জীবনে কখনো কি মনে হয়েছে, আপনি এই পৃথিবীতে আর থাকতে চাননা? কিন্তু এই সিদ্ধান্তটা কি আপনি নিতে পারেন? পারলেও ঠিক কখন পারেন? প্রেমঘটিত কোনো বিচ্ছেদ, পেশাগত জীবনের ব্যার্থতা, নাকি অন্য কোনো কারণ থাকলে? প্রশ্নটি পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বিতর্কিত আইন ও চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনায়।
ফ্রান্সের পার্লামেন্টে সম্প্রতি 'অ্যাসিস্টেড ডাইং' বা চিকিৎসকের সহায়তায় মৃত্যুর বিল অনুমোদনের পর বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। বিষয়টি শুধু মৃত্যু নয়, এটি মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা, অসহনীয় যন্ত্রণা, মানবিক মর্যাদা এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমা নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন।
'অ্যাসিস্টেড ডাইং' বলতে সাধারণ আত্মহত্যাকে বোঝায় না। অনেক দেশে চিকিৎসক কেবল জীবনাবসানের ওষুধ দেন, যা রোগীকেই নিজে গ্রহণ করতে হয়। এটি ‘ফিজিশিয়ান-অ্যাসিস্টেড সুইসাইড’। আবার নেদারল্যান্ডস বা বেলজিয়ামের মতো কয়েকটি দেশে নির্দিষ্ট আইনি শর্ত পূরণ হলে চিকিৎসক নিজেই ওষুধ প্রয়োগ করতে পারেন, যা ‘ইউথেনেশিয়া’ নামে পরিচিত। উভয় ক্ষেত্রেই কঠোর চিকিৎসা মূল্যায়ন ও আইনি তদারকি বাধ্যতামূলক।
ফ্রান্সের নতুন বিলও অত্যন্ত সীমিত পরিসরে এই সুযোগ দিচ্ছে। কেবল প্রাপ্তবয়স্ক, ফরাসি নাগরিক বা বৈধ বাসিন্দা, যারা গুরুতর ও নিরাময়-অযোগ্য রোগে আক্রান্ত, অসহনীয় কষ্ট ভোগ করছেন এবং সম্পূর্ণ সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম-তারাই এই সুবিধার জন্য আবেদন করতে পারবেন। সাধারণত রোগীকেই ওষুধ গ্রহণ করতে হবে, শারীরিকভাবে অসমর্থ হলে চিকিৎসক বা নার্স সহায়তা করতে পারবেন।
বর্তমানে বিশ্বের অল্প কয়েকটি দেশে কোনো না কোনোভাবে সহায়তাপ্রাপ্ত মৃত্যুর অনুমতি রয়েছে। ২০০২ সালে নেদারল্যান্ডস প্রথম দেশ হিসেবে ইউথেনেশিয়া বৈধ করে। পরে বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ, স্পেন, নিউজিল্যান্ড, কানাডা ও কলম্বিয়া একই ধরনের আইন প্রণয়ন করে। অন্যদিকে, সুইজারল্যান্ড ১৯৪২ সাল থেকেই বিশেষ শর্তে চিকিৎসকের সহায়তায় ‘স্বেচ্ছামৃত্যু’র অনুমতি দিয়ে আসছে। এখান থেকেই জন্ম নিয়েছে বহুল আলোচিত 'সুইসাইড ট্যুরিজম'- যেখানে বিভিন্ন দেশের মরণাপন্ন মানুষ শেষ যাত্রার জন্য সুইজারল্যান্ডে যান।
সুইসাইড ক্যাপসুল।
বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত ব্যবস্থাগুলোর একটি হলো কানাডার ‘মেডিকেল অ্যাসিস্টেন্স ইন ডাইং (মেইড)’। ২০১৬ সালে চালু হওয়া এ আইন ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়েছে। সমর্থকদের মতে, এটি রোগীর ব্যক্তিগত স্বাধীনতার স্বীকৃতি। সমালোচকদের আশঙ্কা, এর পরিধি বাড়তে থাকলে প্রতিবন্ধী, বয়স্ক বা সামাজিকভাবে দুর্বল মানুষ একসময় নীরবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে যেতে পারেন।
তবে সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্যটি এসেছে মনোবিজ্ঞানের গবেষণা থেকে। অধিকাংশ মানুষ মনে করেন, অসহনীয় শারীরিক ব্যথাই এমন সিদ্ধান্তের প্রধান কারণ। নিজে খেতে না পারা, হাঁটতে না পারা, পরিবারের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়া কিংবা নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কাই তাদের সবচেয়ে বেশি তাড়িত করছে এই সিদ্ধান্ত নিতে।
মনোবিজ্ঞানীরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণের কথা বলেন- ‘Perceived Burdensomeness’, অর্থাৎ নিজের অস্তিত্বকে পরিবারের জন্য বোঝা বলে মনে হওয়া। অনেক মরণাপন্ন রোগী মনে করেন, তাদের চিকিৎসা ও পরিচর্যার কারণে প্রিয়জনদের জীবন থেমে যাচ্ছে। আবার অনেকের ক্ষেত্রে থাকে এক্সিস্টেনশিয়াল সাফারিং Existential Suffering-যেখানে শারীরিক ব্যথার চেয়ে বেশি কষ্ট দেয় জীবনের অর্থ হারিয়ে ফেলার অনুভূতি।
এই কারণেই সহায়তাপ্রাপ্ত মৃত্যু নিয়ে বিতর্কেরও শেষ নেই। সমর্থকদের মতে, একজন মানুষের নিজের জীবন সম্পর্কে শেষ সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার থাকা উচিৎ। অন্যদিকে, বিরোধীদের মতে, জীবন পবিত্র, তাই ইচ্ছাকৃতভাবে জীবন শেষ করার অনুমতি সমাজের নৈতিক ভিত্তিকে প্রশ্নের মুখে ফেলে।
আসলে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান এ বিতর্ককে আরো জটিল করে তুলেছে। আজ মানুষকে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব। কিন্তু সেই দীর্ঘায়িত জীবন সবসময় মর্যাদাপূর্ণ বা কষ্টমুক্ত হয় না। তাই বিশ্বজুড়ে এখন প্রশ্নটি আর শুধু "কতদিন বাঁচানো সম্ভব?" নয়; বরং "কেমন জীবনকে আমরা বাঁচিয়ে রাখছি?"