বাইরে থেকে দেখলে বাড়িটি বিশেষ কিছু মনে হয় না। অধিকাংশ পর্যটক যারা এই ইউনেস্কো স্বীকৃত বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানটি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, তাদের চোখে এটা কেবল একটি সাধারণ বাড়ি—নীরব চেক পাড়ার যেন এক নিঃশব্দ বাসিন্দা। তাদের অনেকেই রাজকীয় ইউরোপীয় ক্লাসিক কোনো ভিলা খুঁজে ফেরেন আর এই বাড়ির পাশ দিয়ে নির্বিঘ্নে হেঁটে চলে যান।
তবে এই আপাত সাধারণ ভিলা নিয়ে আর্কিটেক্ট এবং ইতিহাসবিদরা বিশ্বজুড়ে চালান গবেষণা। এই বাড়িটি একসময় ছিল ব্যক্তিগত নিবাস, নাচের স্টুডিও, অস্থিজনিত সমস্যায় আক্রান্ত নারীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র, নাৎসি জার্মানির মালিকানাধীন সম্পত্তি এবং বিংশ শতাব্দীর এক ঐতিহাসিক ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু। পাঠক, আপনাদের স্বাগতম ভিলা টুগেনধাতে।
১৯২০-এর দশকে, টুগেনধাত পরিবার ছিল একটি ধনী জার্মান ইহুদি পরিবার। তাদের ব্রনো শহরের বাড়ির নকশার জন্য এক উদীয়মান স্থপতি লুডভিগ মিস ভান ডার রোহেকে নিয়োগ করা হয়। আধুনিক স্থাপত্যের এক কিংবদন্তি রোহে এ বাড়িটি তৈরির সময় দিয়েছিলেন বিখ্যাত ‘লেস ইজ মোর’ বাণীটিও।
এ বাড়ির নির্মাণকাজ শেষ হয় ১৯৩০ সালে, ঠিক নাৎসি জার্মানির উত্থানের আগে।
ভিলা টুগেনধাতের আসল সৌন্দর্য বোঝার জন্য সামনে থেকে নয়, পেছন থেকে দেখতে হয়। এটি এক ছোট্ট টিলার ওপর নির্মিত—ছাদ থেকে মেঝে পর্যন্ত কাঁচের জানালা দিয়ে সাজানো। এখানে দাঁড়িয়ে চোখে পড়বে সবুজ প্রান্তরের অনন্ত দৃশ্য।
‘রোহে তার অভিজাত চেহারা সত্ত্বেও ছিলেন এক বিপ্লবী চিন্তাবিদ,’ বলেন ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ইতিহাসের অধ্যাপক ডিট্রিশ নিউম্যান। ‘তিনি মানুষের বসবাসের ভাবনাকে সম্পূর্ণ নতুন করে ভেবেছিলেন।‘
পেছন থেকে ভিলার দৃশ্য। ছবি: ভিলা টুগেনধাত
তৎকালীন বাড়িগুলো সাধারণত আলাদা আলাদা কামরার মাধ্যমে গঠিত হতো—খাবার ঘর, শোবার ঘর, রান্নাঘর। কিন্তু টুগেনধাত ভিলা ছিল বড়, উন্মুক্ত স্পেসে সাজানো। সেখানে ব্যবহৃত হয়েছিল সাদা অনিক্সের মতো অচেনা, দামি উপকরণ। আজকের দিনে একটি অনিক্সের দেয়ালের খরচ প্রায় ৬০ হাজার ডলার।
এই ভিলা সম্পর্কে একটি বই লিখেছেন মাইকেল ল্যামবেক। তিনি বলেন, ‘এই বাড়ির নকশায় কিছুই কাকতালীয় ছিল না। বাড়িটি তার দেয়ালের ওপর নয়, ক্রোম-ঢাকা ইস্পাতের স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে।‘
রোহে ও তার সহযোগী লিলি রাইখ ঘরের জন্য এমন সব আসবাব ডিজাইন করেছিলেন, যা ছিল সময়ের চেয়ে এগিয়ে—আজও বিখ্যাত ‘ব্রনো চেয়ার’ এবং ‘টুগেনধাত চেয়ার’ নামে পরিচিত আসবাবগুলো এখানেই প্রথম তৈরি হয়। এই বাড়িতে ব্যক্তিগত স্মৃতি বা প্রদর্শনযোগ্য সংগ্রহ ছিল না। ছিল এক ধরনের ‘র্যাডিকাল খালি জায়গা’, নিউম্যানের ভাষায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং তার পরিণতির কারণে পরিবারটি এখানে অল্প সময়ই বাস করতে পেরেছিল। বাড়িটি নাৎসিদের কবলে পড়ে। পরে এটি হাতবদল হয় বহুবার।
পরবর্তীতে সোভিয়েত অধিকৃত চেকোস্লোভাকিয়ায় ১৯৬৮ সালের প্রাগ বসন্তের সময় গ্রেট টুগেনধাত বাড়িটি আবার দেখতে পান। তিনি শর্ত দেন— বাড়িটি তার মূল রূপে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। শহর কর্তৃপক্ষ রাজি হয়।
এই সময়েই রোহে আমেরিকায় চলে যান এবং হন একজন কিংবদন্তি স্থপতি। ওয়াশিংটনের মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র মেমোরিয়াল লাইব্রেরি এবং নিউ ইয়র্কের সিগ্রাম বিল্ডিংয়ের নকশা করেন তিনি।
১৯৯২ সালের ২৬ আগস্ট ভিলায় চেকোস্লোভাক ফেডারেশন ভাঙন নিয়ে আলোচনার সময় স্লোভাক প্রধানমন্ত্রী ভ্লাদিমির মেচিয়ার (বাঁদিকে) এবং চেক প্রধানমন্ত্রী ভাচলাভ ক্লাউস (ডানদিকে)। ছবি: এপি
১৯৯২ সালের ২৬ আগস্ট, ভিলা টুগেনধাতে পা রাখেন দুই নেতা—ভাচলাভ ক্লাউস এবং ভ্লাদিমির মেচিয়ার। সেদিন তারা ঘোষণা দেন— চেকোস্লোভাকিয়া ভেঙে হবে দুটি স্বাধীন দেশ—চেক প্রজাতন্ত্র এবং স্লোভাকিয়া। এই শান্তিপূর্ণ বিচ্ছেদ ইতিহাসে পরিচিত হয় ‘ভেলভেট ডিভোর্স’ নামে।
ভিলা টুগেনধাতের বাগানে গাছের নিচে এক ছোট প্রেস কনফারেন্সে তারা সেই ঘোষণা দেন।
২০০১ সালে, ইউনেস্কো ভিলাটিকে বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়। একে আখ্যা দেয় ‘২০ শতকের আধুনিক বসতবাড়ির পথপ্রদর্শক নিদর্শন’ হিসেবে।
সূত্র: সিএনএন