সিনেমা দেখতে বসে বিরতি ছাড়াও অনেকের টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে? দোষটা শুধু মূত্রথলির নয়, সিনেমার দৈর্ঘ্যও বাড়ছে। বড় বাজেটের হলিউডি ব্লকবাস্টার থেকে শুরু করে আর্টহাউজ সিনেমা—সব ধরনের সিনেমাই যেন ক্রমে দীর্ঘ হচ্ছে। একসময় ৯০ মিনিটের সিনেমা ছিল পরিচিত মানদণ্ড। এখন আড়াই ঘণ্টা পেরিয়ে তিন ঘণ্টার কাছাকাছি পৌঁছানোও অস্বাভাবিক নয়। দর্শকের ধৈর্য্যের পরীক্ষা নেয়ার পাশাপাশি সিনেমার দৈর্ঘ্য নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন আলোচনা।
বাংলাদেশ বা ভারতে সিনেমায় আড়াই ঘণ্টা থেকে তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্য নতুন কোনো বিষয় নয়। এখনো এভাবে স্থানীয় সিনেমার জন্য স্লট বরাদ্দ হয়। হলিউড বা পশ্চিমা সিনেমায় এটি আগে ছিল বিরল ঘটনা। কিন্তু সম্প্রতি দীর্ঘ সিনেমা নতুন বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। এ বিষয়ে সম্প্রতি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা এপি।
প্রচলিত ধারণায় বলা হয়—সিনেমা যত দীর্ঘই হোক, সেটি ভালো লাগলে সময় দ্রুত কেটে যায়। আবার ছোট সিনেমাও কখনো দীর্ঘ মনে হতে পারে। তবে শুধু দর্শকের অভিজ্ঞতা নয়, পরিসংখ্যানও বলছে, সিনেমার দৈর্ঘ্য বাড়ছে। গবেষক স্টিফেন ফলোস ১৯৮০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া ৩৬ হাজার ৪৩১টি সিনেমা বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ব্যাপকভাবে মুক্তি পাওয়া সিনেমার গড় দৈর্ঘ্য ১০৬ মিনিট থেকে বেড়ে ১১৪ মিনিট হয়েছে।
দর্শকদের কাছে অবশ্য এ পরিবর্তন খুব একটা বিস্ময়কর নয়। নতুন সিনেমা মুক্তির আগে এখন নিয়মিত আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে, কতক্ষণ চলবে। ক্রিস্টোফার নোলানের ‘দ্য ওডিসি’র দৈর্ঘ্য ১৭৩ মিনিট ঘোষণার পর অনেকের কাছে কঠিন চ্যালেঞ্জ মনে হয়েছিল। যেন সত্যি সত্যি সাইক্লপসের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
তবে দীর্ঘ দৈর্ঘ্য যে দর্শক টানতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তার প্রমাণ নেই। বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বেশি সময়ের সিনেমাই দর্শকের আগ্রহ বাড়াচ্ছে। চলতি বছরের সর্বোচ্চ আয় করা সিনেমাগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ‘দ্য ওডিসি’। ছবিটির টিকিট বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ১৮০ কোটি ডলার। অস্কারের সেরা চলচ্চিত্র বিভাগেও এটিকে এগিয়ে থাকা প্রতিযোগী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
‘সানরাইজ অন দ্য রিপিং’ সিনেমার দৃশ্য
সিনেমার দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির প্রভাব পড়ছে চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজনেও। গত বছর ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের আগে উৎসব পরিচালক আলবার্তো বারবেরা বলেছিলেন, ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট থেকে ২ ঘণ্টা ৩০ মিনিটের সিনেমা এখন ‘নতুন আন্তর্জাতিক মানদণ্ড’ হয়ে উঠেছে। তার মতে, এত দীর্ঘ সিনেমা উৎসবের সময়সূচি সাজানো কঠিন করে তোলে। পাশাপাশি, ভালো অনেক সিনেমা সম্পাদনার মাধ্যমে ১০ থেকে ২০ মিনিট ছোট করা গেলে আরো কার্যকর হয়ে উঠতে পারত।
এ বছর অস্কারের সম্ভাব্য প্রতিযোগী হিসেবে আলোচিত তিন সিনেমা ‘দ্য ওডিসি’, ‘লা বোলা নেগ্রা’ ও ‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’—সব কটিই আড়াই ঘণ্টার বেশি দীর্ঘ। এর মধ্যে ‘লা বোলা নেগ্রা’র দৈর্ঘ্য ১৫৯ মিনিট এবং ‘ইউ ক্যান সি এভরিথিং’-এর ১৭৪ মিনিট। শুধু পুরস্কারের দৌড়ে থাকা সিনেমাই নয়, জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজিও দীর্ঘ হচ্ছে। আসন্ন ‘হাঙ্গার গেমস’ সিনেমা ‘সানরাইজ অন দ্য রিপিং’-এর দৈর্ঘ্য ১৫৮ মিনিট, যা ফ্র্যাঞ্চাইজিটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ।
স্ট্রিমিংয়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দীর্ঘ হচ্ছে সিনেমা
বাড়িতে বসে স্ট্রিমিং প্লাটফর্মে সিনেমা দেখার সুযোগ বেড়ে যাওয়ায় প্রেক্ষাগৃহের চলচ্চিত্রগুলোকে নিজেদের আলাদা আকর্ষণ তৈরি করতে হচ্ছে। বড় পর্দা, উন্নত শব্দব্যবস্থা ও দর্শনীয় দৃশ্যের পাশাপাশি দীর্ঘ দৈর্ঘ্যও এখন সিনেমাকে বিশেষ আয়োজন হিসেবে উপস্থাপনের একটি উপায়। দর্শককে ঘর থেকে বের করে প্রেক্ষাগৃহে আনতে সিনেমাকে আরো বড় অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা চলছে।
এই প্রবণতা সম্পর্কে ভালো ধারণা রয়েছে ‘অ্যাভেঞ্জার্স’ সিরিজের চলচ্চিত্র নির্মাতা জো রুশো ও অ্যান্থনি রুশোর। তাদের আসন্ন সিনেমা ‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’র দৈর্ঘ্য এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি। তবে ছবিটি কতক্ষণ চলবে, তা নিয়ে এরই মধ্যে নানা আলোচনা শুরু হয়েছে।
জো রুশোর মতে, সিনেমাটি প্রায় আড়াই ঘণ্টার হতে পারে। ‘অ্যাভেঞ্জার্স: এন্ডগেম’-এর তিন ঘণ্টার দৈর্ঘ্যের তুলনায় এটি ছোট হবে। মার্ভেল সিনেম্যাটিক ইউনিভার্সের বড় একটি অংশকে এক ছবিতে ধারণ করার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে আড়াই ঘণ্টাও তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত।
রুশোর মতে, দর্শকের কাছে সিনেমাকে বিশেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে দৈর্ঘ্য ভূমিকা রাখতে পারে। এতে দর্শকের মনে হতে পারে, টিকিটের দাম অনুযায়ী তারা যথেষ্ট বিনোদন পেয়েছেন। তবে দীর্ঘ হলেই যে সিনেমা ভালো হবে, তা নয়। গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী সিনেমার দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করাই গুরুত্বপূর্ণ। তার ভাষায়, গল্পটি যদি সাড়ে তিন ঘণ্টায় বলা প্রয়োজন হয়, সেটিও ঠিক; আড়াই ঘণ্টায় বলা গেলে সেটিও ঠিক।
‘অ্যাভেঞ্জার্স: ডুমসডে’ সিনেমার দৃশ্য
গল্প বলার জন্য সময় চান হামাগুচি
বাণিজ্যিক ব্লকবাস্টারের বিপরীতে দাঁড়িয়েও দীর্ঘ সিনেমা নির্মাণ করছেন জাপানি পরিচালক রিউসুকে হামাগুচি। তার চলচ্চিত্রে সুপারহিরোদের দ্রুতগতির অ্যাকশন নেই; বরং মানুষের জীবন, সম্পর্ক ও অনুভূতির স্বাভাবিক গতিই প্রধান।
২০২১ সালে মুক্তি পাওয়া তার ‘ড্রাইভ মাই কার’ প্রায় তিন ঘণ্টার সিনেমা। ছবিটি সেরা চলচ্চিত্র বিভাগে অস্কারের মনোনয়ন পাওয়া প্রথম জাপানি সিনেমা। প্রচলিত কাহিনিনির্ভর নির্মাণরীতির বদলে হামাগুচি ধীরস্থিরভাবে চরিত্র ও পরিস্থিতি বিকশিত করার ওপর জোর দেন।
সম্প্রতি কান চলচ্চিত্র উৎসবে তার নতুন সিনেমা ‘অল অব আ সাডেন’-এর প্রিমিয়ারের পর এক সাক্ষাৎকারে হামাগুচি বলেন, প্রচলিত ধারার অনেক সিনেমায় কাহিনি এগিয়ে নিতে নির্মাতারা ঘটনাপ্রবাহকে নির্দিষ্ট দিকে ঠেলে দেন। তার কাছে এ পদ্ধতি অস্বস্তিকর। তার নতুন সিনেমাটির দৈর্ঘ্য ১৯৭ মিনিট, মুক্তি পাবে ২৫ নভেম্বর।
‘অল অব আ সাডেন’ সিনেমার পোস্টার
৯০ মিনিটের সিনেমা কি হারিয়ে যাচ্ছে?
দীর্ঘ সিনেমার প্রবণতা বাড়লেও সব নির্মাতা এ পথে হাঁটছেন না। পোলিশ পরিচালক পাওয়েল পাভলিকোভস্কি টানা তিনটি প্রশংসিত সিনেমা নির্মাণ করেছেন, যেগুলোর প্রতিটির দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট বা তার কম। তার সর্বশেষ সিনেমা ‘ফাদারল্যান্ড’ মাত্র ৮২ মিনিটের।
ছবিটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানিতে ভ্রমণরত নোবেলজয়ী জার্মান ঔপন্যাসিক টমাস মান ও তার মেয়ে এরিকার গল্প তুলে ধরা হয়েছে।
দীর্ঘ সিনেমার বিরোধী নন পাভলিকোভস্কি। তবে তার মতে, কিছু সিনেমায় অপ্রয়োজনীয়ভাবে একের পর এক সমাপ্তি যোগ করা হয়, যা গল্পের প্রয়োজনের চেয়ে নির্মাতার প্রদর্শনেচ্ছাকেই বেশি প্রকাশ করে। ডেভিড লিনের ১৯৬২ সালের ২২২ মিনিটের মহাকাব্যিক সিনেমা ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’র উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ওই সিনেমার দৈর্ঘ্য ও এর বিস্তৃত প্রেক্ষাপটের মধ্যে সামঞ্জস্য ছিল। কিন্তু সব সিনেমার ক্ষেত্রে তা দেখা যায় না।
পাভলিকোভস্কির কাছে সংক্ষিপ্ত করে গল্প বলারও আলাদা মূল্য রয়েছে। তার বিশ্বাস, সিনেমা কিংবা যেকোনো শিল্পমাধ্যমে অপ্রয়োজনীয় উপাদান বাদ দিয়ে মূল বিষয়টিকে তুলে ধরতে পারলে অভিজ্ঞতা আরো সমৃদ্ধ হতে পারে।
সিনেমার দৈর্ঘ্য বাড়ার এ সময়ে তাই প্রশ্নটি শুধু কতক্ষণ দর্শককে প্রেক্ষাগৃহে বসিয়ে রাখা যায়, তা নয়। বরং গল্পটি কতটা সময় দাবি করে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ। কারো কাছে তিন ঘণ্টা প্রয়োজনীয়, কারো কাছে ৮২ মিনিটই যথেষ্ট। শেষ পর্যন্ত সিনেমার সার্থকতা সময়ের দৈর্ঘ্যে নয়, সেই সময়কে পর্দায় কতটা অর্থবহ করে তোলা যাচ্ছে, তার ওপরই নির্ভর করে।