সাপ দেখে আঁতকে ওঠা কিংবা উঁচুতে উঠলে বুক ঢিপঢিপ করা আমাদের কাছে খুবই স্বাভাবিক বিষয়। এ ভয়ের অনুভূতি যখন মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে স্থবির করে দেয় কিংবা কোনো নির্দিষ্ট বস্তু বা পরিস্থিতির কথা ভেবে আতঙ্কিত হওয়ার এ পরিস্থিতিকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ফোবিয়া’ (Phobia) । এটি কেবল সাধারণ ভয় নয়, বরং একটি সুনির্দিষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা।
ফোবিয়া আসলে কী?
ফোবিয়া হলো কোনো বস্তু, ব্যক্তি, প্রাণী, কার্যকলাপ বা পরিস্থিতির প্রতি এক ধরণের তীব্র ও অবাস্তব ভয়। এটি এক ধরণের ‘অ্যাংজাইটি ডিজঅর্ডার’ বা উদ্বেগজনিত ব্যাধি। সাধারণ ভয়ের সঙ্গে ফোবিয়ার মূল পার্থক্য হলো এর তীব্রতা। ফোবিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তি জানেন যে তার ভয়টি অমূলক, কিন্তু এ সত্ত্বেও তিনি নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না। অনেক ক্ষেত্রে মানুষ তার ভয়ের বস্তুটি এড়াতে নিজের ক্যারিয়ার বা সামাজিক জীবনকে চরমভাবে সীমাবদ্ধ করে ফেলেন।
ফোবিয়ার প্রকারভেদ ও হার
যেহেতু ফোবিয়া এবং এর ফলে সৃষ্ট ভয় বা উদ্বেগ একেকজনকে একেকভাবে প্রভাবিত করে, তাই ফোবিয়ার কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ফোবিয়াকে মূলত পাঁচটি ভাগে ভাগ করা যায়: প্রাণী, প্রাকৃতিক পরিবেশ, রক্ত, চিকিৎসা পদ্ধতি বা আঘাত, বিশেষ পরিস্থিতি এবং অন্যান্য।
ফোবিয়া কতটা সাধারণ?
যদিও মানুষের মধ্যে কোনো কিছুর প্রতি তীব্র ভয় থাকার কথা বলা সাধারণ বিষয়—যেমন সাপ বা উচ্চতার ভয়—তবে এটি ফোবিয়ার সমান নয়। বাস্তবে, ফোবিয়া খুব বেশি সাধারণ নয়। সামগ্রিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মাত্র ৮% থেকে ১২% মানুষের মধ্যে স্পেসিফিক ফোবিয়ার লক্ষণ দেখা যায়। বিশ্বের অন্যান্য স্থানে এটি ২% থেকে ৬% এর মধ্যে। বিশ্বব্যাপী ৩% থেকে ৯% শিশুর মধ্যে এটি দেখা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কিশোর-কিশোরীদের (১৩ থেকে ১৭ বছর) মধ্যে প্রায় ১৬% এর এই সমস্যা রয়েছে। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ফোবিয়ার হার কমে যায়। ৬৫ বা তার বেশি বয়সীদের ক্ষেত্রে এটি ৩% থেকে ৫%। পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে এই সমস্যা হওয়ার সম্ভাবনা দ্বিগুণ। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ১০ বছর বয়সের আগেই এই সমস্যার সূত্রপাত ঘটে।
চেনার উপায়: লক্ষণগুলো কী কী?
ফোবিয়ার লক্ষণগুলো মূলত তিনভাবে প্রকাশ পায়:
১. মানসিক লক্ষণ: চরম আতঙ্ক, পালানোর তীব্র ইচ্ছা, এমনকি নিজের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো অনুভূতি (Depersonalization) ।
২. শারীরিক লক্ষণ: বুক ধড়ফড় করা, মাত্রাতিরিক্ত ঘাম, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব এবং হাত-পা কাঁপানো।
৩. আচরণগত লক্ষণ: ভয়ের উৎসকে এড়াতে জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আনা। যেমন—লিফটের ভয়ে বহুতল ভবনে না ওঠা কিংবা পানির ভয়ে সমুদ্র সৈকতে যেতে অস্বীকার করা।
শিশুদের ক্ষেত্রে ফোবিয়া প্রকাশ পায় কান্নাকাটি করা, বড়দের আঁকড়ে ধরা বা একদম নিথর হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে।
কেন হয় ফোবিয়া?
ফোবিয়া কেন হয় তার সুনির্দিষ্ট কারণ আজও অজানা। তবে চিকিৎসকরা কিছু বিষয়কে দায়ী করেন যেমন- অতীতে ঘটে যাওয়া কোনো ভয়াবহ স্মৃতি থেকে ট্রমা বা তিক্ত অভিজ্ঞতা।পরিবারের কারো এই সমস্যা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে তা হওয়ার ঝুঁকি থাকে। অতিসতর্ক মা-বাবার ভয় দেখে অনেক সময় শিশুরাও সেই জিনিসে ভয় পেতে শেখে।
প্রতিকারের উপায় ও চিকিৎসা
তবে ভালো ব্যাপার হলো, সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে ফোবিয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব। এর প্রধান চিকিৎসাগুলো হলো:
১. সাইকোথেরাপি: বিশেষ করে ‘কগনিটিভ বিহেভিয়ারাল থেরাপি’ (CBT) এক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর।
২. এক্সপোজার থেরাপি: এটি এমন এক পদ্ধতি যেখানে বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে রোগীকে ধীরে ধীরে তার ভয়ের বস্তুর মুখোমুখি করা হয়, যাতে তার মনের ভয় কেটে যায়।
৩. ওষুধ: ক্ষেত্রবিশেষে চিকিৎসক সাময়িক উদ্বেগ কমানোর জন্য ওষুধ দিয়ে থাকেন।
ফোবিয়া মোকাবিলায় চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত ঘুম, শরীরচর্চা এবং অ্যালকোহল বা মাদক থেকে দূরে থাকা মানসিক শক্তি বৃদ্ধি করে।
ফোবিয়া অবহেলা করলে তা থেকে দীর্ঘমেয়াদী বিষণ্ণতা বা হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। যদি আপনার ভয় আপনার দৈনন্দিন কাজ বা সামাজিক সম্পর্কে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তবে দেরি না করে একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। মনে রাখবেন, ভয় পাওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু ভয়ের খাঁচায় বন্দী থাকা নয়।
[ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) ও ক্লিভল্যান্ড ক্লিনিকের সহায়তায় লেখা]