কুন্দকার: মোঘল আমলের বিলুপ্তপ্রায় এক পেশা

এক সময় ঢাকার এ শিল্প বিশ্ববাণিজ্যের অংশ হয়ে ওঠে নিখুঁত কারুকাজের মাধ্যমে। ঢাকার পণ্য পৌঁছে যেত ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের অভিজাত বাজারে।

ঢাকা কেবল নদী আর মানুষের শহর নয়, ঢাকা এক সময় ছিল কারখানার শহর। ভোরের আলো ফুটতেই এখানে জেগে উঠত হাতের করাত, ছেনি আর লোহার যন্ত্র। শিল্প এখানে কখনো রাজকীয়, কখনো কুটির, কখনো বিশ্ববাণিজ্যের স্রোতে ভাসমান, আবার কখনো ইতিহাসের ভারে ন্যুব্জ। সময়ের এ দীর্ঘ আবর্তে হারিয়ে যাওয়া তেমনই এক পেশা কুন্দকার বা খুন্দিগর। হাড়, শিং আর দাঁতের স্পর্শে যে শিল্প একদিন ঢাকাকে পরিচিত করিয়েছিল বহির্বিশ্বে, আজ তা কেবল স্মৃতি আর নথির ভাঁজে।

কুন্দকার ও তাদের তৈরি শিল্প

কুন্দকার পেশাটি বাংলাদেশের কারুশিল্পের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল অধ্যায়। কুন্দকার হচ্ছে টার্নারের বাংলা প্রতিশব্দ। কুন্দকার শব্দের অর্থ, যিনি কুঁদ যন্ত্রের কাজ করেন বা কারিগর। তবে কারিগর সমাজে 'কুন্দকার' শব্দটি একটি বিশেষ ধরনের কারিগরির পেশা নির্দেশ করে- যারা শিং, হাড়, দাঁত দিয়ে বিভিন্ন ব্যবহার্য জিনিস বানায়। আরবিতে এ কারিগরদের 'খররাত' বলা হয়। ঢাকায় কুন্দকারকে খুন্দিগরও বলা হয়। ধারণা করা হয়, ফারসি শব্দ কুন্দিকার থেকে খুন্দিগর শব্দটির উৎপত্তি।

মূলত হাতি, হরিণ, গণ্ডার, মহিষ ও গরুর দাঁত, শিং ও হাড়- এ কাঁচামাল থেকেই তৈরি হতো দৈনন্দিন ও শৌখিন পণ্য। চিরুনি, বোতাম, পাশার ছক, পানপাত্র, পেয়ালা, কৌটা, তীর-ধনুক, আতরদানি, তলোয়ার পাখা কিংবা বাদ্যযন্ত্র- সবকিছুর মাঝেই ছিল নিখুঁত হাতের ছাপ। শিল্পের কাঁচামাল আসত গাজীপুর, সিলেট, সুন্দরবন, চট্টগ্রাম, আসাম, আরাকান ও রেঙ্গুনের জঙ্গল থেকে।

এ শিল্প ছিল শ্রমনির্ভর ও ধৈর্যের এক পরীক্ষা। প্রথমে হাত করাত দিয়ে মহিষের শিংয়ের অগ্রভাগের পুরু অংশ কাটা হতো, যা দিয়ে তৈরি হতো বোতাম। আর চিরুনি তৈরি হতো শিংয়ের গোড়ায় ফাঁপানো অংশ দিয়ে।

শিং কাটা, পানিতে ভিজিয়ে রাখা, বারশোলা দিয়ে চেছে সমান করা, চাপড়া বানানো—প্রতিটি ধাপেই ছিল নিখুঁত হিসাব। বোতাম কাটা হতো হাতে ঘুরানো যন্ত্রে, পালিশ চলত কয়লার গুঁড়া আর কম্বলের টুকরায়।

চিরুনি তৈরিতে ছিল আরো সূক্ষ্মতা। শিং গরম করে সোজা করা, কাঠের তক্তার মাঝে চাপ দিয়ে সমান করা, তারপর দাঁত কাটা। মাছের নকশা, হাতির মাথা, ময়ূরপঙ্খী—চিরুনির গায়ে ফুটে উঠত শিল্পীর কল্পনা। চিরুনির প্রতিশব্দ কাঙ্গি থেকে এ শিল্পকে কাঙ্গিসাজ শিল্পও বলা হতো।

ঢাকায় কুন্দকার পেশার আগমন

কুন্দকার শিল্পের সূচনা বা আগমনকাল ঠিক কবে, তা নির্ণয় করা কঠিন। তবে ধারণা করা হয়, মোঘল শাসনামলে এ শিল্পের বিকাশ ঘটেছিল। সে সময় ঢাকার বাণিজ্যিক গুরুত্ব নতুন মাত্রা পায়। প্রশাসনিক কেন্দ্রের পাশাপাশি শহরটি হয়ে ওঠে শিল্প ও পেশাজীবীদের আশ্রয়স্থল। দূর-দূরান্ত থেকে দক্ষ কারিগরদের এনে বসবাসের ব্যবস্থা করা হয়।

এমন প্রেক্ষাপটেই জনপ্রিয় হয় কুন্দকার পেশা। লালবাগ কেল্লা সংলগ্ন আমলিগোলা, নবাববাগিচা, হাজারীবাগ, মসজিদগঞ্জ, চৌধুরী বাজার, পোস্তা, গোড়ে শহীদ, খাজে দেওয়ান, রহমতগঞ্জ—পুরান ঢাকার এ এলাকাগুলো এক সময় ছিল কাঙ্গিসাজ শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। বিচ্ছিন্নভাবে বসবাসকারী মুসলমান শিল্পী পরিবারগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কাজ করতো হাতর দাঁত ও শিং নিয়ে। ইতিহাসবিদদের বর্ণনায় উঠে আসে, ঢাকায় খেদা অফিস থাকায় হাতির দাঁত সংগ্রহ ছিল সহজ। সেই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে শিল্পীরা দাঁত আর শিংকে রূপ দিতেন ব্যবহার্য শিল্পপণ্যে।

পুরান ঢাকা থেকে বিশ্ববাজারে

মহিষের হাড়ের তৈরি চিরুনি ভারতবর্ষে বিশেষ জনপ্রিয়তা পায়। এক সময় ঢাকার এ শিল্প বিশ্ববাণিজ্যের অংশ হয়ে ওঠে নিখুঁত কারুকাজের মাধ্যমে। ঢাকার পণ্য পৌঁছে যেত ভারতবর্ষ ছাড়িয়ে ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্যের অভিজাত বাজারে।

ইংরেজ শাসনে সংকোচন, দ্বিতীয় যুদ্ধে অপ্রত্যাশিত জাগরণ

ইংরেজ শাসনামলে বদলে যেতে থাকে বাণিজ্যের সমীকরণ। শাসন-শোষণ আর রফতানি জটিলতায় এ শিল্প ক্রমশ সংকুচিত হতে থাকে। বন্ধ হতে থাকে কারখানা, পেশা বদলাতে বাধ্য হন শ্রমিকরা। অনেক পরিবার পাড়ি জমায় রেঙ্গুন, চট্টগ্রাম, বরিশাল কিংবা কলকাতায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ যেন এ শিল্পের জন্য এক অদ্ভুত আশীর্বাদ হয়ে আসে। ইংরেজ সেনাবাহিনীর বিপুল সৈন্যসংখ্যার জন্য প্রয়োজন হয় লাখ-লাখ বোতাম। সেই চাহিদা পূরণে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে কুন্দকাররা। লালবাগের ঘরে ঘরে কুটির শিল্প হিসেবে শুরু হয় মহিষের শিংয়ের বোতাম তৈরি। পরিবারের সবাই যুক্ত হন কাজে। অল্প সময়েই পুরান ঢাকার অনেক ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন বিত্তশালী। দুর্ভিক্ষের সময়ও এ শিল্প সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলো ছিল উৎসবমুখর, যা ইতিহাসের এক নির্মম বৈপরীত্য।

বিলুপ্তির কারণ

যুদ্ধ শেষ হলো, শেষ হলো অস্থায়ী সমৃদ্ধিও। সেই সঙ্গে কাঁচামালের অভাব ও বাজারে এলো প্লাস্টিক ও নাইলনের বিকল্প পণ্য। সস্তা, টেকসই আর দ্রুত উৎপাদনযোগ্য এসব পণ্যের কাছে হার মানল এ শিল্প। পাকিস্তান আমলে শিল্পটি টিকে ছিল ক্ষীণ শ্বাসে। নতুন প্রজন্মের অনাগ্রহ, শ্রম ও উপার্জনের তারতম্য, পেশার মর্যাদার অভাব ও সরকারি বা বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে স্বাধীনতার পর ঢাকা থেকে পুরোপুরি হারিয়ে যায় প্রাচীন ঢাকার এ ঐতিহ্যবাহী শিল্প ও পেশা।

আভিজাত্যের পথে কুন্দকার পেশার নীরব প্রত্যাবর্তন

সময় বদলেছে, বদলেছে ব্যবহারের ভাষাও। এক সময় যে পণ্য ছিল দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গ, আজ তা ফিরে আসছে আভিজাত্যের চিহ্ন হয়ে—পরিবেশবান্ধব ও হাতে তৈরি শৌখিন সামগ্রী হিসেবে। হারিয়ে যাওয়া কাঙ্গিসাজ শিল্প তাই পুরোপুরি বিদায় নেয়নি; বরং ক্ষুদ্র পরিসরে, নীরবে আবার শিকড় গুঁজছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।

পরিবেশ রক্ষা ও প্রাকৃতিক উপকরণের ব্যবহারে বিশ্বজুড়ে আগ্রহ বাড়ায়, হাড় ও শিং দিয়ে তৈরি পণ্যের প্রতি নতুন করে ঝুঁকছেন উদ্যোক্তারা। বিদেশী বাজারে এই পণ্যের চাহিদা ব্যবসায়ীদের সাহস জোগাচ্ছে—পুরনো শিল্পকে নতুন ভাষায় ফিরিয়ে আনার।

ইতোমধ্যে রাজধানীসহ দেশের কয়েকটি অঞ্চলে কাঙ্গিসাজ শিল্পের ক্ষুদ্র বাজার গড়ে উঠছে। সৈয়দপুরে গরু ও মহিষের শিং এবং হাড় থেকে তৈরি হচ্ছে উন্নতমানের বোতাম। পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে চিরুনি ও নান্দনিক শোপিস। সূক্ষ্ম নকশা, আধুনিক ডিজাইন আর প্রাকৃতিক উপকরণের সম্মিলনে তৈরি এসব পণ্য রপ্তানি হচ্ছে চীন, অস্ট্রেলিয়া, হংকং, জার্মানিসহ বিশ্বের নানা দেশে। রাঙ্গামাটি ও যশোরেও ব্যক্তিপর্যায়ে কেউ কেউ তৈরি করছেন পশুর শিং বা হাড়ের চিরুনি।

ইতিহাসের ধুলো ঝেড়ে কুন্দকার পেশা আবার ফিরছে—ভিন্ন রূপে, ভিন্ন বাজারে। সময়ের কালচক্রে এ যেন পুরনো শিল্পের এক শান্ত, সংযত পুনর্জন্ম।

আরও