“ওকি গাড়িয়াল ভাই
কত রব আমি পন্থের দিকে চাইয়া রে…”
গানটি নিশ্চয়ই শুনেছেন? আব্বাস উদ্দীনের বিখ্যাত এ গানকে বলে ভাওয়াইয়া। তবে আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় এ ভাওয়াইয়া গান নয়, বরং এর সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকা বাংলার বিলুপ্তপ্রায় এক পেশা। ভাওয়াইয়া মূলত উত্তরবঙ্গের খেটে খাওয়া মানুষের গান, তবে এর অন্যতম ধারক ও বাহক ছিল গাড়িয়াল বা গরুর গাড়ি চালক। আজ জানবো আমদের বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্য গরুর গাড়ি ও গাড়িয়াল সম্পর্কে।
কেমন দেখতে গরুর গাড়ি?
নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই অদেখা গরুর গাড়ি। গ্রাম-বাংলার ঐতিহ্যবাহী এ বাহন মূলত কাঠ ও বাঁশে নির্মিত এক প্রাচীন প্রকৌশল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ গাড়ি টেনে নিত বলদ বা ষাঁড়। তবে মহিষেরও প্রচলন ছিল। দুপাশে দুটি বড় কাঠের চাকা, মাঝের পাটাতন দিয়ে তৈরি হত এ গাড়ি। কাঠের বিশাল চাকার বাইরের পৃষ্ঠে লাগানো থাকত লোহার রিম। আর শক্ত কাঠের পাটাতনের ওপর বহন করা হতো যাত্রী ও মালামাল। সামনের দিকে জোয়াল গরুর কাঁধে বসানো হয়, যা একটি লম্বা দণ্ডের মাধ্যমে গাড়ির সঙ্গে যুক্ত থাকতো। গরু নিয়ন্ত্রণের জন্য থাকত বলগা। এটি শোভা পেত গাড়িয়ালের হাতে। আর দিক নির্দেশনা ও তাগিদ দিতে ব্যবহার করা হতো একটি লাঠি বা ‘পাছনি’। রোদ-বৃষ্টি থেকে যাত্রী ও মালপত্র রক্ষার জন্য অনেক গাড়ির ওপর বাঁশ বা বেত দিয়ে তৈরি ছই বসানো হতো। গাড়িয়ালের আসন থাকতো গাড়ির সামনের অংশে।
গরুর গাড়ি ইতিহাস
গরুর গাড়ি গ্রাম বাংলার ঐতিহ্যবাহী এক বাহন। কৃষিপ্রধান এ জনপদে এটিই ছিল একসময়ের যোগাযোগ ও মালামাল পরিবহনের প্রধান অবলম্বন।
গরুর গাড়ির ইতিহাস হাজার বছরের পুরনো। নব্যপ্রস্তর যুগ থেকেই মানুষ এ বাহন ব্যবহার করে আসছে বলে ধারণা করা হয়। ফ্রান্সের ফঁতান অঞ্চলের আল্পস পর্বতের একটি গুহায় পাওয়া চিত্র থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩১০০ সালে ব্রোঞ্জ যুগে গরুর গাড়ির প্রচলন ছিল। একইভাবে হরপ্পা সভ্যতায়ও গরুর গাড়ির অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে। প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে সেখানে এক অক্ষবিশিষ্ট চাকাযুক্ত খেলনা পাওয়া গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খ্রিস্টপূর্ব আনুমানিক ১৬০০ থেকে ১৫০০ সালের মধ্যে সিন্ধু অববাহিকা ও উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় উপমহাদেশে গরুর গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়, যা পরে ধীরে ধীরে দক্ষিণ এশিয়ার নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলায় গরুর গাড়ির আগমন
ঠিক কখন বাংলায় গরুর গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়েছিল তার সঠিক লিখিত প্রমাণ না থাকলেও, ধারণা করা হয় কৃষিভিত্তিক সমাজ গঠনের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার ব্যাপকতা লাভ করে। মোটরচালিত যান আবিষ্কারের বহু আগ থেকে গরুর গাড়ি বাংলার গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করেছে। এটি ছিল শত শত বছর ধরে বাংলার পথঘাটের সবচেয়ে পরিচিত বাহন, যা যোগাযোগ ব্যবস্থায় এনেছিল এক যুগান্তকারী পরিবর্তন।
গাড়িয়াল বাংলার বিলুপ্তপ্রায় পেশা
গরুর গাড়ির চালককে বলা হয় গাড়িয়াল। এটি ছিল এক বিশেষ পেশা, যার সাথে জড়িত ছিল দক্ষতা ও ঐতিহ্য। প্রান্তিক মানুষের কাছে এটি ছিল আয়ের অন্যতম উৎস। তারা বিভিন্ন ধরনের মালামাল ও যাত্রী বহন করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। একজন গাড়িয়াল হওয়ার জন্য গরুর চাল-চলন, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং গাড়ির গঠন সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হতো। গরু বা বলদ দুটিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং নির্দিষ্ট পথে নিয়ে যাওয়া ছিল তাদের প্রধান দক্ষতা। বন্ধুর পথ, নদী পারাপার বা রাতে ভ্রমণের সময় গাড়িয়ালের দায়িত্ব ছিল সর্বোচ্চ। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গন্তব্যে সময়মতো পৌঁছানো ছিল তাদের পেশার মূল অংশ।
গরুর গাড়ির ব্যবহার
গরুর গাড়ি আবহমান বাংলার গ্রামীণ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য ভূমিকা পালন করত। প্রধানত ব্যবহার হতো কৃষিপণ্য, গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে। পাশাপাশি গ্রাম-বাংলায় রোগী বহনের জন্যও ব্যবহৃত হতো এ গাড়ি।
সংস্কৃতি ও লোক ঐতিহ্য
গরুর গাড়ি শুধুমাত্র একটি যান ছিল না, এটি ছিল গ্রামীণ সংস্কৃতি ও লোক ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। গরুর গাড়ির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ভাওয়াইয়া গান, যা মূলত বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গ এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কোচবিহারে ও আসামের গোয়ালপাড়ায় প্রচলিত। গাড়িয়াল ও গরুর গাড়িকে কেন্দ্র করে রয়েছে অসংখ্য গান, কবিতা।
প্রাচীন ও মধ্যযুগে গরুর গাড়িকে বিবাহের প্রধান বাহন হিসেবে ব্যবহার করা হতো। সে সময় বরযাত্রী দল এবং নববধূ বাপের বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার জন্য সুসজ্জিত গরুর গাড়ি ব্যবহার করা হতো। এ সময় গাড়িটিকে রঙিন কাপড়, ফুল, ঝালর ও ময়ূরপুচ্ছ দিয়ে সাজানো হতো।
এক সময় গরুর গাড়ির প্রতিযোগিতা ছিল গ্রামীণ মেলার প্রধান আকর্ষণ। সব মিলিয়ে গরুর গাড়ি গ্রাম বাংলার এক সমৃদ্ধ ঐতিহ্যকে বহন করত, যা সময়ের স্রোতে বিলীন হলেও লোকস্মৃতিতে আজও অম্লান।
বিলুপ্তির কারণ
আধুনিক সভ্যতার বিবর্তন এবং যান্ত্রিকতার প্রভাবে ঐতিহ্যবাহী এ বাহন আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে। যা এক সময় যোগাযোগ ব্যবস্থায় এনেছিল যুগান্তকারী পরিবর্তন, তা এখন রয়েছে জাদুঘর, গল্পে ও বইয়ের পাতায় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে।
মূলত বাস, ট্রাক, লরি, পিকআপ, নসিমন, করিমন, অটোরিকশা এবং অন্য দ্রুতগতির মোটরযান সহজলভ্য হওয়ায় অপেক্ষাকৃত ধীর গতির গরুর গাড়ির ব্যবহার দ্রুত কমতে থাকে।
পাকা সড়ক ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে যান্ত্রিক বাহনগুলো সহজেই প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পৌঁছে যাচ্ছে যা এ বাহন ও এর সাথে জড়িত পেশা বিলুপ্তির অন্যতম কারণ। অন্য দিকে গরু ও কাঠসহ গাড়ির সরঞ্জামাদির দাম বৃদ্ধি পাওয়া এবং গাড়িয়াল পেশার চাহিদা কমে যাওয়ায় এই ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে কালের চক্রে।
বর্তমানে গরুর গাড়ির দেখা মেলে যেখানে
আধুনিক যুগে গরুর গাড়ির ব্যবহার প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেলেও, এখনো কথাও কোথাও এর দেখা মেলে। বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, চাপাইনবাবগঞ্জ এবং দক্ষিণ-পশ্চিমের কিছু জেলায় যেমন যশোর, খুলনা, সাতক্ষীরাসহ কিছু জায়গায় খুব সীমিত আকারে কৃষকের ব্যক্তিগত প্রয়োজনে এটি ব্যবহার করতে দেখা যায়। তবে আজ সেই স্পন্দন ক্ষীণ, চাকার শব্দ ম্লান হয়ে গেছে।
ঐতিহ্যবাহী এ বাহন ছিল বাংলার মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত এক অসাধারণ যান্ত্রিক উদ্ভাবন। রবিঠাকুরের ছড়াতেও ফুটে উঠেছে যার চিত্র-
কুমোর-পাড়ার গরুর গাড়ি
বোঝাই করা কলসি হাঁড়ি ।
গাড়ি চালায় বংশীবদন,
সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন ।
হাট বসেছে শুক্রবারে
বক্সীগঞ্জে পদ্মাপারে ।