ঈদের ছুটিতে যাওয়ার আগে চারপেয়ে বন্ধুদের জন্য কী রেখে যাচ্ছেন

আমাদের নগরজীবনের প্রতিদিনের সঙ্গী স্ট্রে কুকুর বা বিড়ালরা নির্ভর করে আমাদের ফেলে দেয়া খাবার, কিংবা অফিসে যাতায়াতের পথে দেয়া একটু যত্নের ওপর। কিন্তু ঈদের এ ছুটিতে শহর অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যাওয়ায় তারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট যে মানুষের হাত থেকে খাবার পেত, তারা সেই জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কাউকে খুঁজে না পেয়ে এ সময়টায় তারা এক ধরণের মানসিক বিভ্রান্তিতে ভোগে।

ছুটির এ সময়টায় আমরা যারা শহরে অবস্থান করছি কিংবা যাওয়ার আগে এই অবুঝ প্রাণীদের কন্য কিছুটা প্রস্তুতিও নিতে পারি। খুব ছোট ছোট উদ্যোগই এখানে তাদের জন্য বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

ঈদের ছুটিতে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকা। ছুটির আমেজে দলে দলে শহর ছেড়ে গ্রামে ফিরছে মানুষ। ব্যস্ত সড়কগুলো ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ছে, দোকানপাট বন্ধ হচ্ছে, অফিস-পাড়া শুনশান হয়ে যাচ্ছে। এ যাওয়া-আসার ভিড়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, এ শহর শুধু মানুষের নয়। এখানে আরো কিছু প্রাণী আছে, যারা প্রতিদিন আমাদের সঙ্গে এ নগরজীবন ভাগ করে নেয়। আমরা তাদের ‘স্ট্রে’ কুকুর বা বিড়াল বলি। এদের অনেকেই নির্ভর করে আমাদের ফেলে দেয়া খাবার, কিংবা অফিসে যাতায়াতের পথে দেয়া একটু যত্নের ওপর।

নিয়মিত খাবার দেয়া মানুষটি এই পথেই ফিরবে জেনে অপেক্ষা করছিল। ছবি: মিনহাজুল আবেদীন

উৎসবের সময় হঠাৎ করে শহর ফাঁকা হয়ে যাওয়ায়, বোবা এ প্রাণীদের জীবনে নেমে আসে এক অদৃশ্য সংকট। নিয়মিত খাবারের উৎস বন্ধ হয়ে যায়, হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ থাকায় খাবারের উচ্ছিষ্টও আর থাকে না। যারা প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছু মানুষের হাত থেকে খাবার পেত, তারা সেই জায়গাগুলোতে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু কাউকে খুঁজে পায় না। পরিবর্তনটা তাদের জন্য শুধু খাবারেরই অভাব নয়, এক ধরনের মানসিক বিভ্রান্তিও।

ছুটি কাটাতে যাওয়ায় আগে আপনার বাসা কিংবা অফিসের আশেপাশের চারপেয়ে এ বন্ধুগুলোর খাবারের ব্যবস্থা করেছেন তো! ছবি: মিনহাজুল আবেদীন

অনেক সময় দেখা যায়, খাবারের অভাবে এ কুকুর-বিড়ালগুলো দূরে দূরে ছড়িয়ে পড়ে, কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে, আবার কেউ লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে অন্য প্রাণীদের সঙ্গে। ছোট বিড়াল বা কুকুরছানাদের জন্য পরিস্থিতি হয়ে ওঠে আরো কঠিন। পানি, নিয়মিত খাবার, নিরাপদ জায়গা খুঁজে পাওয়া— সবকিছুই তখন তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।

কাওরানবাজারে থাকা এই কুকুরটির নাম হুম্বো। নাম হুম্বো হলে কি হবে! সে কিন্তু মোটেও বোকা না। বাসায় ফেরার কথা বললেই হাত দিয়ে বন্ধুর পা জড়িয়ে এভাবে ঘুমের ভান করে সে।

এমন অবস্থায় আমরা যারা শহরে থাকি, কিংবা যারা যাওয়ার আগে কিছুটা প্রস্তুতি নিতে পারি। খুব ছোট ছোট উদ্যোগই এখানে বড় পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।

এই ছুটিতে খাবারের ব্যবস্থা কীভাবে হবে খুব সম্ভবত তা নিয়ে কাল্টুও চিন্তিত!

প্রথমত, নিয়মিত যেসব জায়গায় খাবার দেয়া হতো, সেখানে যাওয়ার আগে কয়েক দিনের জন্য শুকনো খাবার রেখে যাওয়া যেতে পারে। যেমন— বিস্কুট বা প্যাকেটজাত প্রাণীর খাবার। এগুলো এমনভাবে রাখতে হবে যাতে বৃষ্টিতে নষ্ট না হয় এবং অন্য প্রাণীরাও সহজে খেতে পারে।

বিড়াল ছোট আকারের হওয়ায় সাধারণত খোলামেলাভাবে রাস্তায় খুব কমই ঘুরে। এরা বিল্ডিংয়ের সিড়িঘর বা গ্যারেজে লুকিয়ে থাকে। বয়স অনুযায়ী তাদের জন্য আলাদা করে ড্রাই ক্যাটফুডের ব্যবস্থা করে যাওয়া যেতে পারে। এছাড়া দায়িত্বরত সিকিউরিটি গার্ডকেও বলে যাওয়া যায়।

দ্বিতীয়ত, পানির ব্যবস্থা করা খুব জরুরি। একটি বড় পাত্রে পানি ভরে ছায়াযুক্ত স্থানে রেখে দিলে তা অনেক প্রাণীর তৃষ্ণা মেটাতে সাহায্য করবে। এরকম গরম আবহাওয়ার সময় এটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তৃতীয়ত, আশপাশে যদি দারোয়ান, নিরাপত্তাকর্মী বা স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ থেকে থাকেন তাদের সঙ্গে কথা বলে দায়িত্ব ভাগ করে দেয়া যেতে পারে। একা একজনের পক্ষে সবসময় সম্ভব না হলেও, কয়েকজন মিলে করলে কাজটা অনেক সহজ হয়।

শরীরের নিচে খাবার ঢুকে যাওয়ায় আর বের করতে পারছিলো না। ওর নাম দেয়া হয়েছে 'পল'। যদিও স্থানীয়রা তাকে সিরাজ নামেই চেনে।

চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আশপাশের মানুষকে সচেতন করা যেতে পারে। অনেক সময় মানুষ জানেই না যে তাদের সামান্য সহায়তা কতটা জরুরি হতে পারে।

অফিস এরিয়ার আশেপাশের কুকুরদের দেখভাল করার জন্য বলে যেতে পারেন কলিগদের। ছবি: নিজস্ব আলোকচিত্রী

সবশেষে বিষয়টি শুধু সহানুভূতির নয়, বরং এটি আমাদের সহাবস্থানের প্রশ্ন। আমরা যেমন শহরটাকে আমাদের মতো করে ব্যবহার করি, তেমনি এ প্রাণীদেরও এখানে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। শহর আমাদের জন্য যতটা পরিচিত, এ প্রাণীগুলোর জন্যও ততটাই। পার্থক্য শুধু তারা নিজের প্রয়োজনগুলো নিজেরা বলতে পারে না। শহর ফাঁকা হলে তাদের জীবন আরো কঠিন হয়ে ওঠে, আর তখনই আমাদের ছোট ছোট উদ্যোগগুলো হয়ে ওঠে তাদের বেঁচে থাকার বড় অবলম্বন।

ভালু নামের কুকুরটিও থাকে কাওরানবাজারের মেট্রোস্টেশনে পেছনের গলিতেই

তাই যাওয়ার আগে একবার ভাবা দরকার, যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হতো, যাদের আমরা প্রতিদিন একটু একটু করে খাবার দিয়ে অভ্যস্ত করে তুলেছি, তাদের জন্য আমরা কী রেখে যাচ্ছি? হয়তো সামান্য উদ্যোগই তাদের জন্য বড় ভরসা হয়ে উঠতে পারে।

আরও