মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি ‘মসনভি শরীফ’ শুরু করেছেন বাঁশির আর্তনাদ দিয়ে— যাকে ফারসিতে বলা হয় ‘নে’। একটি দীর্ঘ সুফি কাব্যের শুরুতে কেন বাঁশিকেই বেছে নিলেন? কেন কোনো উপদেশ বা ধর্মীয় বাণী দিয়ে শুরু না করে পাঠকের সামনে হাজির করলেন বিচ্ছিন্ন বাঁশির আর্তনাদ?
এসব সওয়ালের জবাব লুকিয়ে আছে বাঁশির সুরের মধ্যেই। রুমির বাঁশি শুধু বাদ্যযন্ত্র নয়। বরং এমন এক সত্তা, যে তার উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং সেই বিচ্ছেদের বেদনা থেকেই গান গাইছে। তার সুরের মধ্যে আছে হারানোর স্মৃতি, ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা এবং এমন এক বিরহ; যার গভীরে রয়েছে নিজের প্রকৃত উৎসকে খুঁজে পাওয়ার তাগিদ। বাঁশির আর্তনাদ আসলে মানুষের আত্মিক অবস্থার একটি রূপক হয়ে ওঠে।
মাওলানা রুমি মসনভির শুরুতেই বলেন,
বাঁশির সুর শুনেছ?
কেমন বেদনার?
নলখাগড়ার বন থেকে কেটে, বিচ্ছিন্ন করে যে বাঁশি বানানো হয়েছে
‘বেদনা’ ছাড়া তার সুর আর কী-ই বা হতে পারে?
রুমির বাঁশি একসময় ছিল নলখাগড়া বনের অংশ। তাকে সেখান থেকে কেটে আলাদা করা হয়েছে। এখন আর বনের সঙ্গে নেই; তার অস্তিত্ব আলাদা, তার কণ্ঠও আলাদা। কিন্তু সেই বিচ্ছেদে জন্ম নিয়েছে সুর। সে তার বেদনার কথা বলে, আর সেই বেদনা বুঝতে পারে তারাই, যাদের হৃদয়ও কোনো বিচ্ছেদে বিদীর্ণ হয়েছে।
মানুষের অভিজ্ঞতাও অনেকটা এ রকম। জীবনের এক পর্যায়ে মানুষ বুঝতে পারে, বাহ্যিকভাবে তার সম্পর্ক, পরিচয়, সাফল্য, সম্পদ সবকিছু থাকার পরও কোথাও যেন একটি অপূর্ণতা রয়ে গেছে। সে হয়তো জানে না সেই অপূর্ণতা কী। কিন্তু অনুভব করে, কোনো এক গভীরতর কিছুর জন্য তার ভেতরে টান আছে। এ টান আত্মিক, আধ্যাত্মিক। পরম সত্ত্বার সঙ্গে তার সাক্ষাতের আকাঙ্ক্ষা।
সুফি পাঠে এ আকাঙ্ক্ষাকে মানুষের প্রকৃত উৎসের দিকে ফিরে যাওয়ার তাগিদ হিসেবে দেখা হয়। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক উৎস, যেখান থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার অনুভূতি মানুষের মধ্যে ফিরে যাওয়ার বাসনা তৈরি করে।
এ জায়গায় রুমির প্রেমের ধারণাটি সামনে আসে। বাঁশির বেদনা আসলে প্রেমের বেদনা। কারণ যার প্রতি কোনো টান নেই, তার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কষ্টও নেই। আর যার প্রতি প্রেম আছে তার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া বা তার থেকে দূরত্বই আকুলতাকে তীব্র করে। তাই রুমির কবিতায় প্রেম ও বিরহ পরস্পরের বিপরীত নয়। বরং বিরহের মধ্যেই প্রেম তার গভীরতম রূপ পায়।
বাঁশির আরেকটি দিকও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো তার ভেতরের শূন্যতা। বাঁশি ফাঁপা বলেই তার মধ্য দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে এবং সেই প্রবাহ সুরে পরিণত হয়। এ বাস্তব বৈশিষ্ট্যটিকে রুমির কবিতার ওপর একটি সুফিবাদী ও দার্শনিক বিষয় হিসেবে পাঠ করা যায়। মানুষের ভেতরও যদি অহংকার, আত্মম্ভরিতা ও নিজের পূর্ণতার দাবিতে সবটুকু ভরে থাকে, তাহলে সেখানে অন্য কোনো সত্যের জন্য জায়গা থাকে না।
‘মসজিদ দর্শন’ বইয়ে সদরুদ্দিন চিশতি দেখিয়েছেন, মানুষ যখন তার ভেতরের জগৎ নফসানিয়্যাতের প্ররোচনা থেকে পবিত্র রাখতে পারেন, তখন তার ভেতর মসজিদে রূপ নেয়। এ বিষয়ের মাধ্যমে আমরা অস্তিত্ব সন্ধানের উৎস খুঁজতে পারি। চিশতি এ উৎস দেখিয়েছেন, রূহের জগৎ পর্যন্ত। তিনি রূহের জগৎ থেকে পরকাল পর্যন্ত একটা দাগ এঁকেছেন। রূহের জগতই হলো আদি উৎস। যেখানে মানুষ খোদার সঙ্গে কথা বলেছেন, প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এরপর মানুষ বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে এ দুনিয়ায় আসেন। এসময় আদি উৎসের সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়। পৃথিবীতে আসার পর তার নফসানিয়্যাত তাকে ঘিরে ধরে। অহংকার, আত্মম্ভরিতা, লোভ, হিংসা, লালসা তাকে ঘিরে ধরে। এসবের মধ্যেও মাঝে মাঝে আদি উৎসে ফেরার বেদনা তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে।
এ আদি উৎসে ফিরতে নফসানিয়াতের রিপু থেকে মুক্ত হয়ে নিজেকে শূন্য হতে হয়। সেই শূন্যতার মধ্য দিয়ে মানুষ নিজেকে একটি বৃহত্তর সত্যের কাছে উন্মুক্ত করতে পারে। বাঁশি নিজে বাতাস নয়, কিন্তু বাতাস তার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হলে সে সুর হয়ে ওঠে। একইভাবে মানুষও নিজের ‘আমিত্ব’-কে কিছুটা সরিয়ে দিতে পারলে তার ভেতরের শূন্যস্থানে এমন এক সত্য বহন করতে পারে, যা তাকে আদি উৎসে নিয়ে যাবে।
বাঁশির সুরের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তার গভীর রহস্য বাইরে থেকে দেখা যায় না। মানুষ বাঁশিকে দেখতে পারে, তার কাঠামো স্পর্শ করতে পারে; কিন্তু তার সুরের ভেতরে যে বেদনা, আকাঙ্ক্ষা ও রহস্য, তা চোখে ধরা পড়ে না। রুমি এখানেও মানুষের সঙ্গে বাঁশির একটি সম্পর্ক তৈরি করেন। মানুষের বাহ্যিক পরিচয় দেখা যায়, কিন্তু তার অন্তর্গত জগৎ দেখা যায় না। একজন মানুষের সবচেয়ে গভীর বেদনা, প্রেম কিংবা আত্মিক অনুসন্ধান তার বাহ্যিক জীবনের আড়ালেই থেকে যেতে পারে।
এ কারণেই বাঁশির সুরকে স্মৃতির ভাষা হিসেবেও বোঝা যায়। সে যেন তার উৎসকে ভুলে যায়নি। তার কান্নার মধ্যে সেই হারানো অবস্থার স্মৃতি রয়েছে। মানুষের মধ্যেও কখনো এমন একটি স্মৃতি জেগে ওঠে, যা তাকে নিজের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করতে বাধ্য করে, আমি কোথা থেকে এসেছি? কেন আমার ভেতরে এ অস্থিরতা? আমি আসলে কী খুঁজছি?
এ প্রশ্নই রুমির কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধ্যাত্মিক যাত্রা সবসময় উত্তর দিয়ে শুরু হয় না; অনেক সময় শুরু হয় একটি গভীর প্রশ্ন দিয়ে। মানুষ যখন নিজের ভেতরের অস্থিরতাকে শুধু দমন না করে তার অর্থ খুঁজতে শুরু করে, তখনই তার অনুসন্ধানের পথ খুলে যায়।
রুমির বাঁশির ‘ফিরে যাওয়া’ মূলত নিজের প্রকৃত উৎসের দিকে প্রত্যাবর্তন। মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেয়, সম্পর্ক গড়ে, জ্ঞান অর্জন করে, সাফল্য ও ব্যর্থতার মধ্য দিয়ে যায়; কিন্তু এর পাশাপাশি তার মধ্যে চলতে থাকে আরেকটি যাত্রা—নিজেকে বোঝার এবং নিজের অস্তিত্বের উৎসের দিকে ফিরে যাওয়ার যাত্রা।
এ জায়গায় রুমির নিজের জীবনও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। শামস-ই তাবরিজের সঙ্গে সাক্ষাতের পর তার জীবনে যে গভীর পরিবর্তন এসেছিল, তা রুমির আধ্যাত্মিক জগতকে নতুন মাত্রা দেয়। শামসের সঙ্গে সম্পর্কের আগে রুমি ছিলেন ধর্মীয় জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যের জগতে প্রতিষ্ঠিত একজন আলেম। পরে তার কবিতায় দেখা যায় তীব্র প্রেম, বিরহ ও আত্মিক আকাঙ্ক্ষার বিস্ফোরণ।
সুফি পথের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—পথপ্রদর্শক। আত্মিক অনুসন্ধান শুধু নিজের ভেতরে তাকানোর বিষয় নয়; এ পথে একজন অভিজ্ঞ পথপ্রদর্শকের প্রয়োজনীয়তার কথাও সুফি ঐতিহ্যে গুরুত্ব পেয়েছে। রুমি নিজেও বিষয়টি তার রচনায় এনেছেন। শামসের সঙ্গে তার সম্পর্ককে পরবর্তী সুফি ঐতিহ্য সেই আধ্যাত্মিক গুরু-শিষ্য সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে দেখেছে।
রুমির বাঁশির আর্তনাদের মধ্যে একইসঙ্গে কয়েকটি স্তর কাজ করে। বিচ্ছেদ তাকে তার উৎসের কথা মনে করায়; সেই স্মৃতি জন্ম দেয় আকাঙ্ক্ষার; আকাঙ্ক্ষা প্রেমকে গভীর করে; প্রেম মানুষকে নিজের ভেতরের দিকে ফিরিয়ে নেয়। আর নিজের গভীরে তাকাতে তাকাতেই মানুষ একসময় প্রশ্ন করে—সে কোথা থেকে এসেছে এবং কোথায় ফিরে যেতে চায়।
এ কারণেই রুমির বাঁশি এত শক্তিশালী প্রতীক। সে পূর্ণতার দাবি করে না; বরং নিজের অপূর্ণতাকে স্বীকার করে। তার কণ্ঠের শক্তি আসে সেই বেদনা থেকে, যে বেদনা তাকে তার উৎসের কথা ভুলতে দেয় না।
রুমির বাঁশি আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়— মানুষের ভেতরে যে অপূর্ণতার অনুভূতি, তা কি কেবল কোনো পার্থিব অভাব? নাকি তার গভীরে রয়েছে এমন এক আকাঙ্ক্ষা, যার উৎস আরো গভীরে? রুমি এ বাঁশির মাধ্যমে এমন বিষয়ের অবতারণা করেছেন, মানুষ যে অস্তিত্ত্ব থেকে বিভিন্ন ধাপ পার হয়ে এ দুনিয়ায় এসেছে তার দিকে ফেরার পথ খোঁজা।
এ কারণেই মসনভি শুরু হয় বাঁশির কণ্ঠে। রুমির কাছে আধ্যাত্মিক যাত্রার শুরু কোনো চূড়ান্ত উত্তর দিয়ে নয়, বরং নিজের ভেতরের সেই অস্থিরতাকে চিনে নেয়ার মধ্য দিয়ে। সুতরাং রুমির বাঁশি কোনো সাধারণ বিরহের প্রতীক নয়। এটি এমন এক মানুষের প্রতীক, যে তার উৎস থেকে বিচ্ছিন্ন এবং সেই বিচ্ছেদের স্মৃতি থেকেই নিজের প্রকৃত পরিচয় ও প্রত্যাবর্তনের পথ খুঁজতে শুরু করেছে।