যেখানে সরষে ফুল দেখা স্বর্গীয় অনুভূতি দেয়

প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী ‘চোখে সরষে ফুল দেখা’ অর্থ বিপদে পড়ে দিশেহারা বা হতবুদ্ধি হয়ে যাওয়া। কিন্তু সরষে ফুল দেখাতেও যে স্বর্গীয় অনুভূতি পাওয়া যায় সে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। কারণ গত পরশু গিয়েছিলাম দিলপাশার বিলে হলুদের রাজ্যে। শুধু দিলপাশার বিল নয়, যাত্রাপথে যত হলুদের সমারহ দেখেছি তা এখন লিখতে বসে চোখের সামনে ভাসছে।

প্রচলিত প্রবাদ অনুযায়ী ‘চোখে সরষে ফুল দেখা’ অর্থ বিপদে পড়ে দিশেহারা বা হতবুদ্ধি হয়ে যাওয়া। কিন্তু সরষে ফুল দেখাতেও যে স্বর্গীয় অনুভূতি পাওয়া যায় সে অভিজ্ঞতা আমার হয়েছে। কারণ গত পরশু গিয়েছিলাম দিলপাশার বিলে হলুদের রাজ্যে। শুধু দিলপাশার বিল নয়, যাত্রাপথে যত হলুদের সমারহ দেখেছি তা এখন লিখতে বসে চোখের সামনে ভাসছে।

ঢাকা কমলাপুর স্টেশন থেকে ধূমকেতু এক্সপ্রেস ট্রেন ছাড়বে সকাল ৬টায়। গন্তব্য পাবনায় অবস্থিত বড়াল ব্রিজ রেলওয়ে স্টেশন। ট্রেন যেন মিস না হয় সে ভয়ে আগের রাতেই যুক্ত হলাম একঝাঁক রোমাঞ্চপ্রেমীদের সঙ্গে। আড্ডা ও চায়ে কিছু সময় পার করে চেষ্টা চলল বিশ্রামের। সোয়া ৪টা থেকে পালাক্রমে সবার ফোনে অ্যালার্ম বাজতে শুরু করল। কাফরুল থেকে বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছানো নিরাপদ। কারণ সেখানে গেলে হাতে অতিরিক্ত ২৩ মিনিট পাওয়া যাবে।

একটি মাইক্রোবাসে রওনা দিলাম আমরা ৭জন। পথে আরো একজন যুক্ত হলেন। স্টেশনের প্লাটফর্মে আমরা যখন পৌঁছাই তখন ঘড়িতে বাজে পৌনে ৬টা। হাতে অনেক সময় রয়েছে। কয়েকজন কমলাপুর থেকে আসবেন আর বাকিরা বিমানবন্দর স্টেশন থেকে। আমরা মোটামুটি ২১-২২ জন যাব।

কমলাপুর থেকে যারা আসবেন তাদের একজনের সঙ্গে দলনেতা মাহি ভাই হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করতে থাকলেন ট্রেন ছেড়েছে কি না। বিমানবন্দর স্টেশনে ট্রেন এসে যখন পৌঁছল তখন ঘড়িতে ৭টা বেজে গেছে। টেনে উঠে কয়েকজন ঘুমানোর চেষ্টা করলেন, কেউ কেউ গল্প চালিয়ে গেলেন। আমি গান শুনতে শুনতে কখনো চোখ বন্ধ করে আবার কখনো বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে সময় কাটিয়ে দিলাম। আর একটু পর পর রকি ভাইকে জিজ্ঞেস করলাম, বড়াল ব্রিজে পৌঁছতে আর কত সময় লাগতে পারে।

বড়াল ব্রিজ স্টেশনে ট্রেন থামল প্রায় ১০টা ১৮ মিনিটে। নেমেই চটজলদি একটি গ্রুপ সেলফি হয়ে গেল। ডে-ট্যুরের সমন্বয়ক তৌকির ভাই সবাইকে বললেন, ভ্যানে গেলে কিছুটা ঘুরে যেতে হবে। আর ব্রিজ পার হলে অল্প সময় হেঁটেই ভাঙ্গুড়ার বটতলা মোড়ে যাওয়া যাবে। সেখানেই আমরা সকালের নাস্তা করব।

রোমাঞ্চপ্রেমীরা কি আর এত সহজে ভ্যানে ওঠে! একটুকরো রোমাঞ্চ তাদের হাতছাড়া হওয়া চলবে না। যদিও ব্রিজ পার হতে কোনো বিপদ ছিল না। কারণ সেসময় মেরামতের কাজ চলছিল। তবুও আমরা সারিবদ্ধ হয়ে বেশ সতর্কভাবে এগিয়েছি। মোটামুটি সবার আগে ব্রিজ পার হয়ে যখন পেছনে তাকিয়েছি, মনে হলো ট্রেনের মতোই কতগুলো তরুণ নিজেদের জীবনের গন্তব্যে পৌঁছে যাচ্ছে!

ভাঙ্গুড়া উপজেলায় অবস্থিত বটতলার মোড়

বটতলা মোড়ের একটি হোটেলে সকালের নাস্তা শেষ করে যখন পাশের দোকানের চায়ে চুমুক দিতেই মনে হচ্ছিল সকল ক্লান্তি দূর হয়েছে। তাই এখন প্রধান লক্ষ্য সরিষা ক্ষেতে যেতে আমরা সবাই প্রস্তুত।

দিনটি হাটবার। বাংলাদেশে শ্যালো ইঞ্জিনযুক্ত অনেক যানবাহন চলাচল করে, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে। এসব যানবাহনের বডির আঁকার প্রয়োজনভেদে নানা রকম করা হয়। বটতলা মোড়ে দাঁড়িয়ে দেখি ট্রাকের মতো একেকটি এ ধরনের যানবাহনে করে গরু আনা-নেয়া হচ্ছে। মনে প্রশ্ন জাগল, এসব যানবাহনকে নছিমন বলব নাকি করিমন!

তখন প্রশ্নের সমাধান না করে ব্যাটারিচালিত আসনবিহীন ভ্যানে ৭-৮ জন করে উঠলাম। যাব বড়াল নদীর পারে। ছোটবেলায় একবার ভ্যান থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। তখন কাদামাটি থাকায় খুব একটা ব্যথা পাইনি। অনেকদিন পর ভ্যানে চড়ে বারবার মনে হচ্ছিল এই বুঝি পড়ে যাই! পথে কোথাও খড়ের পালা, গোবরের ঘুঁটে, সবার কৌতূহলী চাহনি দেখে আমি আর শান্তা আপু শৈশবের স্মৃতিচারণ শুরু করে দেই কিছু সময়ের জন্য।

ছোট্ট বন্ধুগুলো আমাদের আনন্দ বাড়িয়েছে

নদীর পাড়ে পৌঁছে কিছু সময় নৌকার অপেক্ষা করতে হলো। মাত্রই উল্টো পাড়ের উদ্দেশে একটি নৌকা ছেড়েছে বলে। এর মধ্যে নদীতে ছয়টি ছানাসহ রাজহাঁসের ছোট এক ঝাঁক আমাদের সবার নজর কাড়ে। কয়েকটি ড্রোন ফুটেজ নিয়ে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় পার হলাম সবাই। এখন চলবে আমাদের হণ্টন পর্ব।

ট্রেনে যখন আসছিলাম তখন সিরাজগঞ্জে জানালা দিয়ে একটু পর পরই সরিষার ক্ষেত দেখা যাচ্ছিল। অনেকের কাছে সরিষা ক্ষেত দেখতে যাওয়ার বিষয় খুব সাধারণ মনে হতে পারে। প্রশ্ন করতে পারে যে সরিষা ক্ষেত দেখতে যাওয়ার কি আছে। কিন্তু সরিষা ক্ষেত আর রাজ্যের মধ্যে উপলব্ধির বেশ ফারাক! নৌকা থেকে নেমে কিছুক্ষণ হাঁটার পর যখন চারিদিকে হলুদ ছাড়া আর কিছুর দেখা পাওয়া যাচ্ছিল না তখন হাড়ে হাড়ে টের পাওয়া বলতে যা বুঝায় তাই হয়েছিল আমার। মন থেকেই বেরিয়ে এসেছিল, এখানে আসা সার্থক।

দলনেতা আগেই বলে দিয়েছিলেন, কৃষকের যেন একটি দানা সরিষারও ক্ষতি না হয়। জমিতে আবাদের যেকোনো কিছু দেখার আসল মজা পাওয়া যায় যখন আইল ধরে হেঁটে যাওয়া হয়। যতটা সম্ভব সতর্কভাবে পা ফেলে আমরা সবাই এঁকেবেঁকে ঘুরে ঘুরে হলুদের রাজ্যে বিচরণ করতে থাকি। মাঝে একটু পর পর আমরা থেকে থেমে ছবি তুলতে মোটেই ভুলে যাইনি। কখনো একা, কখনো সবাই মিলে। কি যে এক আনন্দমাখা মুহূর্ত ছেয়ে ছিল আমাদের চারিদিকে!

চোখের প্রশান্তিতো এখানেই!

আইল ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় মৌমাছির ভনভন শব্দ কানে ভাসছিল। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল নিশ্চয়ই সহযাত্রীদের কেউ হয়তো ড্রোন উড়িয়ে আমাদের আনন্দময় মুহূর্ত ধারণ করছেন। কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়েছি, হলুদের রাজ্যে আমাদের অভ্যর্থনা জানাচ্ছে সরিষা ক্ষেতে ছুটোছুটি করা অসংখ্য মৌমাছি। পথে দূরে ১০-১২টা গরু নিয়ে চড়াচ্ছিলেন একজন। তৌকির ভাই মজা করে জিজ্ঞেস করলেন, আপনার কি একজন রাখাল লাগবে? আমাদের মধ্যে থেকে একজন কাজ করতে আগ্রহী। তিনি হেসে উত্তরে বললেন, তাহলেতো ভালোই হয়।

তাকে বিদায় জানিয়ে আমরা আরো কিছুটা দূর হেঁটে দিলপাশার স্টেশন পেয়ে যাই। যেখানে আয়োজন করা হয়েছে দুপুরের খাবার। এর আগে বেশখানিকটা পথ আমরা রেললাইন ধরে হেঁটেছি, আর চারিদিকের রৌদ্রোজ্জ্বল উপস্থিতি উপভোগ করেছি। ২০-২২ জন রেললাইনে বসে ছবিও তুলেছি।

দিলপাশার রেলওয়ে স্টেশন

সবাই অনেকটা পথ হেঁটে এসেছে দেখে অনেকেই পরিমাণে কম খাবার নিলেও মজা যে হয়েছে এতে দ্বিমত ছিল না। গ্রামের রান্নায় যে জাদু আছে তা নানা প্রয়োজনে শহরে থাকা আমাদের বুঝতে ভুল হয়নি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালে যখন বাসায় ফিরতাম, আর ওইদিন দুপুরে মা যেভাবে যত্ন করে খাবার বেড়ে দিতেন তৌকির ভাইসহ স্থানীয়রা ঠিক সেভাবে খাবার পরিবেশন করেছেন এবং বারবার খোঁজ নিয়েছেন। খাবার শেষে মিষ্টিমুখ যেমন হয়েছে সবার বিন্দু বিন্দু সহযোগিতায় মাহি ভাইয়ের চা আবারো সব ক্লান্তি দূর করেছে।

দিলপাশার স্টেশনের ঠিক পেছন থেকে চলনবিলের হলুদের রাজ্য দেখা যায়। স্টেশন বেশ উঁচু আর সরিষার ক্ষেত বেশ নিচু হওয়ায় চায়ের কাপ হাতে নিয়ে যখন দূরের দৃশ্য দেখছিলাম, পাশাপাশি রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশে হিমেল হাওয়ায় প্রশ্ন জাগছিল, তাহলে স্বর্গ কি এরকমই হয়!

মোটামুটি সব গুছিয়ে নিয়ে আমাদের হাতছানি দেয়া বটগাছের উদ্দেশে রওনা হলাম। রোমাঞ্চপ্রেমীরা একটু পাগলাটে হবে এটাই স্বাভাবিক। আমরা চারজন বটগাছে উঠে ভূত-প্রেত নিয়ে আলাপ-আলোচনা শুরু করে দিলাম। পাশেই ছিল মধুর খামার। আগে থেকেই ঠিক করা ছিল আমরা কে কে মধু নেব। সরিষার ক্ষেত দেখে মধু নিয়ে আমরা যাত্রার ষোলোকলা পূর্ণ করলাম।

যে বটগাছ আমাদের হাতছানি দিচ্ছিল

যে স্টেশনে আমরা নেমেছিলাম সেখান থেকে ঢাকার উদ্দেশে ট্রেন ছেড়ে যাবে ৫টা ৪০ মিনিটের দিকে। হাতে বেশি সময় ছিল না। এর মধ্যেও ছবি তুলতে কয়েকজন শাড়ি ও পাঞ্জাবি পরতে ভুল করেননি। সবকিছু শেষে আমরা আবারো হাঁটতে শুরু করি। এদিকে স্টেশনে যাওয়ার পথ সহজ করতে শ্যালো ইঞ্জিনযুক্ত বাহনের ব্যবস্থা করা হলো। সবাই সেটাতে উঠে আঁকাবাঁকা-উঁচুনিচু পথ পেড়িয়ে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে হৈহুল্লোড় করতে করতে এগিয়ে চললাম। রোলারকোস্টারের অভিজ্ঞতা পথটিতেই হয়েছে বলতে হয়। মজা করে আমরা নাম দিয়েছি ল্যাম্বরগিনিতে যাত্রা।

সবাই আমাদের দিকে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে ছিল। কেউ কেউ জিজ্ঞেস করেছে কোথায় যাচ্ছি আবার ছোটরা আনন্দ-উল্লাস করেছে। গ্রামে এখনো সৌহার্দপূর্ণ ব্যবহার আছে। যারাই জিজ্ঞেস করেছে, কথা বলেছে, মনে হয়েছে আমাদের কত আপন। এরপর বাকিটা পথ যেতে হয়েছে অটোতে। ট্রেন ১০ মিনিট লেট হওয়ায় আমরা ধরতে পারি। তা না হলে ভিন্ন উপায় খুঁজতে হত।

ক্লান্ত শরীরে ফিরলেও অসম্ভব এক ভালো লাগা নিয়ে যে যার বাসায় ফিরেছি মোটামুটি রাত সাড়ে ১০টার মধ্যে। গ্রামীণ জীবন ও প্রকৃতির ছোঁয়া নিজেকে নতুন করে খুঁজতে সাহায্য করে, উৎসাহ দেয়। শহুরে ব্যস্ততার মাঝে সময় করে সানন্দ সময় আবারো ফিরে আসুক সে প্রার্থনা করি।

আরও