রিভিউ

শ্বাসরুদ্ধকর ‘দ্য ওডিসি’, নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেলেন নোলান

‘দ্য ওডিসি’ হয়ে উঠেছে তিন ঘণ্টার এক বিশাল, ঝলমলে, রহস্যময় চলচ্চিত্র

যুদ্ধের আগে ওডিসিউস স্ত্রী পেনেলোপিকে (অ্যান হ্যাথাওয়ে) বলে, যদি তিনি যুদ্ধে মারা যান, তবে যেন পুনর্বিবাহ করে। একই সঙ্গে জানান, ট্রয় যুদ্ধের ঘোষিত কারণ— হেলেনের (লুপিতা নিয়ঙ্গ’ও) ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিসের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া অজুহাত মাত্র। প্রকৃত কারণ ছিল বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা

হোমারের কিংবদন্তিকে নতুন রূপ দিয়েছেন নির্মাতা ক্রিস্টোফার নোলান। ক্লাসিক গল্পকে তিনি পরিণত করেছেন যুদ্ধ-পরবর্তী হতাশার এক বর্ণাঢ্য আখ্যানে। যেখানে আছে যন্ত্রণা, রূপান্তর ও নৈতিক পরিবর্তনের এক মহাকাব্যিক যাত্রা। আবার মৃতরা সবকিছুর সাক্ষী আর খামখেয়ালি দেবতারা মানুষের প্রায় সমপর্যায়ে আসে, নেমে আসে বিশেষ বিশেষ ঘটনাপ্রবাহে।

সিনেমাটি যুদ্ধ-পরবর্তী মানসিক আঘাত (পিটিএসডি)-এর প্রজন্মগত যন্ত্রণার কথা বলে। যার প্রাসঙ্গিকতা সব সময়ই সমকালীন। যুদ্ধ শেষে অসংখ্য সৈনিক শারীরিকভাবে ঘরে ফিরতে পারেন, কিন্তু মানসিক বা আত্মিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরতে তাদের অনেকেরই বছর, এমনকি দশক লেগে যায়। কিংবা কোনো দিনই পুরোপুরি ফেরা হয় না। এক অদৃশ্য যন্ত্রণা। ফ্ল্যাশব্যাক, বিভ্রম এবং মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করা খামখেয়ালি দেবতাদের মুখোমুখি হওয়ার মধ্য দিয়ে এ যাত্রা এগিয়ে চলে। আর যোদ্ধাদের স্ত্রী-সন্তানদের জীবনও স্বাভাবিক ছন্দে পারে না।

‘দ্য ওডিসি’ উচ্চাভিলাষী, সাহসী, গম্ভীর অথচ উদার ও শৈল্পিক। সংলাপে কোথাও কোথাও অতিনাটকীয়তার ছাপ রয়েছে, সেটিও নোলান শক্তিশালী ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন। চিত্রগ্রাহক হয়টে ভ্যান হয়টেমার ক্যামেরায় আইম্যাক্স পর্দাজুড়ে একাকীত্বের শ্বাসরুদ্ধকর দৃশ্য ফুটে তুলেছেন। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, তিনি সমুদ্রকে প্রচলিত নীল রঙের ক্লিশে উপস্থাপনায় দেখাননি। পাশাপাশি ঢাকের গম্ভীর ছন্দ যুদ্ধ ও সংঘর্ষের দৃশ্যগুলোকে আরো তীব্র করে তুলেছে।

ওডিসিউস চরিত্রে অভিনয় করেছেন ম্যাট ডেমন। তার স্বভাবসুলভ তারুণ্যদীপ্ত মুখটি ক্লান্ত, বিষণ্ন ভরা এক যোদ্ধার মুখোশে ফুটে উঠেছে। ইথাকার এ সামরিক নেতাকে গ্রিক রাজা আগামেমননের অধীনে যুদ্ধ করতে দেখা যায়। আগামেমননের ভূমিকায় বেনি স্যাফডি প্রায় পুরো সময়ই ব্যাটম্যান-ধাঁচের একটি হেলমেটের আড়ালে থাকে। এখানেও নোলানের আগের চলচ্চিত্র ‘ডানকার্ক’-এর প্রতিধ্বনি দেখা যায়— বিশেষ করে সৈন্যদের অন্তহীন অপেক্ষার দৃশ্যগুলোয়।

যুদ্ধের আগে ওডিসিউস স্ত্রী পেনেলোপিকে (অ্যান হ্যাথাওয়ে) বলে, যদি তিনি যুদ্ধে মারা যান, তবে যেন পুনর্বিবাহ করে। একই সঙ্গে জানান, ট্রয় যুদ্ধের ঘোষিত কারণ— হেলেনের (লুপিতা নিয়ঙ্গ’ও) ট্রয়ের রাজপুত্র প্যারিসের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়া অজুহাত মাত্র। প্রকৃত কারণ ছিল বাণিজ্যপথের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিযোগিতা।

শেষ পর্যন্ত গ্রিকদের বিজয় আসে এক অসাধারণ কৌশলের মাধ্যমে। বিশাল কাঠের ঘোড়ার ভেতরে লুকিয়ে থাকে নির্বাচিত একদল যোদ্ধা। সিনেমায় এ ঘোড়াটিকে শহরের ভেতরে চাকার ওপর গড়িয়ে নেয়া হয় না; বরং সৈকতের বালিতে আংশিক চাপা পড়ে থাকা মূল্যবান বস্তু ভেবে ট্রয়বাসীরাই সেটিকে টেনে নিয়ে যায়। এ পরিকল্পনা সফল করতে ওডিসিউসকে নিজের আত্মীয় ও সহযোদ্ধা সিননকে (এলিয়ট পেজ) প্রতারণা করতে হয়—যে অপরাধবোধ তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায়। নোলানের নির্মাণে ট্রোজান হর্সকে মনে হয় ‘প্ল্যানেট অব দ্য এপস’-এর স্ট্যাচু অব লিবার্টি আর শেলির ‘ওজিমান্ডিয়াস’-এর মূর্তির এক অদ্ভুত সংমিশ্রণ।

‘দ্য ওডিসি’র মূল বক্তব্য হলো—যুদ্ধের কারণ, কৌশল বা বিজয় নয়; আসল বিষয় হলো যুদ্ধের দীর্ঘ ও অরাজক পরিণতি। ভুলে যাওয়া এক সংঘাতের বিষাক্ত প্রভাব মানুষের জীবনকে যেভাবে ধ্বংস করে, সেটিই এখানে মুখ্য। আগামেমনন দেশে ফিরে নিহত হন। তার ভাই মেনেলাউস (জন বার্নথাল) হেলেনের সঙ্গে এক অস্বস্তিকর পুনর্মিলনের মুখোমুখি হন। লুপিতা নিয়ঙ্গ’ও আগামেমননের হত্যাকারী ক্লাইটেমনেস্ট্রার ভূমিকায়ও অভিনয় করেছেন।

অন্যদিকে ক্ষুধা, শোক আর বিভ্রান্তিতে বিধ্বস্ত ওডিসিউস ও তার সঙ্গীরা সমুদ্রে বেঁচে থাকার এক বিশৃঙ্খল অভিযানে বেরিয়ে পড়েন। পথে তাদের মুখোমুখি হতে হয় হ্যারি হাউজেন-ধাঁচের সাইক্লোপস, লেসট্রিগোনিয়ানদের মতো দানবদের। দেখা হয় সার্সি (সামান্থা মর্টন), ক্যালিপসো (শার্লিজ থেরন), মোহময়ী সাইরেনদের এবং ওডিসিউসের সহায়ক শোকাতুর দেবী অ্যাথেনা (জেনডায়া)-র সঙ্গে।

এদিকে ইথাকায় ওডিসিউসকে মৃত ধরে নিয়ে সৃষ্ট ক্ষমতার শূন্যতা সামাল দিতে পেনেলোপিকে বাধ্য হয়ে অসংখ্য সম্ভাব্য পাত্রকে অতিথি হিসেবে আপ্যায়ন করতে হয়। এই অপমানজনক ভোজ যেন লোভের এক অন্তহীন উৎসব। তাদের মধ্যে সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ভয়ঙ্কর অ্যান্টিনাউস চরিত্রে রবার্ট প্যাটিনসন দুর্দান্ত অভিনয় করেছেন। তিনি ওডিসিউসের অন্ধ ভৃত্য ইউমেয়াসের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করেন। জন লেগুইজামো ইউমেয়াস চরিত্রটিকে অত্যন্ত আবেগঘনভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। এদিকে মানসিকভাবে ক্ষতবিক্ষত ছেলে টেলেমাকাস (টম হল্যান্ড) নিজের বাবাকে—অথবা অন্তত তার মৃতদেহ খুঁজে বের করার অভিযানে বেরিয়ে পড়ে।

ওডিসিউস যখন মৃতদের সঙ্গে কথা বলতে পাতালে নামেন, সেটি ছবির অন্যতম স্মরণীয় দৃশ্য। নোলান সেখানে মৃত আত্মাগুলোকে ম্যাকবেথের ডাইনিদের মতো মাটির ওপর ঝুঁকে থাকতে দেখিয়েছেন। এখানে দেবতা ও মৃতদের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ যেন একই স্তরে সম্ভব—ওডিসি-র সেই অদ্ভুত পৌত্তলিক জগৎ নৈতিকতার চেয়ে মানসিক ভাঙনের প্রতীক হিসেবেই বেশি ধরা দেয়।

অবশেষে ওডিসিউস যখন পেনেলোপির বাড়ির কাছে পৌঁছে, তখন শহরটি ট্রয়ের মতোই এক নতুন অবরোধের মুখে। সেখানে খ্রিস্টসদৃশ এক ভিখারির ছদ্মবেশে প্রবেশ করে সে। গল্পের শেষ অংশে ধীরে ধীরে ওডিসিউস নিজেই যেন এক দেবত্বের দিকে রূপান্তরিত হতে শুরু করে।

তবে হোমারের মূল কাহিনির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নোলান বাদ দিয়েছেন। ওডিসিউসের ধূর্ত পিতামহ অটোলাইকাস, যিনি তার নাম রেখেছিলেন, ছবিতে নেই। ‘ওডিসিউস’ নামের অর্থ ‘শত্রুতার শিকার’, যদিও কেউ কেউ এর অর্থ করেছেন ‘শত্রুতার সূচনাকারী’। যাই হোক, অ্যাকশন নায়কের জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী নাম কল্পনা করা কঠিন। সে কোনো একক শত্রুর নয়, বরং চারপাশের এক অন্তহীন বৈরিতার শিকার। সেই বৈরিতার ভেতর দিয়েই তাকে পাড়ি দিতে হয়—ঘরে ফেরার জন্য, যে ঘরও শেষ পর্যন্ত আর নিরাপদ থাকে না।

সব মিলিয়ে ‘দ্য ওডিসি’ হয়ে উঠেছে তিন ঘণ্টার এক বিশাল, ঝলমলে, রহস্যময় চলচ্চিত্র। এটি দর্শককে কোনো সহজ জ্ঞান বা শান্তি দেয় না। বরং ভেঙে পড়া জীবনকে অর্থ দেয়ার, ক্ষতির দগ্ধ যুদ্ধক্ষেত্রে আবারো ফিরে গিয়ে লড়াই চালিয়ে যাওয়ার এক কঠিন সংকল্পই শেষ পর্যন্ত সামনে নিয়ে আসে।

দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে

আরও