ঘর হারিয়ে এখন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য হারানোর শঙ্কায় নেপালের বন্যাদুর্গতরা

নেপাল ১২০টির বেশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আবাসভূমি। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, ধর্মীয় আচার, উৎসব ও সামাজিক রীতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব ঐতিহ্য টিকে আছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন আর চর্চার মধ্য দিয়ে। তিব্বত সীমান্তের হিমালয়ঘেরা রাসুয়া জেলা বিশেষভাবে পরিচিত তার তিব্বতি বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের জন্য। সেখানকার ‘তামাং হেরিটেজ ট্রেইল’ পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয়।

নেপাল-তিব্বত সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় স্ত্রী ভেসে যাওয়ার পর থেকে জীবনের সব হারিয়ে নিঃস্ব ছিরিং গেলবু লামা। হিমালয়ের দুর্গম গ্রাম থেকে এসে রাজধানী কাঠমান্ডুর একটি বৌদ্ধ বিহারে আশ্রয়ে নেন তিনি। সঙ্গে রয়েছে তার চার বছরের ছোট্ট মেয়ে। সে এখনো জানে না তার মা আর বেঁচে নেই। লামা একথা এখনো মেয়েকে জানাতে পারেন নি।

আশ্রমের মেঝেতে বসে মেয়েকে ভাত খাওয়াচ্ছিলেন তিনি। একদিকে শিশুটিকে সামলানোর চেষ্টা, অন্যদিকে চোখের পানি লুকানোর ব্যর্থ প্রয়াস। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। সেই সঙ্গে মন কেঁদে উঠছে এক গভীর অনিশ্চয়তায়। জমিজমা ও ঘরবাড়ি হারানোর পর এখন তিনি ভাবছেন, শিকড় বিচ্ছিন্ন এ মেয়েকে কীভাবে নিজেদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি শেখাবেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এপির প্রতিবেদনে জানা যায়, কাঠমান্ডুর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে এখন শত শত মানুষ জড়ো হয়েছেন। এ দুর্যোগে ঘরবাড়ি ও জমিজমা হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া মানুষের মনে এখন বাসা বেঁধেছে এক নতুন আশঙ্কা। বন্যার পানিতে শুধু ঘরবাড়িই না, ভেসে যেতে পারে তাদের শত বছরের পুরোনো ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও জীবনধারারও একটি বড় অংশ।

উত্তরাঞ্চলীয় রাসুয়া জেলা থেকে আসা ৩৬ বছর বয়সী ছেরিং শেরপা আশ্রমে বসে নিজেদের কষ্টের কথাগুলো তুলে ধরেন। তিনি জানান, পাহাড়ি এলাকার মানুষের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি তাদের ভিটেমাটির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই জমি হারানোর অর্থ শুধু গৃহহীন হওয়া নয়; এর সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে নিজেদের ইতিহাস, স্মৃতি ও ঐতিহ্যও।

নেপাল ১২০টির বেশি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর আবাসভূমি। প্রতিটি জনগোষ্ঠীর রয়েছে নিজস্ব ভাষা, ধর্মীয় আচার, উৎসব ও সামাজিক রীতি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এসব ঐতিহ্য টিকে আছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন আর চর্চার মধ্য দিয়ে। তিব্বত সীমান্তের হিমালয়ঘেরা রাসুয়া জেলা বিশেষভাবে পরিচিত তার তিব্বতি বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যের জন্য। সেখানকার ‘তামাং হেরিটেজ ট্রেইল’ পর্যটকদের কাছেও জনপ্রিয়।

বন্যার পর আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা মানুষগুলো আগের জীবনের স্মৃতি হাতড়াচ্ছেন। মোবাইলে পুরোনো ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে ফিরে যাচ্ছেন সেই জীবনে, যে জীবনটি কয়েক দিন আগেও ছিল তাদের স্বাভাবিক জীবন। ছবিতে দেখা যায় সবুজে ঘেরা পাহাড়, ঘন বন আর নদী। সেই বনে ঘুরে বেড়াত হরিণ, ভালুক ও নানা রঙের প্রজাপতি।

আবার কোনো ছবিতে দেখা যায়, গ্রামের নারীরা একসঙ্গে জুনিপার কাঠ কাটছেন। সেই কাঠ দিয়ে তৈরি হতো ধূপ। কোনো ছবিতে তারা নতুন করে তৈরি হওয়া বৌদ্ধ বিহার সাজাচ্ছেন। আবার উৎসবের দিনে রঙিন ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে নারী-পুরুষ সবাই মিলে নাচছেন।

রাসুয়া থেকে আসা ২০ বছর বয়সী তেনজিন ডলমা ঘালে সেই সব স্মৃতির দিকে তাকিয়ে ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, সেই আনন্দময় দিনগুলো সবই এখন শেষ হয়ে গেছে।

ভয়াবহ সেই বন্যার স্মৃতি বর্ণনা করতে গিয়ে বেঁচে যাওয়া বাসিন্দারা জানান, নদীর পানি হঠাৎ তীব্র গতিতে বাড়তে শুরু করলে তারা উঁচু পাহাড়ের দিকে ছুটে যান, প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেন বৌদ্ধ বিহারে। যে উপাসনালয়গুলোতে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন, তার অনেকগুলোই ২০১৫ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পের ধ্বংসযজ্ঞের পর নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছিল। এবার বন্যার আঘাত এসেছে সেই নতুন আশ্রয়গুলোর ওপরও।

উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার যখন তাদের নিরাপদে সরিয়ে নেয়, তখন অধিকাংশ মানুষের সঙ্গে ছিল না কোনো জিনিসপত্র। গায়ে থাকা পোশাকটুকুই ছিল শেষ সম্বল। তাড়াহুড়ো করে ঘর ছাড়তে গিয়ে ফেলে আসতে হয়েছে বংশপরম্পরায় সংরক্ষিত পারিবারিক স্মৃতিচিহ্ন, ধর্মীয় সামগ্রী ও মূল্যবান ঐতিহ্যবাহী জিনিসপত্র।

তবে অঞ্চলটির সাংস্কৃতিক সংকট বন্যার আগেই শুরু হয়েছিল। উন্নত শিক্ষা ও কাজের সন্ধানে তরুণেরা ধীরে ধীরে শহরেমুখী হয়েছেন। ফলে গ্রামের মানুষের জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছিল অনেক পুরোনো রীতি ও চর্চা।

রাসুয়া থেকে আশ্রয়কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করা ২৬ বছর বয়সী আলিনা লামা বলেন, ‘তরুণ প্রজন্মের অনেকেই আধুনিক জীবনযাত্রার দিকে ঝুঁকেছেন। ফলে নিজেদের সংস্কৃতির অনেক খুঁটিনাটি জানার সুযোগও তাদের হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সংস্কৃতির অনেক ছোট ছোট বিষয় আমি জানি না। কারণ পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ হয়নি।’

দুর্যোগের পর এখন সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ অনাথ হয়ে পড়া শিশুদের নিয়ে। বাবা-মাকে হারানো এসব শিশুকে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্মীয় আচার ও পারিবারিক ঐতিহ্য কে শেখাবে, এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন সবাই। সেভ দ্য চিলড্রেন জানিয়েছে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হাজার হাজার শিশুর জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। তবে ঠিক কত শিশু এই বন্যায় বাবা-মাকে হারিয়েছে, তার সঠিক সংখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।

ধর্মীয় বিহার ও উপাসনালয় ধ্বংস হয়ে যাওয়ায় সামনে আরো বড় সাংস্কৃতিক সংকট তৈরি হওয়ার উপক্রম হয়েছে। স্থানীয় ভিক্ষু ও প্রবীণ ধর্মগুরুরা শুধু ধর্মীয় আচারই পালন করতেন না, তারা ছিলেন বহু পুরোনো জ্ঞান ও ঐতিহ্যের ধারক। তাদের কেউ নিখোঁজ, কেউ মারা গেছেন। আর যে বিহারগুলোতে এসব ঐতিহ্যের চর্চা হতো, সেগুলোর অনেকগুলোই এখন আর নেই। সামনেই ছিল গুরুত্বপূর্ণ শরৎকালীন বৌদ্ধ উৎসব। কিন্তু উৎসবের সেই চেনা স্থানগুলো এখন ধ্বংসস্তূপ। ফলে উৎসব আয়োজন নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

ছেরিং শেরপা বলেন, ‘আমরা আগে এসব উৎসব আমাদের বিহারে পালন করতাম। এখন আমাদের কোনো বিহারই নেই। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চার মাধ্যমে এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে ছড়িয়ে পড়ে। চর্চাই যদি না থাকে, তবে আগামী প্রজন্মের কাছে নিজেদের ইতিহাস পৌঁছাবে কীভাবে?’

—এপি অবলম্বনে

আরও