জলবায়ু অভিযোজনে নতুন পথ দেখাচ্ছে নেদারল্যান্ডসের জলে ভাসা জীবন

ভাসমান বাড়িগুলো মূলত স্থিরভাবে তীরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। পানির স্তর বাড়লে ভেসে ওঠে, নামলে নিচে নামে। এগুলোর নিচে কংক্রিটের পাটাতন বা হুল থাকে, যা ওজনের ভারসাম্য রক্ষা করে। তিনতলা টাউনহাউসের মতো দেখতে এসব বাড়ি সাধারণত কাঠ, ইস্পাত ও কাচ দিয়ে তৈরি হয়।

যখন প্রবল বৃষ্টি নামছে, নদী ফুলে-ফেঁপে শহর প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা, তখনো নিশ্চিন্ত অ্যামস্টারডামের স্কুনসশিপ নামের ভাসমান সম্প্রদায়ের বাসিন্দারা। বাইরের বেঞ্চ, সাইকেলগুলো তীরের সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা, প্রতিবেশীদের খোঁজ নেয়া হয়েছে। সব প্রস্তুতি শেষ, এবার ভেসে যাওয়ার পালা। তারা জানে, ঘরবাড়ি আর তাদের সঙ্গে নিয়েই ভেসে উঠবে নদী। আবার পানির স্তর নামলেই ফিরে যাবে আগের অবস্থানে।

জলের সঙ্গে সহাবস্থানের ডাচ ভাবনা

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এক-তৃতীয়াংশ নিচে অবস্থিত নেদারল্যান্ডস। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে জলের সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে এখানকার বাসিন্দারা। কিন্তু এখন সহাবস্থানের পথ বেছে নিয়েছে। শহর প্রশাসন এখন ভাসমান বাড়ির ধারণাকে সম্প্রসারিত করতে চায়। এটি শুধু জায়গার বহুমুখী ব্যবহার নয়, বরং টেকসই নগর পরিকল্পনার অংশ। ভাসমান বাড়িগুলো মূলত স্থিরভাবে তীরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। পানির স্তর বাড়লে ভেসে ওঠে, নামলে নিচে নামে। এগুলোর নিচে কংক্রিটের পাটাতন বা হুল থাকে, যা ওজনের ভারসাম্য রক্ষা করে। তিনতলা টাউনহাউসের মতো দেখতে এসব বাড়ি সাধারণত কাঠ, ইস্পাত ও কাচ দিয়ে তৈরি হয়। নগরীর বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার সঙ্গেও এর সংযোগ রয়েছে।

অ্যামস্টারডামের স্কুনসশিপ প্রকল্পটি ডিজাইন করেছে স্পেস অ্যান্ড ম্যাটার নামের ডাচ প্রতিষ্ঠান। মোট ৩০টি বাড়ি নিয়ে গঠিত এই সম্প্রদায়ে বাসিন্দারা ভাগাভাগি করে ব্যবহার করেন গাড়ি, সাইকেল, এমনকি স্থানীয় কৃষকের কাছ থেকে কেনা খাবারও। প্রতিটি ঘরে নিজস্ব হিট পাম্প আছে, আর ছাদের এক-তৃতীয়াংশজুড়ে আছে সৌরপ্যানেল। প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ তারা জাতীয় গ্রিডে বিক্রি করে।

শুধু অ্যামস্টারডামে নয় নতুন জলনগর গড়ে উঠেছে রটারডামেও। ৯০ শতাংশই সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে থাকা এ নগরী এখন ভাসমান অবকাঠামোর আন্তর্জাতিক কেন্দ্র। এখানে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ভাসমান অফিস, এমনকি রোবট পরিচালিত গাভীর খামারও। স্থানীয় বাসিন্দারা পানিকে এখন আর শত্রু হিসেবে নয় বরং সম্ভাবনা হিসেবে দেখে।

এ প্রকল্প গ্রহণে দীর্ঘ নীরিক্ষা চালিয়েছে নেদারল্যান্ডস সরকার। ২০০৬ সালে চালু করা হয় ‘রুম ফর দ্য রিভার’ প্রকল্প। এ প্রকল্পের আওতায় নির্দিষ্ট কিছু এলাকাকে ইচ্ছাকৃতভাবে প্লাবিত হতে দেয়া হয়, যাতে প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা পায়। নানা পদক্ষেপ শেষে প্রমাণিত হয় জলরোধ নয়, বরং তাকে গ্রহণ করাই টেকসই সমাধান।

এখন পর্যন্ত ৩০০টিরও বেশি ভাসমান বাড়ি, স্কুল, হাসপাতাল ও অফিস ডিজাইন করেছেন ডাচ স্থপতি কোয়েন অলথুইস। তিনি বলেন, আমরা নিজেদের স্থপতি নয়, বরং শহরের চিকিৎসক হিসেবে দেখি। আর পানিই আমাদের ওষুধ।

বিশ্বজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের মুখে বন্যাপ্রবণ দেশগুলোর জন্য নেদারল্যান্ডসের এ নতুন ধারার ভাসমান বাড়িগুলো এক নতুন মডেল হয়ে উঠছে। ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়া থেকে মালদ্বীপ পর্যন্ত, ডাচ প্রকৌশলীরা এখন এগুলোকে আরো বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন করছেন।

বল্টিক সাগরে ৫০ হাজার মানুষের জন্য ভাসমান দ্বীপনগর তৈরির প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে ডাচ প্রতিষ্ঠান ব্লু ২১। ফিনল্যান্ডের হেলসিঙ্কি ও এস্তোনিয়ার তালিনকে একটি আন্ডারওয়াটার টানেলের মাধ্যমে যুক্ত করে এ প্রকল্পের কাজ করা হবে। ওয়াটারস্টুডিও নামের একটি প্রতিষ্ঠান এ বছরই মালদ্বীপের রাজধানী মালেতে ২০ হাজার মানুষের জন্য ভাসমান আবাসন প্রকল্প শুরু করতে যাচ্ছে। বাড়িগুলোর নিচে থাকবে কৃত্রিম প্রবালপ্রাচীর, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষা করবে।

অবশ্য ভাসমান বাড়িরও কিছু সীমাবদ্ধতা আছে। প্রবল বাতাস বা বড় জাহাজের ঢেউয়ে এগুলো দুলতে পারে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ ও পয়ঃনিষ্কাশন সংযোগের জন্য আলাদা অবকাঠামো গড়তে হয়, যা ব্যয়বহুল। তবু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত বিপর্যয়ের যুগে এটি ভবিষ্যতের জন্য এক অপরিহার্য বিনিয়োগ।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও