কালচক্র

দাস্তানগড়িয়া বা দাস্তানগোই—বাংলার হারিয়ে যাওয়া পেশা

দাস্তানগড়িয়া বা দাস্তানগোই—বাংলার হারিয়ে যাওয়া পেশা

ইসলাম প্রচারের যুগেও তারা ছিলেন সমান সক্রিয়। ইসলাম বিস্তারের সঙ্গে এই মৌখিক গল্প বলার ধারা পৌঁছে যায় পারস্যে। সেখানেই কাহিনিতে যুক্ত হয় রাজকীয় ন্যায়বিচার, পৌরাণিক চরিত্র, আধ্যাত্মিক উপাদান আর সাম্রাজ্যের মহিমা।

মানবসভ্যতার প্রথম শিল্প ছিল গল্প বলা। খ্রিস্টপূর্ব যুগ থেকেই আরবের মরুভূমিতে ‘কিসসা’ আর ‘সীরা’ নামক কাহিনি শ্রোতাদের সামনে বলা হতো। তাতে ছিল বীরযোদ্ধাদের বীরত্বগাঁথা, গোত্রীয় দ্বন্দ্ব, যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা অলৌকিক অভিযানের আখ্যান। কবিরা যেমন কবিতায় গৌরবগাথা ধরে রাখতেন, তেমনি আরবের কিছু আখ্যানকারেরা কণ্ঠস্বর, ভঙ্গি আর নাটকীয়তা দিয়ে ইতিহাসকে গল্পের ছলে অমর করে রাখতেন। তাদেরই বলা হতো—দাস্তানগড়িয়া।

ইসলাম প্রচারের যুগেও তারা ছিলেন সমান সক্রিয়। ইসলাম বিস্তারের সঙ্গে এই মৌখিক গল্প বলার ধারা পৌঁছে যায় পারস্যে। সেখানেই কাহিনিতে যুক্ত হয় রাজকীয় ন্যায়বিচার, পৌরাণিক চরিত্র, আধ্যাত্মিক উপাদান আর সাম্রাজ্যের মহিমা। পারস্যে দাঁড়িয়ে দাস্তানগোই কেবল বিনোদনের মাধ্যমই ছিল না, হয়ে উঠল সংস্কৃতি, নৈতিকতা ও রাজনীতির বাহক।

১৬শ শতকে দাস্তানগোই এসে পৌঁছায় ভারতবর্ষে। মুঘল সম্রাট আকবরের উদ্যোগে আমির হামজার কাহিনি নিয়ে রচিত হয় মহাকাব্যিক চিত্রমালা হামযানামা, যার পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় আঁকা হয় হাজারো দৃশ্য। দাস্তানগড়িয়ারা মৌখিক কাহিনি বলার সময় এসব চিত্র ব্যবহার করতেন, যেন শ্রোতারা শব্দ ও ছবির মেলবন্ধনে ডুবে যান এক অন্য জগতে। এইভাবেই উত্তর ভারতের মেলা, আড্ডা, নবাবি দরবারে দাস্তানগোই পরিণত হয় জনমুখী বিনোদনের প্রধান শিল্পে।

ভারতে প্রবেশ করে দাস্তানগোই পেল এক নতুন আঙ্গিক। কাহিনিতে মিশল আইয়ারি (চাতুর্য), তিলিসম (জাদু ও রহস্যময় জগত), অতিলৌকিক বিস্ময় আর সূক্ষ্ম রসবোধ। দাস্তানগড়িয়ার হাতে কোনো প্রপস থাকত না। তাদের অস্ত্র ছিল কেবল কণ্ঠস্বর, চোখের ভাষা, দেহভঙ্গি আর নাটকীয় বিরতি। এতেই দর্শক ভেসে যেত কল্পনার সমুদ্রে।

দীর্ঘদিন দিল্লিই ছিল দাস্তানগোইয়ের প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পর শিল্পীরা ছড়িয়ে পড়েন, অনেকে আশ্রয় নেন লখনউয়ে। নবাবি সংস্কৃতির ঐশ্বর্যে ভরা এই শহরে দাস্তানগোই হয়ে ওঠে সংস্কৃতির হৃদস্পন্দন।

চৌক বাজার, আফিমখানা কিংবা অভিজাতদের অন্দরমহল—সবখানেই বসত দাস্তানগড়িয়ার আসর। সেই সময়েই মুনশি নওয়াল কিশোর প্রেস থেকে প্রকাশিত হয় অসংখ্য দাস্তানগ্রন্থ। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য তিলিসিম-ই-হশরুবাম যা ৪৬ খণ্ডের মহাকাব্যিক আখ্যান। মৌখিক উত্তরাধিকার ধীরে ধীরে ছাপার অক্ষরে বাঁধা পড়ে, তবু শ্রোতাদের কল্পনায় কণ্ঠস্বরের জাদুই ছিল প্রাধান্য।

মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত বাংলাও এ শিল্পরীতির প্রভাবে আসে। ঢাকার লালবাগ কেল্লা, নবাবি দরবার কিংবা মুর্শিদাবাদের নবাবদের আড্ডায় দাস্তানগড়িয়ারা পরিবেশন করতেন আমির হামজার কাহিনি কিংবা তিলিসমি আখ্যান।

পরবর্তীতে এই ধারা গ্রামীণ বাংলায় মিশে যায় স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে—পুঁথিপাঠ, গাজীর গান, এমনকি মঙ্গলকাব্যের নাটকীয় পাঠ-এর ভেতরও পাওয়া যায় দাস্তানগোইয়ের ছায়া। তবে ১৯শ শতকের শেষ দিকে দাস্তানগোইয়ের জনপ্রিয়তা ক্রমশ হ্রাস পায়। বাংলার কাহিনি বলার নিজস্ব ঐতিহ্য টিকে থাকলেও দাস্তানগোই প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

২০ শতকের শুরুতে দাস্তানগোই দ্রুত ম্লান হয়ে পড়ে। একদিকে উপন্যাস, থিয়েটার, সিনেমা, রেডিও মানুষের মন জয় করল, অন্যদিকে অভিজাত পৃষ্ঠপোষকতাও ভেঙে পড়ল।

১৯২৮ সালে দিল্লির কিংবদন্তি দাস্তানগড়িয়া মীর বাকার আলির মৃত্যু হয়। তাকেই শেষ ‘ক্লাসিক দাস্তানগড়িয়া’ বলা হয়। তার মৃত্যু যেন এক বিশাল মৌখিক ঐতিহ্যের ইতি টেনে দেয়। এরপর কয়েক দশক ধরে দাস্তানগোই প্রায় ইতিহাসের অন্তরালে চলে যায়।

‘দাস্তানগোই’রা শুধু গল্পকার ছিলেন না। তারা ছিলেন ইতিহাসের প্রহরী, ভাষার জাদুকর, সংস্কৃতির দার্শনিক। তাদের কণ্ঠে আরব, পারস্য ও ভারতীয় উপমহাদেশের সাংস্কৃতিক স্রোত মিলেমিশে এক অনন্য ঐতিহ্যে রূপ নিয়েছিল।

আরও