১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বব্যাপী ভালোবাসার এক বিশেষ দিন। যা ভালোবাসা দিবস (ভ্যালেন্টাইনস ডে) নামে খ্যাত। এদিন প্রেমিক-প্রেমিকাদের মনে লাগে দোলা। একে অপরের জন্য হৃদয়ের জানালা থাকে খোলা। ভালোবাসার রঙে রাঙায় হৃদয়। কথা হয়, দেখা হয়। দিনটি হয় আনন্দ-মধুময়।
ভালোবাসা দিবসে অনেক বয়স্ক-প্রবীণের মনও প্রেমময় অনুভবে দোলায়িত হয়। স্বামী-স্ত্রী পরস্পরকে জানায় ভিন্ন ভাললাগা, ভিন্ন অনুভূতি। মুঠোফোনটা কানে লাগিয়ে অনেকেই বন্ধু-বান্ধব এবং আপনজনকে জানিয়ে দেয় ‘হেপি ভ্যালেন্টাইনস ডে’ ।
শুধু ভালোবাসার জন্যে
পৃথিবীতে এমন কিছু অমর প্রেম বা ভালোবসার উদাহরণ আছে যা আমাদেরকে ভাবায়, শিহড়িত করে এবং প্রেমের নতুন সংজ্ঞা দাঁড় করায়। আবার কখনো কাঁদায়। এসব প্রেম কাহিনীর দেখা পাওয়া যায় কখনো সাহিত্যে আবার কখনো বাস্তবে। সাহিত্যে যেমন, লাইলী-মজনু, শিরিন-ফরহাদ, রোমিও-জুলিয়েত প্রভৃতি কালজয়ী প্রেমের কাহিনী আছে। বাস্তবে ঘটে যাওয়া কোনো কোনো প্রেমকাহিনী পড়ে আমাদের চোখ কপালে উঠে। কাহিনীর গভীরতা এত বেশি যে সেটি বারবার শুনতে ইচ্ছে হয়। এমনই একটি বাস্তব কাহিনী নিয়ে আজকের আয়োজন।
পৃথিবীর ইতিহাসে প্রেমের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আছে বৃটেনের রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড। ১৯৩৬ সালের ১০ ডিসেম্বর এডওয়ার্ড সিংহাসনের মায়া ত্যাগের মাধ্যমে প্রেমকে জিতিয়ে প্রমাণ করেন সিংহাসনের চেয়ে প্রেম বড়।
১৯৩৬ সালের ২০ জানুয়ারি এডওয়ার্ডের বাবা রাজা পঞ্চম জর্জ মৃত্যুবরণ করেন। রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড নাম ধারণ করে এডওয়ার্ড তৎকালীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও প্রভাবশালী সিংহাসন বৃটিশ কমনওয়েলথ’র সিংহাসনে আরোহন করেন।
রাজপুত্র এডওয়ার্ড ছিলেন একজন সুদর্শন পুরুষ। তার উজ্জল চুল, নীল চোখ আর বালকসুলভ চেহারায় যে কেউ আকৃষ্ট হত, বিশেষ করে তরুণীরা। ১৯৩১ সালের ১০ জানুয়ারি বৃটেনে এক পার্টিতে মার্কিন কন্যা ওয়ালিস সিম্পসনের সঙ্গে এডওয়ার্ডের পরিচয় হয়। পরিচয় থেকে প্রেম। খুব সুন্দরী না হলেও দীপ্তিময় চোখ, আকর্ষণীয় শারীরিক গঠন, মসৃণ চুল এবং স্টাইল সচেতনতার কারণে ওয়ালিস সিম্পসনকে অন্যদের তুলনায় একটু আলাদাই দেখাত। তার চলাফেরায় ছিল স্বতন্ত্রধরণ। তবে ততদিনে ওয়ালিস তার দ্বিতীয় স্বামীর সংসার করছেন।
অত্যাধিক মদ্যপানের কারণে প্রথম স্বামী মার্কিন নৌ-বাহিনীর সদস্য লেফটেনান্ট আর্ল উইনফিল্ডকে ১৯২৭ সালের ডিসেম্বরে ডিভোর্স দেন ওয়ালিস। তারপর ১৯২৮ সালের জুলাই মাসে বৃটিশ-আমেরিকান জাহাজ ব্যবসায়ী আর্নেস্ট সিম্পসনকে বিয়ে করেন। স্বামীর সঙ্গে বসবাস শুরু করেন লন্ডনে। এসময় লন্ডনেই যুবরাজ এডওয়ার্ডে সঙ্গে ওয়ালিসের পরিচয় হয়। ১৯৩৪ সালের দিকে দু’জনের সম্পর্ক গভীর হয়। এডওয়ার্ড সিংহাসনে বসার পর ওয়ালিসরে সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টি গুরত্ববহ হয়ে উঠে। কারণ এডওয়ার্ড এরমধ্যেই ওয়ালিস সিম্পসনকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। একজন মার্কিন সাধারণ পরিবারের ডিভোর্সি মেয়েকে বৃটিজরাজ বিয়ের করার সিদ্ধান্তে বাধা হয়ে দাঁড়ান ইংল্যান্ডের চার্চ।
উল্লেখ্য, সেসময় অষ্টম এডওয়ার্ড ছিলেন ইংল্যান্ড চার্চের প্রধান, আর এডওয়ার্ডের এমন বিয়ের সিদ্ধান্ত ছিল চার্চের নীতি বিরোধী। তৎকালীন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলে বল্ডউইনও এডওয়ার্ডের এই অন্ধ প্রেমের সিদ্ধান্তের বিপক্ষে অবস্থান নেন। একজন ডিভোর্সি এবং দ্বিতীয় স্বামীর ঘরণী মেয়েকে রাণী হিসেবে মেনে নেওয়া হবে না বলে বল্ডউইন প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেয়। এই ঘটনা তখন পৃথিবীব্যাপী চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে। সংবাদপত্রগুলোতে বড় শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করতে থাকে। চারদিকে হৈ-চৈ পড়ে যায়। বিতর্কের ঝড় উঠে।
অপরদিকে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রধানমন্ত্রীরাও এডওয়ার্ডের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে মত প্রকাশ করেন। কিন্তু রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। প্রশ্ন উঠে, প্রেম বড়, নাকি সিংহাসন বড়?
এমতাবস্থায় প্রধানমন্ত্রী স্ট্যানলে বল্ডউইন রাজা এডওয়ার্ডকে তিনটি প্রস্তাব দেন এবং যে কোনো একটি গ্রহণ করার আমন্ত্রণ জানান।
প্রথমত, ওয়ালিসকে বিয়ে করার চিন্তা বাদ দেওয়া। দ্বিতীয়ত, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করা। তৃতীয়ত, সিংহাসন ত্যাগ করা।
সবাইকে অবাক করে দিয়ে রাজা অষ্টম এডওয়ার্ড তৃতীয় প্রস্তাবটি বেছে নেন। ১৯৩৬ সালের ১০ ডিসেম্বর অষ্টম এডওয়ার্ড পার্লামেন্টে অ্যাবডিকেশন বা সিংহাসন ত্যাগ ডকুমেন্ট সাবমিট করেন। পরদিন পার্লামেন্ট অষ্টম এডওয়ার্ডের সিংহাসন ত্যাগ অনুমোদন করে।
সিংহাসনের মায়া ত্যাগের প্রাক্কালে এডওয়ার্ড তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমি উপলব্ধি করেছি, যে নারীকে আমি ভালোবাসি তার সমর্থন ছাড়া রাজা হিসেবে রাজ্য পরিচালনার এ কঠিন দায়িত্ব পালন করা আমার পক্ষে অসম্ভব। এই সিদ্ধান্তের ফলাফল কি তা আমি জানি। সিদ্ধান্তটা আমি একাই নিয়েছি’।
মাত্র ৩২৬ দিনের মাথায় সিংহাসন ত্যাগ করে বৃটিশ কমনওয়েলথ’র ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের রাজার তালিকায় অষ্টম এডওয়ার্ড নিজের নাম লেখান। প্রেমকে জিতিয়ে সারা পৃথিবীর প্রেমের ইতিহাসে অনন্য নজির স্থাপন করেন। এ ঘটনার পর তার ছোট ভাই ষষ্ঠ জর্জ রাজা হন। এরপর এডওয়ার্ড ফ্রান্সে চলে যান। ১৯৩৭ সালের ৩ জুন এডওয়ার্ড ওয়ালী সিম্পসনকে বিয়ে করেন এবং প্যারিসে বসবাস শুরু করেন।
ঐতিহাসিক এই প্রেম কাহিনী নিয়ে ২০০৫ সালে ইংল্যান্ডে একটি রোমান্টিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়। ছবিটির নাম ‘ওয়ালিস এবং এডওয়ার্ড’। এটি তৈরি করেন কোম্পানি টিভি প্রোডাকসন। ছবিটির দৈর্ঘ্য ৯০ মিনিট। স্ক্রিপ্ট তৈরি করেন সারাহ উইলিয়ামস। পরিচালনা করেন ডেভিড মুর। চলচ্চিত্রটিতে অভিনয় করেন ডেভিট ওয়েসথিড, জুয়িলি রিচার্ডসন, লিসা কেই এবং আরও অনেকে।
অষ্টম এডওয়ার্ডের গল্প আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কখনো কখনো মানুষের হৃদয়ের টানে সকল ক্ষমতা ও সিংহাসন হার মানে। তার কাছে ভালোবাসা ছিল শুধুই অনুভূতি নয়, বরং এক জীবনভর অঙ্গীকার— যার জন্য তিনি রাজমুকুট ত্যাগ করেছিলেন। এই ইতিহাস শেখায়, সত্যিকারের প্রেম হিসাব-নিকাশ দেখে না; সে চলে হৃদয়ের পথে। ভালোবাসার দিন মানেই যেন মনে পড়ে সেই সাহসী সিদ্ধান্ত— সিংহাসন ক্ষণস্থায়ী, ভালোবাসা চিরন্তন।