জেব্রার গায়ে ডোরাকাটা দাগের রহস্য কী?

স্রেফ সাজসজ্জা নাকি বেঁচে থাকার কৌশলও!

তবে প্রশ্ন হলো— জেব্রার শরীর কি সাদা যার ওপর কালো দাগ, নাকি কালো যার ওপর সাদা দাগ? আফ্রিকান ওয়াইল্ডলাইফ ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, সব প্রজাতির জেব্রার চামড়ার রঙ আসলে কালো। তাদের প্রতিটি পশম যে ফলিকল থেকে জন্মায়, সেখানে থাকা মেলানোসাইট তাদের পশমের রং নির্ধারণ করে। কালো পশমে মেলানিন রঞ্জক প্রচুর থাকলেও সাদা পশমের ক্ষেত্রে এ কোষগুলো রং তৈরি করা বন্ধ করে দেয়। যেহেতু মেলানিন তৈরি হওয়াই জেব্রার স্বাভাবিক জৈবিক অবস্থা এবং সাদা দাগগুলো রঞ্জকের অনুপস্থিতি মাত্র। তাই বলা যায়, জেব্রা আসলে কালো রঙের প্রাণী, যার ওপর সাদা পশমের ডোরাকাটা দাগ রয়েছে।

প্রকৃতি বড়ই রহস্যময়। বনের সবুজ বা ধূসর প্রান্তরে জেব্রার শরীরজুড়ে সাদা-কালো দাগগুলো প্রথম দেখায় বেশ অদ্ভুত মনে হতে পারে। যেখানে অন্য সব বন্য প্রাণী নিজেদের লুকিয়ে রাখতে চারপাশের পরিবেশের সঙ্গে রং মিলিয়ে চলে, সেখানে জেব্রার এমন নজরকাড়া রূপ কেন? এটি কি শুধুই সৌন্দর্যের জন্য, নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো রহস্য? বিজ্ঞানীদের দীর্ঘ গবেষণায় জেব্রার এমন বিচিত্র সাজের পেছনে বেশ কিছু চমকপ্রদ কারণ বেরিয়ে এসেছে।

শিকারিকে বিভ্রান্ত করতে

জেব্রার ডোরার প্রধান কাজ হলো শিকারিকে ধোঁকা দেয়া। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘ডিসরাপ্টিভ কালারেশন’। যখন জেব্রারা দলবদ্ধভাবে দাঁড়ায় বা দৌড়ায়, তখন তাদের শরীরের ডোরাগুলো এক ধরনের ‘ভিজ্যুয়াল ইলিউশন’ তৈরি করে। এতে সিংহ বা হায়েনার মতো শিকারিরা সহজে আলাদা করে যে কোনো একটি জেব্রাকে লক্ষ্য করতে পারে না। জেব্রাদের এ ডোরাগুলো চলন্ত অবস্থায় তাদের মধ্যে এক ধরণের বিভ্রান্তি তৈরি করে। এতে শিকারি বুঝতে পারে না জেব্রাটি আসলে কোন দিকে যাচ্ছে বা কত দ্রুত এগোচ্ছে।

জেব্রারা দলবদ্ধভাবে দৌড়ানোর সময় ‘ডিসরাপ্টিভ কালারেশন’ এর কারণে ‘ভিজ্যুয়াল ইলিউশন’ তৈরি হয়। ফলে শিকারি খুব সহজেই বিভ্রান্তিতে পরে

জেব্রার চামড়া কি সাদা না কালো?

তবে প্রশ্ন হলো— জেব্রার শরীর কি সাদা যার ওপর কালো দাগ, নাকি কালো যার ওপর সাদা দাগ? আফ্রিকান ওয়াইল্ডলাইফ ফাউন্ডেশনের তথ্যানুযায়ী, সব প্রজাতির জেব্রার চামড়ার রঙ আসলে কালো। তাদের প্রতিটি পশম যে ফলিকল থেকে জন্মায়, সেখানে থাকা মেলানোসাইট তাদের পশমের রং নির্ধারণ করে। কালো পশমে মেলানিন রঞ্জক প্রচুর থাকলেও সাদা পশমের ক্ষেত্রে এ কোষগুলো রং তৈরি করা বন্ধ করে দেয়। যেহেতু মেলানিন তৈরি হওয়াই জেব্রার স্বাভাবিক জৈবিক অবস্থা এবং সাদা দাগগুলো রঞ্জকের অনুপস্থিতি মাত্র। তাই বলা যায়, জেব্রা আসলে কালো রঙের প্রাণী, যার ওপর সাদা পশমের ডোরাকাটা দাগ রয়েছে।

ছবি: বিবিসি ম্যাগাজিন

বিষাক্ত মাছি থেকে বাঁচার প্রাকৃতিক ঢাল

আফ্রিকার তপ্ত প্রান্তরে বিষাক্ত পতঙ্গের উপদ্রব খুব বেশি। এই পতঙ্গরা সাধারণত এক রঙা প্রাণীদের বেশি আক্রমণ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, জেব্রার শরীরের এ সাদা-কালো বিন্যাস আলোর প্রতিফলন বা পোলারাইজড লাইটকে বিক্ষিপ্ত করে দেয়। এতে পতঙ্গরা জেব্রার শরীরের ওপর ঠিকঠাকভাবে বসতে পারে না। অর্থাৎ এ ডোরাগুলো জেব্রার জন্য এক ধরনের প্রাকৃতিক ‘পেস্ট কন্ট্রোল’ হিসেবে কাজ করে, যা তাদের বিভিন্ন প্রাণঘাতী রোগ থেকে রক্ষা করে।

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য, জেব্রারা তাদের শরীরের সাদা দাগের পশম সম্পূর্ণ সমান্তরাল রেখে কেবল কালো দাগের পশমগুলো সোজা উপরের দিকে খাড়া করতে পারে

শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ

আরেকটি ব্যাখ্যায় বলা হয়, জেব্রার কালো দাগগুলো তাপ শোষণ করে শরীরকে উষ্ণ রাখে। আর সাদা দাগগুলো সূর্যের আলো প্রতিফলিত করে শরীরকে শীতল রাখে। সকালের প্রচণ্ড ঠান্ডায় কালো দাগের শোষিত তাপ জেব্রাকে ওম দেয়, আবার দুপুরের কড়া রোদে সাদা দাগগুলো শরীরকে অতিরিক্ত গরম হতে বাধা দেয়। এই সাদা ও কালো রঙের অদ্ভুত সমন্বয়ে জেব্রা তার শরীরের তাপমাত্রার ভারসাম্য বজায় রাখে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘থার্মোরেগুলেশন’।

গবেষকরা জানিয়েছেন, একই এলাকায় বেঁচে থাকা অন্য প্রাণীর তুলনায় জেব্রারা অনেক বেশি সময় ধরে তপ্ত রোদে ঘাস খেয়ে বেড়াতে পারে

পরিচয়ের ধারক

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, আমাদের প্রত্যেকের যেমন আলাদা ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙ্গুলের ছাপ থাকে, প্রতিটি জেব্রার শরীরের ডোরার নকশাও তেমনি আলাদা হয়। কোনো জেব্রার ডোরা দাগের সাথে অন্য কোনো জেব্রার ডোরা দাগ কখনোই হুবহু মেলে না। আর স্বতন্ত্র এ ডিজাইনের মাধ্যমেই পালের ভেতরে জেব্রারা একে অন্যকে চিনতে পারে। এছাড়াও তাদের এ নকশা মা জেব্রাকে তার সন্তান খুঁজে পেতে বা দলের সদস্যদের নিজেদের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক দৃঢ় করতেও সাহায্য করে।

জেব্রার এমন চমৎকার ডোরাকাটা দাগের রহস্য নিয়ে প্রাণীবিদরা এখনো গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন

প্রকৃতির এই নিখুঁত কারিগরি জেব্রাকে কেবল দৃষ্টিনন্দনই করেনি, বরং প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য দিয়েছে এক আশ্চর্য কবচ। স্রেফ সাদা-কালো দাগের এই মায়াজালই আজ জেব্রাকে বন্য জগতের এক অনন্য বিস্ময় করে তুলেছে।

—লাইফ সাইন্স ও ব্রিটানিকা থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে

আরও