স্মরণে হার্জ

যার কলমে অমরতা পেয়েছে টিনটিন ও কুট্টুস

হার্জের সৃষ্টির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার সূক্ষ্ম কাজ বা ‘ক্লিয়ার লাইন’ শৈলি। তিনি যখন টিনটিনকে কোনো অভিযানে পাঠাতেন, তখন সেই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করতেন। শুরুতে তার গল্পে কিছুটা ঔপনিবেশিক প্রভাব থাকলেও, চীনা ছাত্র চ্যাং চং-জেনের সঙ্গে পরিচয়ের পর হার্জের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আসে

এক হাতে ম্যাগনিফায়ার গ্লাস, অন্য হাতে টর্চ। কপালে একগুচ্ছ চুল ঝোলানো এক তরুণ সাংবাদিক। পাশে তার ছায়াসঙ্গী ধবধবে সাদা এক কুকুর। দৃশ্যটি মনে এলে আজো কোটি কোটি মানুষের হৃদয়ে নস্টালজিয়ার ঢেউ খেলে যায়। প্রায় এক শতাব্দী ধরে বিশ্বজুড়ে রোমাঞ্চপিপাসুদের শৈশব-কৈশোরকে রঙিন করে রাখা এই টিনটিন ও কুট্টুসের স্রষ্টা জর্জ রেমি, যিনি বিশ্বজুড়ে ‘হার্জ’ ছদ্মনামেই বেশি পরিচিত।

আজ ৩ মার্চ, এ কিংবদন্তি কার্টুনিস্টের মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৮৩ সালের আজকের দিনে তিনি পৃথিবীকে বিদায় জানালেও তার জাদুকরী কলম আর তুলির আঁচড়ে টিনটিন ও কুট্টুস এখনো অমর হয়ে আছে।

১৯০৭ সালে ব্রাসেলসের এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া হার্জের আঁকাআঁকির হাতেখড়ি হয়েছিল অনেকটা শখের বশে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, বিশ্ববিখ্যাত এই শিল্পীর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চারুকলা শিক্ষা ছিল না। স্কাউটিংয়ের মূল্যবোধ আর নিজের পর্যবেক্ষণ ক্ষমতাকে পুঁজি করেই তিনি তৈরি করেছিলেন টিনটিনের মতো এক দুঃসাহসী চরিত্র। ১৯২৪ সালে নিজের নামের আদ্যক্ষর বদলে তিনি ‘হার্জ’ ছদ্মনামটি ব্যবহার করতে শুরু করেন। আর পরবর্তীতে এই নামেই তিনি বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে উঠেন।

টিনটিনের স্রষ্টা জর্জ রেমি যার ছদ্ম নাম ছিল হার্জ। ছবি: টিনটিন ডটকম

হার্জের সৃষ্টির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল তার সূক্ষ্ম কাজ বা ‘ক্লিয়ার লাইন’ শৈলি। তিনি যখন টিনটিনকে কোনো অভিযানে পাঠাতেন, তখন সেই অঞ্চলের ভৌগোলিক অবস্থান, সংস্কৃতি ও স্থাপত্য নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা করতেন। শুরুতে তার গল্পে কিছুটা ঔপনিবেশিক প্রভাব থাকলেও, চীনা ছাত্র চ্যাং চং-জেনের সঙ্গে পরিচয়ের পর হার্জের দৃষ্টিভঙ্গিতে আমূল পরিবর্তন আসে। ‘নীলকমল’ (দ্য ব্লু লোটাস) গল্পে তিনি প্রথমবারের মতো নিখুঁত বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটান, যা টিনটিনকে নিছক বিনোদনের ঊর্ধ্বে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যায়।

চারপাশের বিচিত্র সব চরিত্রের মাধ্যমে টিনটিনের অভিযানের পূর্ণতা আসত। বিশেষ করে ক্যাপ্টেন হ্যাডকের সেই অদম্য সাহস আর তার অদ্ভুত সব গালি, যেমন— হাজার কোটি নরকের কীট বা একশ কোটি বজ্রপাত পাঠকদের হাসির খোরাক জোগাত। ও হ্যাঁ, এখনো আনন্দ জোগায়। সেই সঙ্গে কানে খাটো প্রফেসর ক্যালকুলাস আর যমজ গোয়েন্দা জনসন ও রনসনের হাস্যকর কর্মকাণ্ড হার্জের কাহিনীগুলোকে দিয়েছিল এক অনন্য মাত্রা। আর টিনটিনের সার্বক্ষণিক সঙ্গী কুট্টুস তো গল্পের প্রাণ, যে শুধু লোহচিনি হুইস্কি আর হাড়ের লোভে মাঝেমধ্যে বিপদে পড়লেও শেষ পর্যন্ত টিনটিনকে উদ্ধার করে ঘরে ফিরত।

দ্য ব্লু লোটাস গল্পের প্রচ্ছদ। ছবি: সংগৃহীত

প্রথমদিকে হার্জের সৃষ্ট এক কিশোর চরিত্র থেকেই পরে জন্ম নেয় টিনটিন। ১৯২৯ সালে শিশু-কিশোর পত্রিকায় টিনটিনের প্রথম অভিযান প্রকাশিত হয়। স্পিচ বেলুনে সংলাপ ব্যবহার করে তিনি ইউরোপীয় কমিকসে নতুন ধারার সূচনা করেন। অল্প সময়েই সাহসী রিপোর্টার ও তার কুকুর পাঠকের প্রিয় হয়ে ওঠে। এরপর একের পর এক অভিযানে যুক্ত হয় ক্যাপ্টেন হ্যাডক, বিজ্ঞানী ক্যালকুলাস, গোয়েন্দা জুটি ডুপন্দ-ডুপন্ট এবং অপেরা গায়িকা কাস্তাফিওর। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয় রাস্তাপোপোলাস।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হার্জকে অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। নাৎসি দখলদারিত্বের সময় কাজ চালিয়ে যাওয়ায় তাকে অনেক সমালোচনাও সইতে হয়েছে। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি মানসিক অবসাদে ভুগেছেন। এমনকি নিজের দাম্পত্য জীবনেও বিচ্ছেদ দেখেছেন। তবুও নিজের সৃষ্টির প্রতি তার ভালোবাসা কমেনি। জীবনের শেষ ২৫ বছর তুলনামূলক কম লিখলেও তার প্রতিটি কাজই ছিল পরিমিত ও পরিশীলিত।

টিনটিনের কুকুরের আসল নাম ফরাসি বানানে মিলু। বাংলা অনুবাদে কুকুরটির নাম আবার কুট্টুস। ওর কাজ হলো টিনটিন বিপদে পড়লেই যেভাবেই হোক উদ্ধার করে ঘরে ফেরা। ছবি: সংগৃহীত

মৃত্যুর আগে তিনি ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন, তার অবর্তমানে অন্য কেউ যেন টিনটিনের নতুন কোনো গল্প না আঁকেন। হার্জ ফাউন্ডেশন তার সেই ইচ্ছাকে সম্মান জানিয়ে আজও নতুন কোনো টিনটিন প্রকাশ করেনি।

আজ হার্জের প্রয়াণ দিবসে দুনিয়াজুড়ে তার ভক্তরা শ্রদ্ধাভরে তাকে স্মরণ করছে। তিনি নেই, কিন্তু তার সৃষ্ট সেই রহস্যময় পিরামিড, চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণ কিংবা তিব্বতের পাহাড়ে সেই অদ্ভুত তুষারমানবের খোঁজ— সবই আমাদের কল্পনার জগতে জীবন্ত হয়ে আছে। আজো বিশ্বজুড়ে নতুন কোনো পাঠক যখন টিনটিনের কোনো বই হাতে নেয়, তখন তারা কুট্টুসের সঙ্গে অভিযানে বেরোয়। হার্জের সৃষ্ট জগৎ, রং, রেখা আর রোমাঞ্চে ভরা এ গল্পগুলো চিরকাল মানুষের মাঝে বেঁচে থাকবে।

আরও