ডিজিটাল টাইটানিক: অতলান্তিকের কিংবদন্তি এখন হাতের মুঠোয়

মডেলটির এত সূক্ষ্ম ও স্পষ্ট ডিটেইল রয়েছে যে, এর ভিডিও একটি বড় ঘরে প্রকৃত টাইটানিকের মতো আসল মাপেই দেখানো সম্ভব, যেখানে গবেষকেরা হেঁটে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি অংশ পরখ করতে পারেন।

গত বছর, নৌবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও টাইটানিক গবেষক পার্কস স্টিফেনসন জাহাজটির পাশে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে হেঁটে চারপাশটা ঘুরে দেখছিলেন। বয়লার কক্ষের জানালা দিয়ে উঁকি দিলেন, ইঞ্জিনের কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে চোখ রাখলেন। তিনি লক্ষ্য করলেন প্রপেলারের ফলার ওপর খোদাই করা ‘৪০১’ নম্বরটি—টাইটানিকের নিজস্ব আইডি। জাহাজের লোহার কাঠামো থেকে ঝুলছিল মরিচার ছোপ; ছড়িয়ে ছিল মোচড়ানো ধাতু ও হারিয়ে যাওয়া প্রাণের নিদর্শন।

তবে স্টিফেনসন ১২ হাজার ৫০০ ফুট গভীরে, আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে ছিলেন না। তিনি ছিলেন লন্ডনে, একটি ডিজিটাল ‘টুইন’—অর্থাৎ থ্রিডি স্ক্যানে তৈরি একটি পূর্ণাঙ্গ কম্পিউটার মডেলের সামনে।

মডেলটির এত সূক্ষ্ম ও স্পষ্ট ডিটেইল রয়েছে যে, এর ভিডিও একটি বড় ঘরে প্রকৃত টাইটানিকের মতো আসল মাপেই দেখানো সম্ভব, যেখানে গবেষকেরা হেঁটে ঘুরে ঘুরে প্রতিটি অংশ পরখ করতে পারেন। এমনকি এক একটি স্টিম ভালভ পর্যন্ত জুম করে বিশ্লেষণ করা সম্ভব। যেমন একটি স্ক্যানে দেখা গেছে, বয়লার রুমের একটি ভালভ খোলা ছিল। সম্ভবত জাহাজ ডোবার সময় ইমার্জেন্সি জেনারেটর চালু রাখার জন্য ভালভটি খোলা হয়েছিল।

ডুবে যাওয়া টাইটানিক ২০০৫ সালে প্রথমবার দেখতে যাওয়ার পর স্টিফেনসন দুইবার মূল ধ্বংসাবশেষ ঘুরে দেখেছেন। কিন্তু তার ভাষায়, ‘তখন শুধু চোখের সামনে যা ছিল, সেটাই দেখা যেত। মনে হতো একটা অন্ধকার ঘরে অল্প আলো হাতে নিয়ে খুঁজে চলেছি।‘ কিন্তু ডিজিটাল টুইনের মাধ্যমে তিনি পান ৩৬০ ডিগ্রি স্পষ্ট দৃশ্যায়ন।

২০২২ সালে, চ্যানেল আইল্যান্ডসে অবস্থিত গভীর সমুদ্র জরিপকারী প্রতিষ্ঠান ম্যাগেলান টাইটানিক জাহাজের স্ক্যানিংয়ের কাজ তিন সপ্তাহ ধরে পরিচালনা করে এবং রিমোট রোবট ‘রোমিও’ ও ‘জুলিয়েট’ দিয়ে স্ক্যানটি সম্পন্ন করে। ৭ লাখ ১৫ হাজার ছবি ও কোটি কোটি লেজার মাপজোকের মাধ্যমে তৈরি হয় বিশ্বের সবচেয়ে বড় আন্ডারওয়াটার থ্রিডি স্ক্যান। এর আকার ১৬ টেরাবাইট, যা ছয় মিলিয়ন ই-বুকের সমান।

এই স্ক্যানের বিশ্লেষণ করে স্টিফেনসন বলেন, টাইটানিকের পেছনের অংশ যেভাবে ভেঙে পড়েছে, তা সম্ভবত জাহাজটি নিচে নামার সময় ঘুরে গিয়ে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। ‘প্রথম দর্শনেই মনে হয়েছিল, এই তো—এটাই যুক্তিযুক্ত,’ বলেন তিনি।

পূর্বে এই ধ্বংসাবশেষকে কেবল হাতে আঁকা চিত্র বা আলোকচিত্র মোজাইক দিয়ে দেখানো হতো। কিন্তু আধুনিক স্ক্যানগুলো এতটাই সুনির্দিষ্ট যে ইতিহাস যেন চোখের সামনে ফুটে ওঠে।

ডিজিটাল টুইন কেবল জাহাজ নয়, বিশ্বের নানা পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শনকেও ভবিষ্যতের জন্য সংরক্ষণ করছে। যেমন, ইতালির মিকেলেঞ্জেলোর ‘ডেভিড’ মূর্তিটির স্ক্যান, বা নাইজেরিয়ার ওসুন-ওসোগবো গাছপালাঘেরা স্থাপনাগুলো, যেগুলো ২০১৯ সালের বন্যায় ধ্বংস হয়ে যায়।

টিউলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিদ অ্যালিসন এমারসন বলেন, ‘আধুনিক প্রত্নতত্ত্বের সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হলো এই স্ক্যান প্রযুক্তি। একবার মাটি খুঁড়ে ফেলা হলে আর ফিরে যাওয়া যায় না। তাই এই ধরনের নিখুঁত রেকর্ড এখন অপরিহার্য।‘

তবে এই স্ক্যানগুলো অনেক সময় সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না। এমারসন চান, তার তৈরি পম্পেই-এর ডিজিটাল টুইন সকলের জন্য উন্মুক্ত থাকুক। ‘আমি চাই না, মডেলটি শুধু কোনো গবেষকের ল্যাপটপে আটকে থাকুক,’ বলেন তিনি।

ম্যাগেলান এখনো টাইটানিকের স্ক্যান উন্মুক্ত করার কোনো পরিকল্পনা জানায়নি, তবে ডিজনি+ এর নতুন ডকুমেন্টারি টাইটানিক: দ্য ডিজিটাল রিজারেকশন এ স্ক্যানের কিছুটা দেখা যাবে। স্টিফেনসন মনে করেন, এই প্রযুক্তি গবেষণাকে আরো সমন্বিত ও নিরাপদ করতে পারে।

টাইটানিকের মূল ধ্বংসাবশেষ দেখতে যাওয়া থামবে না, তিনি স্বীকার করেন। তবে যারা যেতে চান, তাদের উদ্দেশে অনুসন্ধানকারী রবার্ট ব্যালার্ডের বার্তা, ‘ছোঁবেন না। ওখানে বিয়ে করতেও যাবেন না।‘


সূত্র: সিএনএন

আরও