কাছে পাঠাতেন।
ইসরায়েলের নানা প্রতিষ্ঠান তার সঙ্গে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে। কেউ কেউ সন্দেহ প্রকাশ করলেও অনেকেই মনে করতেন—নিজেদের সীমিত বাজেট ও সংরক্ষণক্ষমতার অভাবে যা নষ্ট হয়ে যাবে, হার্ভার্ডে তা অন্তত রক্ষা পাবে। ইসরায়েল রেডিওর ১৩ হাজার সংবাদ প্রচার, পামাচ যোদ্ধাদের সাক্ষাৎকার, কিবুত্স জীবনের বিরল ছবি, ইহুদি বসতি গঠনের নথি থেকে শুরু করে বহু শহরের পৌরসভা ও সরকারি সংস্থার প্রকাশনা—সবই ডিজিটাইজ করে এক কপি হার্ভার্ডে পাঠানো হয়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলের কিবুত্স ও মশাভগুলোর আর্কাইভ সংরক্ষণ। ইয়িগাল আলোন সেন্টার ও হার্ভার্ড যৌথভাবে শত শত ঘণ্টার ভিডিও সাক্ষাৎকার, লক্ষাধিক ছবি ও নথি ডিজিটাইজ করেছে—যা না হলে চিরতরে হারিয়ে যেত। একইভাবে জায়নিস্ট আন্দোলনের প্রারম্ভিক নথি, লেখক-শিল্পীদের ব্যক্তিগত আর্কাইভ, স্থাপত্য নকশা ও সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের হাজারো দলিলও সংরক্ষিত হয়েছে।
সংরক্ষিত শত শত ঘণ্টার ভিডিও সাক্ষাৎকার, লক্ষাধিক ছবি ও নথি। ছবি- হার্ভার্ড স্টাফ ফটোগ্রাফার
তবে বিতর্কও আছে। কিছু গবেষক ও আর্কাইভ পরিচালক আশঙ্কা প্রকাশ করছেন—ইসরায়েলের অবকাঠামো, শাসনব্যবস্থা বা নিরাপত্তা-সংক্রান্ত পুরনো পরিকল্পনা অনিয়ন্ত্রিতভাবে বিদেশী প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যাওয়া ভবিষ্যতে ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ডিজিটাইজ করা স্থাপত্য নকশা বা উন্নয়ন পরিকল্পনার কিছু অংশ অত্যন্ত সংবেদনশীলও হতে পারে। অবশ্ত এ আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে সহযোগীরা জোর দিয়ে বলেন—গোপন নথি কখনোই পাঠানো হয়নি। বেশিরভাগই আইনত ‘ওপেন সোর্স’।
সমালোচনা সত্ত্বেও, অনেকেই বার্লিনের অবদানকে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচনা করেন। ইসরায়েলের বহু প্রতিষ্ঠান বাজেট সংকটে নথি সংরক্ষণ করতে পারেনি। হার্ভার্ডের সহযোগিতা তাদের কাজ সহজ করেছে। ন্যাশনাল লাইব্রেরি, গনাজিম ইনস্টিটিউটসহ বহু সংস্থা হার্ভার্ডের সঙ্গে যৌথ প্রকল্পে লাখ লাখ নথি ডিজিটাইজ করেছে।
৮৯ বছর বয়সী চার্লস বার্লিন এখনো প্রতিদিন কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ডেস্কেই মরব।‘ ইসরায়েল রাষ্ট্র, তার সমাজ, সংস্কৃতি, সাফল্য ও সংকট—সবকিছুর এই বিশাল, কেন্দ্রীভূত স্মৃতি সংগ্রহই তার এই আজীবনের প্রকল্পের ফল। অনেকের মতে, ইসরায়েল রাষ্ট্র যদি টিকে থাকে তবে এই আর্কাইভ হবে থাকবে তার সমান্তরাল স্মৃতিভাণ্ডার। আর যদি না–থাকে, তবে ইতিহাস অন্তত হারিয়ে যাবে না।
সংক্ষেপণ ও ভাষান্তর: মঞ্জুরুল ইকরাম