রানার: বাংলার হারিয়ে যাওয়া দূতদের কাহিনী

তারা ছিলেন বিশ্বাস ও দায়িত্বের প্রতীক। নবাব, জমিদার, সরকারি অফিস—সবারই খবর পৌঁছাত তাদের হাত ধরে। যুদ্ধের খবর, সরকারি আদেশ, বাণিজ্যিক লেনদেন—সবই যেত তাদের কাঁধে ঝুলে থাকা ব্যাগে।

রানারদের গল্প আজ ইতিহাস, কিন্তু তাদের পদচিহ্ন আজও টিকে আছে গ্রামীণ পথের ধুলোয়, পুরনো ডাকঘরের দেয়ালে, আর সুকান্তের কবিতার চরণে। তারা শুধু বার্তাবাহকই ছিলেন না, ছিলেন মানুষের হৃদয়ের দূত, সময়ের বুকে লেখা এক অনন্ত অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী।

একটা সময় ছিল, যখন চিঠি শুধু কাগজে লেখা কিছু বাক্য কিংবা ভাব আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং ছিল অনুভূতির স্পন্দন, দূরত্বের সেতু ও হৃদয়ের সংযোগ স্থাপনের মূল মাধ্যম। কিন্তু টেলিগ্রাম, টেলিফোন, আর পরে ইন্টারনেটের আগমনে ধীরে ধীরে হারিয়ে গেল সেই জগৎ। আর তার সঙ্গে হারিয়ে গেলেন সেই মানুষগুলো, যারা এক সময় শব্দকে কাঁধে করে বহন করতেন পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। তারাই ছিলেন রানার

সুকান্ত ভট্টাচার্যের অমর কবিতা ‘রানার’ আজও মনে করিয়ে দেয় সেই মানুষটিকে—যিনি ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে ছুটে চলেছেন, হাতে ঘণ্টাওয়ালা লাঠি, কাঁধে ব্যাগ, আর তাতে কারো ভালোবাসার কিংবা বেদনার বার্তা। কিন্তু এ রানাররা কারা ছিলেন? কোথা থেকে শুরু হয়েছিল তাদের দৌড়? আর কিভাবে তারা বিলীন হলেন ইতিহাসের অন্ধকারে? এ প্রশ্নগুলোর উত্তরেই লুকিয়ে আছে বাংলার এক বিস্মৃত অধ্যায়।

প্রাচীন সূত্রে রানারদের উৎপত্তি

রানারদের শিকড় নিহিত প্রাচীন ভারতীয় যোগাযোগ ব্যবস্থায়। বৈদিক যুগ থেকে সংবাদ বা বার্তা আদান-প্রদান চলত কখনো কবুতরের পায়ে বেঁধে, আবার কখনো পায়ে হেঁটে দূত পাঠিয়ে। তবে দুর্গম অঞ্চল ও পাহাড়ি পথে, যেখানে ঘোড়াও চলত না, সেখানেই নির্ভর করতে হতো এ পদবাহকদের ওপর।

পেশাটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায় দিল্লি সুলতানাতের আমলে। কুতবউদ্দিন আইবেক প্রথম পায়ে হাঁটা ডাকব্যবস্থা চালু করেন, যা পরবর্তীতে মুহাম্মদ বিন তুঘলক সম্প্রসারিত করেন। ইবনে বতুতা তার ভ্রমণকাহিনীতে লিখেছেন, তুঘলক দুই ধরনের ডাকব্যবস্থা চালু করেছিলেন, একটি ঘোড়ায় চড়া, আর আরেকটি পায়ে হাঁটা। এভাবেই তখন সিন্ধ থেকে দিল্লি পর্যন্ত বার্তা পৌঁছানো হতো।

পরবর্তীতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলে, তখন এ রানাররা সরকারি কাঠামোয় যুক্ত হন। যেখানে ঘোড়া বা পালকি পৌঁছতো না, সেখানে ছুটে যেতেন তারা। ১৭৭৪ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন কলকাতায় ডাক বিভাগ প্রতিষ্ঠা করে, তখন বেশ কিছু ডাক যোগাযোগ লাইন গঠন করা হয়েছিল, বিশেষ করে কলকাতা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, মুর্শিদাবাদ প্রভৃতি অঞ্চলের মধ্যে। এ পথ ধরেই মাইলের পর মাইল ছুটে চলতেন রানাররা।

বাংলায় রানারদের উত্থান

ব্রিটিশ শাসনকালে ইউরোপীয়রা ডাকব্যবস্থার অনুকরণে পায়ে হাঁটা বার্তাবাহক বা রানার নিয়োগ শুরু করলে বাংলার সর্বত্র জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এ পেশা। ঢাকা, ফরিদপুর, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রাজশাহীসহ নানা অঞ্চলে রানারদের উপস্থিতি হয়ে ওঠে নিত্যদিনের দৃশ্য।

রানাররা ছিলেন বিশ্বাস ও দায়িত্বের প্রতীক। নবাব, জমিদার, সরকারি অফিস—সবার খবর পৌঁছাত তাদের হাত ধরে। তাদের দেখলেই গ্রামের মানুষ চিৎকার করে বলত, “রানার এসেছে!”—এ যেন নতুন খবরের বার্তা, হোক তা আনন্দের বা বেদনার।

দৌড়ের নিয়ম জীবনযাত্রা

রানারদের পদ্ধতি ছিল এক অনন্য রিলে ব্যবস্থা। প্রতি ২–৩ মাইল অন্তর এক রানার ব্যাগ তুলে দিতেন পরের জনের হাতে। এভাবেই সংবাদ পৌঁছে যেত গন্তব্যে। তাদের মজুরি নির্ধারিত হতো দূরত্ব অনুযায়ী। সরঞ্জাম ছিল তাদের পেশার প্রতীক। ডাকাত বা বন্য প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে হাতে থাকা বাঁশের লাঠিতে বাঁধা থাকত ছুরি। আর লাঠির আগায় বাঁধা ঘণ্টা—যার ধ্বনি জানান দিত, “ডাক আসছে।” সেই ঘণ্টাধ্বনি থেকেই এসেছে সুকান্তের বিখ্যাত চরণ, “রাতের বেলায় বাজে ঘণ্টা।” তাদের জীবন ছিল দুঃসহ পরিশ্রম, দায়িত্ব ও বিপদের সমন্বয়। অন্ধকার রাতে, নির্জন জঙ্গলে, একা পথে তাদের শত্রু ছিল প্রকৃতি, ডাকাত আর সময়ের চাপ। সূর্য ওঠার আগে গন্তব্যে না পৌঁছানো মানেই শাস্তি।

পূর্ববঙ্গের প্রেক্ষাপটে রানার

তৎকালীন পূর্ববঙ্গ—অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশ—ছিল রানারদের অন্যতম চ্যালেঞ্জপূর্ণ এলাকা। নদী, কাদা পথ, জঙ্গল, আর অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা তাদের কাজকে করে তুলত কঠিন। তবু তারা নির্ভুলভাবে চিঠি পৌঁছে দিত ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, সোনারগাঁও, কলকাতা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর ও রাজমহল পর্যন্ত গড়ে ওঠা ডাকচৌকিগুলিতে। জেলা থেকে উপজেলা, আবার সেখান থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত— সবখানেই তাদের পদচিহ্ন ছিল।

অবসানের অধ্যায়

১৮৫১ সালে সিন্ধ প্রদেশে ‘সিন্ধ ডাক’ নামে ঘোড়া ও উটে ডাক পরিবহন শুরু ছিল রানারদের ওপর প্রথম আঘাত। এরপর ১৮৭০-এর দশকে চালু হয় রেলওয়ে মেইল সার্ভিস (আরএমএস)—যেখানে ডাক পরিবহনে বিপ্লব ঘটায় ট্রেন। রেলপথ, সড়ক, সাইকেল, মোটরসাইকেল, বাস—সবই ধীরে ধীরে তাদের জায়গা দখল করে নেয়। বিশ শতকে এসে টেলিগ্রাফ, টেলিফোন, পরে ইন্টারনেটের আগমনে চিঠি প্রচলন প্রায় হারিয়ে যায়। আজ “রানার” নামে কোনো পদ নেই। ডাকপিয়ন বা আধুনিক পোস্টম্যানরা তাদের উত্তরসূরি হলেও তারাও হারিয়ে যাচ্ছে আধুনিকতার গহ্বরে। ।

শেষ ঘণ্টাধ্বনি

রানারদের গল্প আজ ইতিহাস, কিন্তু তাদের পদচিহ্ন আজও টিকে আছে গ্রামীণ পথের ধুলোয়, পুরনো ডাকঘরের দেয়ালে, আর সুকান্তের কবিতার চরণে। তারা শুধু বার্তাবাহকই ছিলেন না, ছিলেন মানুষের হৃদয়ের দূত, সময়ের বুকে লেখা এক অনন্ত অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী।

আরও