মেরু অঞ্চলের কাছাকাছি মিলল ডাইনোসরের ডিমের সন্ধান

প্যালিওন্টোলজিস্ট ও ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডার্লা জেলেনিটস্কির মতে, প্রকাণ্ড শরীরের কারণে পাখির মতো ডিমে তাপ দেয়া টাইটানোসরদের পক্ষে সম্ভব ছিল না; তাপ দিলে ডিম ভেঙে নষ্ট হয়ে যেত। তাই তারা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার একটি ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী কৌশল গ্রহণ করে।

পৃথিবীর ইতিহাসে এ যাবৎকালের সর্ববৃহৎ ডাইনোসর হিসেবে পরিচিত ‘টাইটানোসর’। বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, বিশালাকার এ প্রাণী শুধু নিরক্ষরেখার কাছাকাছি উষ্ণ অঞ্চলেই ডিম পাড়ত। তবে আর্জেন্টিনার দক্ষিণাঞ্চলে পাওয়া ৬ কোটি ৮০ লাখ বছর পুরনো ডিমের খোসার ফসিল বিজ্ঞানীদের সেই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বিষুবরেখা থেকে বহু দূরে, অতি শীতল ও উচ্চ অক্ষাংশের প্রতিকূল পরিবেশেও তারা কীভাবে সফলভাবে প্রজনন প্রক্রিয়াসম্পন্ন করত, তা এক নতুন বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।

টাইটানোসর হলো সুদূর অতীতে পৃথিবীতে বাস করা বিশালাকৃতির ডাইনোসরদের একটি গোষ্ঠী। প্রাক-ঐতিহাসিক যুগের ‘সাউরোপড’ শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত এ প্রাণীরা মূলত তাদের প্রকাণ্ড শরীর ও দীর্ঘ গলার জন্য পরিচিত।

আর্জেন্টিনার চোরিলো ফরমেশনে মেগেলান প্রণালির ৩২২ কিলোমিটার উত্তরে পাওয়া গেছে ২৫৫টি ডিমের খোসার টুকরো। সাউরোপড জাতীয় ডাইনোসরের উচ্চ অক্ষাংশে ডিম পাড়ার ক্ষেত্রে এটিই বিশ্বের সবচেয়ে দক্ষিণের ও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ।

আর্জেন্টিনার চোরিলো ফরমেশনে আবিষ্কৃত ডাইনোসরের ডিমের খোসার ফসিল

গবেষকরা মনে করতেন, বিশালাকারের এই ডাইনোসরগুলো গ্রীষ্মকালে শুধু খাবারের সন্ধানে শীতল বা মেরু অঞ্চলে যেত। আর ডিম পাড়ার সময়ে আবার উষ্ণ এলাকায় ফিরে আসত। তবে এ আবিষ্কার থেকে স্পষ্ট যে, তারা বছরজুড়ে বা প্রজনন মৌসুমে এরকম চরম প্রতিকূল অঞ্চলেও বসবাস করতে সক্ষম ছিল।

ডাইনোসরের ডিমের ফসিল

প্যালিওন্টোলজিস্ট ও ক্যালগারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ডার্লা জেলেনিটস্কির মতে, প্রকাণ্ড শরীরের কারণে পাখির মতো ডিমে তাপ দেয়া টাইটানোসরদের পক্ষে সম্ভব ছিল না; তাপ দিলে ডিম ভেঙে নষ্ট হয়ে যেত। তাই তারা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার একটি ব্যতিক্রমী ও উদ্ভাবনী কৌশল গ্রহণ করে।

টাইটানোসরগুলো মাটি, বালি ও পচাপাতা স্তূপ করে পিকনিক টেবিলের আকৃতির প্রকাণ্ড বাসা তৈরি করত। গাছের পাতা ও জৈব পদার্থ পচার ফলে যে তাপ উৎপন্ন হতো, সেই প্রাকৃতিক উত্তাপেই মূলত ডিম ফুটত। যেহেতু ডাইনোসরের ডিমের খোসা ছিল খুব সূক্ষ্ম ছিদ্রযুক্ত, তাই খোলা জায়গায় রাখলে সেগুলো শুকিয়ে ভ্রূণ মারা যেত। পচাপাতা ও মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার কারণে ডিমের আর্দ্রতা ও উষ্ণতা দুটোই বজায় থাকত।

বিশ্বের প্রাচীনতম ডাইনোসরের ডিমের ভেতরের ছবি

আর এই ডিমের আকৃতি ছিল পূর্ণাঙ্গ ডাইনোসরের তুলনায় খুবই ছোট, মাত্র ১৮ হাজার ভাগের এক ভাগ। চার লিটার ধারণক্ষমতার এই ডিমগুলো থেকে বের হওয়া বাচ্চার ওজন হতো প্রায় চার কেজি, যা বড় হয়ে রূপ নিত ৭৫ হাজার কেজি ওজনের এক এক বিশাল দৈত্যে।

এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ ব্রুসেটের মতে, প্রাকৃতিক বৈরী পরিবেশ জয় করে জীবনধারণ ও অভিযোজনের যে ক্ষমতা টাইটানোসর দেখিয়েছে, তা সত্যিই অবাক করার মতো। চরম শীতের মধ্যেও এত বড় একটি প্রজাতি কীভাবে বেঁচে থাকত ও নতুন প্রজন্মের জন্ম দিত, ডাইনোসরদের জীববিজ্ঞানের সেই অজানা অধ্যায়কেই আবার নতুন করে উন্মোচিত করল এই নতুন আবিষ্কার।

—সিএনএন

আরও