বিলাসিতায় নয়, যে দর্শনে সফল্যের শীর্ষে ক্যাসিও

মজার ব্যাপার হলো, ক্যাসিও-র প্রথম হিট পণ্য কোনো ঘড়ি বা ক্যালকুলেটর না; বরং সেটি ছিল 'ইউবিওয়া পাইপ'। এটি মূলত আঙুলে পরার একটি আংটি যা সিগারেট ধরে রাখতো। এর সাহায্যে ধূমপানের সময়ও হাত খালি রেখে কাজ করা যেত। এ পণ্যের লভ্যাংশই পরবর্তীতে ইলেকট্রনিক্স গবেষণায় বিনিয়োগ করেন তারা।

ক্যাসিও, অতিপরিচিত নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক প্রজন্মের স্মৃতি। স্কুলছাত্রের হাতে থাকা সাধারণ ডিজিটাল ঘড়ি থেকে পেশাদার অভিযাত্রীর হাতের জি-শক, দীর্ঘ ৭ দশক ধরে বিশ্বজুড়ে সময়ের এক বিশ্বস্ত সঙ্গী এ ক্যাসিও।

ক্যাসিওর জন্ম ১৯৪৬ সালে জাপানের টোকিওতে, প্রতিষ্ঠাতা তাদাও কাশিও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে যখন জাপান অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল, তখন চার ভাই— তাদাও, তোশিও, কাজুও এবং ইউকিও মিলে 'কাশিও সেইসাকুজো' নামে একটি ছোট কারখানা চালু করেন।

মজার ব্যাপার হলো, ক্যাসিও-র প্রথম হিট পণ্য কোনো ঘড়ি বা ক্যালকুলেটর না; বরং সেটি ছিল 'ইউবিওয়া পাইপ'। এটি মূলত আঙুলে পরার একটি আংটি যা সিগারেট ধরে রাখতো। এর সাহায্যে ধূমপানের সময়ও হাত খালি রেখে কাজ করা যেত। এ পণ্যের লভ্যাংশই পরবর্তীতে ইলেকট্রনিক্স গবেষণায় বিনিয়োগ করেন তারা।

'ইউবিওয়া পাইপ'

ক্যাসিও মূলত ক্যালকুলেটর তৈরির মাধ্যমে পরিচিতি পেলেও ১৯৭০-এর দশকে তারা ঘড়ির বাজারে প্রবেশ করে। তাদের এ যাত্রা ছিল রোমাঞ্চকর:

১৯৭৪ সাল, কাসিওট্রন: এটি ছিল ক্যাসিও-র প্রথম ডিজিটাল রিস্টওয়াচ। এটিই বিশ্বের প্রথম ঘড়ি যাতে মাস বা দিনের তারতম্য অনুযায়ী অটোমেটিক ক্যালেন্ডার আপডেট হওয়ার প্রযুক্তি ছিল।

১৯৮৩ সাল, জি-শক বিপ্লব: ক্যাসিও ইঞ্জিনিয়ার কিকুও ইবে-র হাত ধরে জন্ম নেয় জি-শক। লক্ষ্য ছিল এমন একটি ঘড়ি তৈরি করা, যা কখনো ভাঙবে না। এটি ঘড়ির দুনিয়ায় 'টাফনেস' বা স্থায়িত্বের নতুন সংজ্ঞা তৈরি করে।

১৯৮৯ সাল, আইকনিক এফ-৯১ডাব্লিউ: সাশ্রয়ী মূল্যে নির্ভুল সময় এবং দীর্ঘ ব্যাটারি লাইফের কারণে এটি বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় ডিজিটাল ঘড়িতে পরিণত হয়।

পরবর্তী উদ্ভাবন: এরপর তারা বাজারে আনে সোলার চার্জিং সম্পন্ন ঘড়ি, কম্পাস ও তাপমাত্রা মাপার সেন্সরযুক্ত 'প্রো-ট্রেক' এবং অভিজাত 'এডিফিস' সিরিজ।

ক্যাসিও-র সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো সাশ্রয়ী মূল্য ও স্থায়িত্ব। ৫ ডলারে পাওয়া এফ-৯১ডাব্লিউ থেকে শুরু করে হাজার ডলারের প্রিমিয়াম জি-শক— প্রতিটি ঘড়ি তার গুণের জন্য বিশ্বস্ত। পপ কালচার থেকে শুরু করে মহাকাশচারী বা সামরিক বাহিনীর সদস্য, সবার হাতেই ক্যাসিও-র জায়গা হয়েছে এর নিখুঁত কারিগরি বিদ্যার কারণে।

১৯৮০-এর দশকে জি-শক ঘড়ির সূচনার মাধ্যমে ক্যাসিও তার ‘টাফনেস’-এর সুনাম আরো শক্ত করে। যেকোনো ধরনের আঘাত, কম্পন ও কঠিন পরিবেশ সহ্য করার জন্য এ মডেলগুলো বিশেষভাবে তৈরি করা হয়। খেলাধুলা, আউটডোর কার্যক্রম কিংবা কষ্টসাধ্য পেশায়—সবখানেই জি-শক হয়ে ওঠে নির্ভরতার নাম। এ দৃঢ়তা-কেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিই ক্যাসিওকে ঐতিহ্যবাহী ঘড়ি নির্মাতাদের থেকে আলাদা করে তোলে।

ক্যাসিওর সাফল্যের শিকড় প্রোথিত তার প্রতিষ্ঠাতা তাদাও কাশিওর গড়ে দেয়া এক সুস্পষ্ট ও বাস্তবধর্মী দর্শনে। শুরু থেকেই ক্যাসিও বিলাসপণ্যের পথে হাঁটেনি। সামাজিক মর্যাদা প্রদর্শনের প্রতীক নয়, বরং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগে—এমন উপযোগী, সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য প্রযুক্তি তৈরিই ছিল তাদের লক্ষ্য। এ ভাবনাই ঘড়ির জগতে ক্যাসিওর আলাদা পরিচয় গড়ে দেয়।

কার্যকারিতা ও টেকসই গুণের জন্য ক্যাসিও ঘড়ি দ্রুতই পরিচিত হয়ে ওঠে। প্রাথমিক মডেলগুলোতে ছিল ডিজিটাল ডিসপ্লে, অ্যালার্ম, স্টপওয়াচ, এমনকি ক্যালকুলেটরের সুবিধাও—যা শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষের মধ্যে দারুণ জনপ্রিয়তা পায়। উদ্দেশ্য ছিল, সময় দেখাকে আরো সহজ ও সবার জন্য সহজলভ্য করা।

বিলাসবাজারে প্রতিযোগিতায় না নেমে ক্যাসিও বিশ্বাস অর্জন করেছে যুক্তিসংগত দামে ধারাবাহিক কর্মক্ষমতা দিয়ে। নির্ভরযোগ্যতা, উদ্ভাবন এবং ব্যবহারিক নকশার প্রতি অটল অঙ্গীকার—এ তিন স্তম্ভের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ক্যাসিওর দীর্ঘস্থায়ী জনপ্রিয়তা।

তাদাও কাশিওর সেই ছোট কারখানা থেকে আজকের গ্লোবাল ব্র্যান্ড হয়ে ওঠার পেছনের গল্পটি হলো নিরন্তর উদ্ভাবনের গল্প। সময় যায়, প্রজন্ম বদলায়— কিন্তু বাস্তব জীবনের পাশে থাকা ঘড়ির গল্পে ক্যাসিও আজও অবিচল।

আরও