বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর কোনো সিনেমায় দেখা সেই ভবিষ্যৎ হয়তো আর খুব বেশি দূরে নেই, যেখানে মা-বাবারা ল্যাবরেটরিতে বসে নিজেদের পছন্দমতো নিখুঁত সন্তান ডিজাইন করতে পারবেন। মানুষের ভ্রূণের ডিএনএ পরিবর্তন বা ‘হিউম্যান জার্মলাইন এডিটিং’ নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে বিতর্ক চলছিল, তা নতুন এক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলে আবারো উস্কে উঠেছে।
সম্প্রতি ক্যামব্রিজ ও কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের দুটি পৃথক গবেষণায় দেখা গেছে, বিজ্ঞানীরা এখন আরো নিখুঁত প্রযুক্তির সাহায্যে মানুষের ভ্রূণের ডিএনএ পরিবর্তনের একেবারে দ্বারপ্রান্তে। যদিও মানবভ্রূণ নিয়ে ল্যাবে গবেষণা করার নিয়ম বেশিরভাগ দেশেই মাত্র ১৪ দিন পর্যন্ত সীমিত। এমনকি পৃথিবীর ৭০টি দেশে মানুষের ওপর এ প্রযুক্তির ব্যবহার আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তাছাড়া এটি এখনো পুরোপুরি নিরাপদ নয় এবং এ নিয়ে নৈতিক বিতর্কও শেষ হয়নি। তবুও এই নতুন আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের আশাবাদী করে তুলছে।
ফার্টিলাইজেশনের প্রথম সপ্তাহে একটি একক কোষ থেকে বিভক্ত হয়ে প্রায় ২০০ কোষের ব্লাস্টোসিস্টে পরিণত হওয়া একটি রূপান্তরিত বা এডিটেড মানব ভ্রূণ
এতদিন জিন এডিটিং বা জিনের বিন্যাস পরিবর্তনের জন্য বিশ্বজুড়ে মূলত ‘ক্রিসপার-ক্যাসনাইন’ (CRISPR-Cas9) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতো। যুগান্তকারী এ আবিষ্কারের জন্য ২০২০ সালে রসায়নে নোবেল পুরস্কারও দেয়া হয়। তবে এ প্রযুক্তিতে জিনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন, এমনকি পুরো ক্রোমোজোম হারানোর ঝুঁকিও দেখা গেছে। ২০১৮ সালে চীনা গবেষক হি জিয়ানকুই এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে এইচআইভি-প্রতিরোধী যমজ শিশুর জন্মের দাবি করলে বিশ্বজুড়ে তীব্র সমালোচনা হয় এবং পরে তিনি তিন বছরের কারাদণ্ড পান।
এ সমস্যার সমাধানে এখন এসেছে আরো উন্নত প্রযুক্তি, যার নাম ‘বেস এডিটিং’। এটি ডিএনএর একটি মাত্র অক্ষর পরিবর্তন করতে পারে, ফলে ভুল হওয়ার আশঙ্কাও অনেক কম। সম্প্রতি দুটি গবেষণায় গবেষকেরা গবেষণার জন্য দান করা আইভিএফ ভ্রূণে একই প্রযুক্তি প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন, এতে ক্রোমোজোমগত ত্রুটির ঝুঁকি আগের তুলনায় কম।
কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক সেন্টারে অত্যাধুনিক জিন প্রযুক্তি বেস এডিটিং নিয়ে কাজ করছেন গবেষক ক্যাটারিনা হারাসিমভ
২০২২ সালে যুক্তরাজ্যে এক কিশোরীর লিউকেমিয়া চিকিৎসায় এবং পরবর্তীতে এক শিশুর মারাত্মক জেনেটিক রোগের চিকিৎসায় সফলভাবে এই বেস এডিটিং ব্যবহার করা হয়। এবার বিজ্ঞানীরা আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) রোগীদের দান করা মানব ভ্রূণে এই প্রযুক্তি সফলভাবে পরীক্ষা করেছেন।
ক্যামব্রিজের অধ্যাপক ক্যাথি নিয়াকান বেস এডিটিং ব্যবহার করে ‘ন্যানগ’ (NANOG) নামের একটি জিনের কাজ শুরু করেছেন, যা ভ্রূণ তৈরিতে সাহায্য করে। অন্যদিকে কলম্বিয়ার অধ্যাপক ডিয়েট্রিচ এগলি এ প্রযুক্তির মাধ্যমে কোলেস্টেরল ও হিমোগ্লোবিন নিয়ন্ত্রণকারী জিন সফলভাবে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন।
নিষেকের প্রথম সপ্তাহে ন্যানগ (NANOG) জিন নিষ্ক্রিয় করতে বেস এডিটিং করা একটি প্রাথমিক মানব ভ্রূণের চিত্র
তবে বিজ্ঞানীরা সতর্কও করছেন। এখনো দুটি বড় সমস্যা রয়ে গেছে। প্রথমটি ‘মোজাইকিজম’—অর্থাৎ সব কোষে একই পরিবর্তন ঘটে না। দ্বিতীয়টি ‘অফ-টার্গেট’ প্রভাব, যেখানে অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্য জিনও বদলে যেতে পারে। তাই গবেষকদের মতে, ক্লিনিকাল পর্যায়ে পৌঁছাতে এখনো বহু ধাপ বাকি। একই সঙ্গে এ গবেষণা আইভিএফে কেন অনেক ভ্রূণ স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হয় না, সেটি বোঝারও সুযোগ তৈরি করছে।
কাড়ন জিন এডিটিংয়ের বিতর্কের জায়গাটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। নীতিশাস্ত্রবিদিদের মতে, উন্নত এই প্রযুক্তিটি ১৯৯৭ সালের বিখ্যাত সায়েন্স ফিকশন সিনেমা ‘গ্যাটাকা’র মতো এক চরম বৈষম্যমূলক সমাজ তৈরি করবে। যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডস ও স্পেনের অধিকাংশ মানুষ প্রাণঘাতী রোগ নিরাময়ে এ প্রযুক্তি সমর্থন করলেও ইতালিতে এর সমর্থন মাত্র ৪৬ শতাংশ।
এছাড়া প্রাণঘাতী বংশগত রোগ ঠেকাতে ভ্রূণের জিন এডিটিংয়ের যুক্তি থাকলেও এখান থেকেই ‘ডিজাইনার শিশু’ তৈরির পথ খুলে যেতে পারে। ধনী পরিবার চাইলে ভবিষ্যতে কাঙ্ক্ষিত বৈশিষ্ট্যের সন্তান বেছে নেবে, আর দরিদ্ররা সেই সুযোগ পাবে না— এমন বৈষম্যের আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না তারা।
—সিএনএন থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে