যেকোনো সরকারের প্রথম দায়িত্ব তার জনগণকে নিরাপদ রাখা—দশকের পর দশক ধরে অসংখ্য নেতা এ কথা বলে আসছেন। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সেই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছিল। গোয়েন্দা তথ্য ছিল, কিন্তু সময়মতো কেউ সেগুলোকে একসঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেনি।
‘৯/১১’ নামে পরিচিত ওই হামলা এবং তার পরবর্তী প্রতিক্রিয়া চলতি শতকের প্রথম দুই দশকের পররাষ্ট্র, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা নীতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সেদিন আত্মঘাতী হামলাকারীরা ছিনতাই করা উড়োজাহাজ নিয়ে টুইন টাওয়ার নামে পরিচিত নিউইয়র্কের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে আঘাত হানে। নিহত হন ২ হাজার ৯৭৭ জন।
তবে হামলাটি হঠাৎ করে ঘটেনি। হামলার জন্য বরাবরই সামনে এসেছে আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের নাম, সেই সূত্র পরবর্তীতে তছনছ হয়ে গেছে আফগানিস্তান। অথচ এর কয়েক বছর আগেই আল-কায়েদা এবং নির্বাসিত সৌদি নেতা ওসামা বিন লাদেন সম্পর্কে জানত সিআইএ। এমনকি তাকে খুঁজে বের করার জন্য সংস্থাটির একটি বিশেষ টাস্কফোর্সও ছিল। হামলার নয় দিন পর তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ‘ওয়ার অন টেরর’ ঘোষণা করেন।
পরের ২৫ বছরে আটলান্টিকের দুই পাশেই গোয়েন্দা সাফল্য ও ব্যর্থতার অসংখ্য ঘটনা ঘটেছে। অনেক হামলার পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়েছে, গ্রেফতার করা হয়েছে সন্দেহভাজনদের, বিচার হয়েছে এবং অনেকে কারাগারেও গেছে। কিন্তু বড় প্রশ্ন থেকে গেছে—৯/১১-এর পর গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সন্ত্রাসবিরোধী তৎপরতা ও কৌশলগত পরিকল্পনা কতটা বদলেছে? বিশেষ করে বর্তমান ইরাক যুদ্ধ সমাপ্তি বিষয়ে যে জটিলতা তা নিয়ে পশ্চিমা গোয়েন্দা সক্ষমতা নিয়েও নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
শুধু তথ্য নয়, দরকার ছিল তথ্যের সমন্বয়
বিশ্লেষজ্ঞদের মতে, ৯/১১ ছিল নিঃসন্দেহে এক ‘বিশাল গোয়েন্দা ব্যর্থতা’। আরো নির্দিষ্ট করে বললে, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা ব্যবস্থায় কল্পনাশক্তির ব্যর্থতা। সিআইএ ও এফবিআই—দুই সংস্থার কাছেই এমন তথ্য ছিল, যেগুলো যথাযথভাবে ভাগাভাগি করা হলে হামলা ঠেকানো সম্ভব হতে পারত। ৯/১১ কমিশনের প্রতিবেদনে মার্কিন সরকারের ‘কল্পনা, নীতি, সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার’ কথা বলা হয়।
এরপর মার্কিন গোয়েন্দা ব্যবস্থায় বড় ধরনের পুনর্গঠন হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার এবং ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের পদ। এর লক্ষ্য ১৮টি পৃথক মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য ভাগাভাগি নিশ্চিত করা।
একইসঙ্গে পশ্চিমা অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান অনেক উন্নত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে এমআই৫ ও পুলিশ কাউন্টার টেররিজমের পুরনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনেকটাই কমেছে। লন্ডনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উচ্চনিরাপত্তার কাউন্টার টেররিজম অপারেশনস সেন্টার, যেখানে এমআই৫ কর্মকর্তা, পুলিশ, এফবিআইয়ের কর্মকর্তা কিংবা জিসিএইচকিউর ভাষা বিশেষজ্ঞ একই জায়গায় কাজ করতে পারেন।
সিআইএ ও যুক্তরাজ্যের এমআই৬-এর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের ‘ফাইভ আইজ’ জোট গোয়েন্দা সহযোগিতা আরো বাড়িয়েছে।
তবু ব্যর্থতা থামেনি। ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের আগে দেশটির কাছে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক অস্ত্র বা ডব্লিউএমডি থাকার ভুল গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬। কারণ হিসেবে ওয়াশিংটনের প্রবল রাজনৈতিক চাপও সামনে রাখা হয়। যদিও পরে জানা যায়, ইরাকের অতীতে ডব্লিউএমডি থাকলেও ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের পর সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছিল। বাটলার রিভিউয়ের ভাষায়, ইরাকের গোয়েন্দা তথ্য ছিল ‘গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ এবং ‘যাচাই না করা উৎসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল’।
ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতার পর এমআই৬ কাঁচা গোয়েন্দা তথ্য যাচাই ও মূল্যায়নের পদ্ধতিতে বড় পরিবর্তন আনে। জেনারেল স্যার রিচার্ড শিরেফের মতে, শেখার জায়গায় ঘাটতি এখনো আছে।
অথচ অসম ইরাক যুদ্ধে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের চিত্রই বদলে গেছে। পুরো অঞ্চল এখনো সেই ক্ষত বয়ে চলছে।
মনোযোগের আড়ালে থেকে যায় সন্ত্রাসের বাইরে নতুন হুমকি
৯/১১-এর পর পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর বড় অংশের মনোযোগ ছিল আল-কায়েদা ও পরবর্তী সময়ে অন্যান্য সন্ত্রাসী সংগঠনকে ঘিরে। সাবেক এমআই৬ প্রধান স্যার অ্যালেক্স ইয়ংগারের ভাষায়, ‘এই শতাব্দীর প্রথম ২০ বছর আমরা প্রায় পুরোপুরি সন্ত্রাসবাদবিরোধী ও বিদ্রোহ দমনের দিকে মনোযোগ দিয়েছি।’
তার মতে, ওই সময়ে পশ্চিমা দেশগুলো চীনের সামরিক শক্তি ও কৌশলগত চ্যালেঞ্জের উত্থানকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।
সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো যখন তালেবান, আইএসআইএস ও ইরাকে ব্যস্ত, তখন রাশিয়া ও চীন বড় ধরনের সামরিক পুনর্গঠন চালায়। হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রের মতো প্রযুক্তির বিকাশ ন্যাটোর একসময়কার সামরিক সুবিধা ক্ষয় করেছে।
সিবিলাইনের প্রধান বিশ্লেষক স্যাম ওলসেনের মতে, পশ্চিমা বিশ্বের ভুল শুধু সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে ব্যস্ত থাকা নয়; চীনের উত্থানের প্রকৃতিও তারা ভুল বুঝেছিল।
২৫ বছর পরও যে শিক্ষা
৯/১১-এর আগে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে জিগস পাজলের অনেক টুকরোই ছিল। কিন্তু সেগুলো একসঙ্গে জোড়া দিয়ে কী ঘটতে যাচ্ছে, তা তারা বুঝতে পারেনি। ২৫ বছর পরও মূল শিক্ষাটি তাই একই—গোয়েন্দা তথ্য যত ভালোই হোক, সেটিকে কৌশলগত সিদ্ধান্তে কাজে লাগাতে না পারলে তার মূল্য সীমিত।
এর পরের ২৫ বছরে গোয়েন্দা ও সন্ত্রাসবিরোধী বিশ্ব প্রায় চেনাই যায় না এমনভাবে বদলে গেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের আবির্ভাবে পরিবর্তনের গতি আরো বাড়ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার ২০২২ সালের ইউক্রেন আক্রমণ এবং ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলাকেও গোয়েন্দা ব্যর্থতার উদাহরণ হিসেবে দেখা হয়েছে। অথচ ইসরায়েল ও ইউক্রেন বরাবরই পশ্চিমা গোয়েন্দাদের তথ্য সহায়তা পেয়ে আসছিল। একই ইরাকে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার পেছনে থাকা গোয়েন্দা তথ্য নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে, যে সংঘাতের মূল্য চুকাচ্ছে পুরো বিশ্ব।
বিবিসি ও অন্যান্য উৎস অবলম্বনে