স্বপ্ন—আমাদের অবচেতন মনের অলৌকিক মঞ্চ। কখনো তা সুখের, আবার কখনো দুঃখের। সাধারণত আমরা কী স্বপ্ন দেখব, সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। কিন্তু যদি বলি আপনার স্বপ্নের চাবিকাঠি এখন আপনার হাতে। আপনি নিজেই আপনার স্বপ্নের পরিচালক হতে পারেন। জ্বি, এমন এক পদ্ধতি আছে যা নিজের ইচ্ছেমতো স্বপ্ন দেখার সুযোগ করে দেয়। এ পদ্ধতিকেই বলে লুসিড ড্রিমিং।
কী এই লুসিড ড্রিম?
মনোবিজ্ঞানের একটা মজার বিষয় লুসিড ড্রিমিং। এটি এমন ধরনের স্বপ্ন, যেখানে ব্যক্তি স্বপ্নের মধ্যেও সজাগ থাকেন এবং তিনি স্বপ্ন দেখছেন তা বুঝতে পারেন, কিন্তু ঘুম ভাঙ্গে না। শুধু তা-ই নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্বপ্ন দেখা ব্যক্তি স্বপ্নের ঘটনা, পরিবেশ, উপস্থিত ব্যক্তি- সবকিছু নিজের ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করতে পারেন।
এমনটা হয় মূলত চেতন ও অবচেতন মনের একটি বিরল সংমিশ্রণে। সাধারণত লুসিড ড্রিমিং এর সময় স্বপ্ন হয় বেশ পরিষ্কার, অনুভুতিগুলো হয় খুবই তীব্র, প্রায় বাস্তবের মতন। ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নে আমাদের নিয়ন্ত্রণ নেই কথাটি লুসিড ড্রিমিংয়ের বেলায় খাটে না!
লুসিড ড্রিমের ইতিহাস
লুসিড ড্রিম বর্তমানে বেশ চর্চিত বিষয় হলেও এটি কোনো নতুন তত্ত্ব নয়। বরং সেই প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ এ ধরনের স্বপ্ন নিয়ে চিন্তাভাবনা করে এসেছে।
প্রাচীন মিসরীয় সভ্যতার প্রত্নলিপিতে ঘুমের মধ্যেই চেতনার জাগরণ সম্পর্কে ইঙ্গিত পাওয়া যায়। হিন্দু ধর্মগ্রন্থেও স্বপ্ন ও গভীর নিদ্রার মধ্যকার সচেতনতার উল্লেখ আছে। তিব্বতের ভিক্ষুরা ‘স্বপ্ন যোগ’ ও ‘যোগ নিদ্রা’-র মাধ্যমে স্বপ্নের ভেতর ধ্যান ও জাগরণের অনুশীলন করতেন।
৪১৫ খ্রিষ্টাব্দে সেইন্ট অগাস্টিনের এক চিঠিতে এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ আছে, যিনি স্বপ্ন দেখার সময় জানতেন তিনি স্বপ্ন দেখছেন। গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটলও লিখেছিলেন, মানুষ ঘুমন্ত অবস্থাতেও স্বপ্ন সম্পর্কে সচেতন হতে পারে।
১৭ শতকে ইংরেজ লেখক স্যার টমাস ব্রাউন তার ‘রিলেজিও মেডিচি’ গ্রন্থে লুসিড ড্রিমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। আর ১৯ শতকে ফরাসি চিন্তাবিদ মারি-জ্যাঁ-লিওন ‘ড্রিমস অ্যান্ড দ্য ওয়েস টু ডিরেক্ট দেম: প্রাকটিক্যাল অবজারভেশনস’ বইয়ে প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের ধারণা ব্যাখ্যা করেন। তাকেই আধুনিক লুসিড ড্রিম গবেষণার পথিকৃৎ হিসেবে ধরা হয়।
কখন হয় লুসিড ড্রিম?
বিজ্ঞানীদের গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের ঘুমকে দুটো পর্যায়ে ভাগ করা যায়- র্যাপিড আই মুভমেন্ট বা রেম (REM) এবং নন-রেম (Non-REM)। ঘুমের ৯০ মিনিট পর রেম পর্যায়ে মস্তিষ্ক সক্রিয় হয়—চোখ কাঁপে, হৃদযন্ত্রের গতি বেড়ে যায়। এ সময়েই সবচেয়ে প্রাণবন্ত স্বপ্ন দেখা যায়, আর সেখানেই ঘটে লুসিড ড্রিম।
বিজ্ঞানী ম্যাথিউ ওয়াকারের মতে, তখন মস্তিষ্কের ল্যাটারাল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আংশিক সক্রিয় থাকে, ফলে মানুষ ঘুমন্ত হয়েও যুক্তি সাজাতে পারে। লুসিড ড্রিমের ওপর একজন ব্যক্তি ঠিক কতটুকু কর্তৃত্ব খাটাতে পারবেন, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। অনেকে লুসিড ড্রিমে নিজের অস্তিত্ব টের পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জেগে ওঠেন। আবার অনেকে দিব্যি স্বপ্নের ঘটনা নিজের ইচ্ছেমতো বদলাতে থাকেন।
লুসিড ড্রিমিং চর্চার পদ্ধতি
কীভাবে লুসিড ড্রিম উপভোগ করা যেতে পারে, অনেকেই হয়তো তা জানতে আগ্রহী। তাদের জন্য সুখবর, বিজ্ঞানীরা এরই মধ্যে লুসিড ড্রিম আয়ত্তের জন্য বেশ কিছু অনুশীলন প্রস্তুত করেছেন। চলুন জেনে নিই কিভাবে আপনি নিজের স্বপ্নকে নিয়ন্ত্রণ করবেন।
বাস্তবতা পরীক্ষা: এ পদ্ধতিতে দিনে কয়েকবার নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে আপনি জেগে আছেন নাকি স্বপ্ন দেখছেন। এক সময় অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেলে আপনি স্বপ্নের মাঝেও এ প্রশ্ন করতে এবং স্বপ্নের মাঝেও নিজেকে সজাগ রাখতে পারবেন।
স্বপ্নলিপি: ঘুম ভেঙে সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্ন লিখে রাখুন, এতে অবচেতন মন সজাগ হয়।
ঘুম ভেঙে আবার ঘুম: প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর জেগে উঠে পুনরায় ঘুমালে সরাসরি রেম (REM) পর্যায়ে ঢুকে পড়া যায়, যা লুসিড ড্রিমের সম্ভাবনা বাড়ায়।
মাইল্ড পদ্ধতি (MILD): Mnemonic induction of lucid dreams বা MILD পদ্ধতিতে আপনাকে ঘুমোতে যাওয়ার আগে নিজেকে বারবারবলতে হবে, ‘আজ আমি লুসিড ড্রিম দেখব’। এ পদ্ধতি প্রয়োগের সবচেয়ে ভালো সময় হতে পারে আগের পদ্ধতিতে ৫ ঘণ্টা পর জেগে পুনরায় ঘুমোতে যাওয়ার আগে।
সতর্কতা
যাদের মানসিক উদ্বেগ বা ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। লুসিড ড্রিমে দীর্ঘ সময় জেগে থাকার ফলে ঘুমের বিশ্রাম নষ্ট হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে মানুষ বাস্তব আর স্বপ্নের পার্থক্য বুঝতে হিমশিম খায়। তাই মানসিকভাবে স্থির না হলে চর্চা না করাই ভালো।
লুসিড ড্রিম কোনো অলৌকিক ব্যাপার নয়, বরং একটি বৈজ্ঞানিক বিস্ময়। ঘুমের ভেতরও যেখানে মানুষ নিজেকে চেনার নতুন জানালা খুলে দেয়। কেউ চাইলেই কিছু অনুশীলনের মাধ্যমে নিজের স্বপ্নের পরিচালক হতে পারে। স্বপ্নের জগতে জেগে থাকার এ রহস্য হয়তো মানবমনের পরবর্তী অধ্যায়ের চাবিকাঠি।