তিন ভাইয়ের দুঃসাহসিক অভিযান: প্রশান্ত মহাসাগরে নৌকায় কাটিয়েছেন ১৪০ দিন

তিন ভাইয়ের সমুদ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল পেরু থেকে, আর শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার কেইনসে। ৯ হাজার মাইলের (১৪ হাজার ৪৮৪ কিলোমিটার) এ দীর্ঘ যাত্রায় তাদের সঙ্গী ছিল কেবল নিজেদের তৈরি কার্বন ফাইবারের একটি নৌকা, যার নাম ‘রোজ এমিলি’।

প্রশান্ত মহাসাগরের বিশাল জলরাশি পাড়ি দেয়া এক দুঃসাহসিক চ্যালেঞ্জ। সেখানে প্রায় ১৪০ দিন ধরে টানা বৈঠা চালিয়ে যদি তিন ভাই একটি নতুন বিশ্ব রেকর্ড গড়েন, তাহলে বিষয়টি কেমন হয়? স্কটল্যান্ডের তিন ভাইয়ের গল্প যেন সিনেমার চেয়েও রোমাঞ্চকর। জ্যামি, ইউয়ান ও ল্যাচলান ম্যাকলিন নামের তিন ভাই শুধু রেকর্ডই গড়েননি, তারা প্রমাণ করেছেন—অদম্য ইচ্ছা আর দলবদ্ধতা থাকলে কোনো বাধাই বড় নয়।

তাদের এ সমুদ্রযাত্রা শুরু হয়েছিল পেরু থেকে, আর শেষ হয় অস্ট্রেলিয়ার কেইনসে। ৯ হাজার মাইলের (১৪ হাজার ৪৮৪ কিলোমিটার) এ দীর্ঘ যাত্রায় তাদের সঙ্গী ছিল কেবল নিজেদের তৈরি কার্বন ফাইবারের একটি নৌকা, যার নাম ‘রোজ এমিলি’। নৌকাটি অকালে হারানো তাদের বোনের স্মৃতি হিসেবে উৎসর্গ করে এ নাম রেখেছেন তারা। পুরো পথটুকু তারা পাড়ি দিয়েছেন কোনো সাহায্য ছাড়াই। তাদের দাবি, কোনো দ্বীপে নামেননি, নৌকার পাশ দিয়ে যাওয়া কোনো জাহাজের সাহায্যও নেননি তারা।

তাদের যাত্রাপথে প্রকৃতির সঙ্গে ছিল কঠিন লড়াই। মাঝেমধ্যে ঝড়ের কারণে পথ বদলাতে বাধ্য হয়েছেন তারা। একবার এক শক্তিশালী ঝড়ের সময় বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে ছোট ভাই ল্যাচলান নৌকা থেকে ছিটকে সাগরে পড়ে যান। তবে ভাগ্য ভালো, সেফটি লাইনের সঙ্গে বাঁধা থাকায় তিনি নৌকা থেকে বিচ্ছিন্ন হননি। বড় ভাই ইউয়ানের সাহায্যে কোনোমতে তিনি ফিরে আসতে সক্ষম হন। এমন বিপদের মুহূর্তেও তারা মনোবল হারাননি বলে জানিয়েছেন তিন ভাই।

ছবি: ম্যাকলিন ব্রাদারস

অভিযানের বড় চ্যালেঞ্জ ছিল খাবার। তাদের সঙ্গে ছিল প্রায় ৫০০ কেজি শুকনা খাবার ও ৭৫ কেজি ওটস, যা ১৫০ দিন চলার জন্য যথেষ্ট। তবে প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে যাত্রায় দেরি হওয়ার সম্ভাবনা ও কিছুটা নিরাপত্তার বিষয় আমলে নিয়ে শেষের দিকে তারা খাবার গ্রহণের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছিলেন। ল্যাচলান জানান, তাদের কাছে জরুরি অবস্থার জন্য কিছু সামরিক রেশন মজুত ছিল। তবে স্বাদ ভালো না হওয়ায় সেগুলো শেষ সম্বল হিসেবে রেখেছিলেন।

তবে সব কষ্টের পর যখন তারা গন্তব্যে পৌঁছালেন, তাদের প্রথম চাহিদা কী ছিল জানেন? ল্যাচলান বলেছিলেন, তিনি শুধু একটি পরিষ্কার বিছানায় ঘুমাতে চান। আর জ্যামি বলেছিলেন, তিনি একটি পিৎজা খেতে চান!

ছবি: ম্যাকলিন ব্রাদারস

ল্যাচলান বলেন, ‘ভয়ের সময়ও আমরা একজন আরেকজনকে সামলেছি। কারণ আমরা ভাই। আমাদের অনেক দিনের পুরনো বোঝাপড়া আছে, যা সহজে ভেঙে যায় না।’

তারা বলেন, ‘এ যাত্রা কঠিন হলেও চাঁদনি রাতের আকাশ, ডলফিন ও তিমি মাছের কাছাকাছি আসার মতো কিছু মুহূর্ত তাদের সব ক্লান্তি ভুলিয়ে দিয়েছে।’

আগের রেকর্ডটি ছিল ১৬২ দিনের। রাশিয়ার একক নৌকার মাঝি ফিওদর কনিয়ুখভ ২০১৪ সালে এ রেকর্ড গড়েছিলেন। কিন্তু ম্যাকলিন ভাইয়েরা তাদের এ যাত্রা শেষ করেন মাত্র ১৩৯ দিন, ৫ ঘণ্টা ও ৫২ মিনিটে।

তারা শুধু রেকর্ড গড়ার জন্য যাত্রা করেননি এ অভিযানের মাধ্যমে তারা মাদাগাস্কারে বিশুদ্ধ পানির প্রকল্পের জন্য প্রায় ৭ লাখ পাউন্ডের বেশি অর্থ সংগ্রহ করেছেন।

- বিবিসি অবলম্বনে

আরও