ঘোড়ার সঙ্গে মানুষের সখ্যতা হাজার বছরের। কিন্তু আমরা কি জানি যে, আমাদের মনের গভীরের ভয়টুকুও ঘোড়া অবলীলায় ধরে ফেলতে পারে? কেবল মানুষের কণ্ঠস্বর বা মুখের ভঙ্গি দেখে নয়, বরং আক্ষরিক অর্থেই আমাদের ভয়ের ‘গন্ধ’ শুঁকে ঘোড়া বুঝতে পারে আমরা কতটা আতঙ্কিত।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষ যখন ভয় পায়, তখন তার শরীর থেকে নির্গত হওয়া বিশেষ রাসায়নিক সংকেত ঘোড়ার আচরণে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
নাক দিয়ে গন্ধ শুঁকেই মানুষের মনের ভয় শনাক্ত করতে পারে ঘোড়া
ফ্রেঞ্চ ইনস্টিটিউট ফর হর্স অ্যান্ড রাইডিংয়ের (আইএফসিই) গবেষক প্লোটিন জারদাত এবং তার দল চমকপ্রদ এ তথ্যটি সামনে এনেছেন। বিজ্ঞান সাময়িকী ‘পিএলওএস ওয়ান’ এ প্রকাশিত এ গবেষণায় বলা হয়েছে, মানুষের ঘামের সঙ্গে নির্গত হওয়া রাসায়নিক সংকেত বা ‘কেমোসিগন্যাল’ ঘোড়াদের অনেক বেশি সতর্ক ও সাবধান করে তোলে। তাই কোনো কারণে মানুষ ভয় পেলে ঘোড়া তা বুঝতে পেরে নিজেও অস্থির হয়ে যায় এবং অনেক সময় সে নিজেও ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসে।
গবেষণাটি চালানোর পদ্ধতি ছিল বেশ অদ্ভুত। গবেষকরা প্রথমে কিছু মানুষের ‘আন্ডার আর্মস’ বা বগলের নিচ থেকে কটন প্যাড দিয়ে তাদের ঘামের নমুনা সংগ্রহ করেন। নমুনা সংগ্রহের সময় অংশগ্রহণকারীদের ভয়ের এবং মজার— দু ধরণের ভিডিও দেখানো হয়। এরপর ৪৩টি স্ত্রী ঘোড়ার নাকের কাছে সেই ঘামযুক্ত তুলাগুলো রাখা হয়। গবেষকরা দেখতে পান, ভয়ের ঘামের গন্ধ পাওয়ার পর ঘোড়াগুলো বেশ অস্থির হয়ে উঠছে এবং তাদের হৃদস্পন্দনও বেড়ে যাচ্ছে।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, ভয়ের গন্ধে ঘোড়াগুলো অপরিচিত মানুষের কাছে যেতে দ্বিধা বোধ করছিল। এমনকি একটি ছাতা খুলে দেয়ার মতো সাধারণ ঘটনায়ও অনেক বেশি চমকে উঠছিল।
এর বিপরীতে আনন্দদায়ক মুহূর্তের ঘামের গন্ধে ঘোড়াগুলোর আচরণ ছিল বেশ শান্ত ও স্বাভাবিক। গবেষক জারদাত বলেন, ঘোড়া আমাদের দেখতে বা শুনতে না পেলেও আমরা কেমন অনুভব করছি তা গন্ধ শুঁকে ঠিকই ধরে ফেলতে পারে।
এ আবিষ্কারের একটি বড় প্রায়োগিক গুরুত্ব রয়েছে যারা নিয়মিত ঘোড়ায় চড়েন তাদের জন্য। গবেষক লেয়া ল্যানসেড জানান, হর্স রাইডার বা ঘোড়সওয়ার যদি নিজে আতঙ্কিত থাকেন, তবে সেই ভয়ের বার্তা তার শরীরের গন্ধের মাধ্যমে ঘোড়ার কাছে পৌঁছে যায়। ফলে ঘোড়াটিও অবাধ্য বা অস্থির হয়ে উঠতে পারে। তাই ঘোড়া চালানোর সময় নিজের মনকে শান্ত রাখা আর ভয়হীন থাকা জরুরি।
ঘোড়া চালানোর সময় নিজের মনকে শান্ত আর ভয়হীন রাখা জরুরি
প্রাণী গবেষকরা একে প্রাণিজগতের ‘আবেগীয় সংক্রমণ’ হিসেবে বর্ণনা করছেন। ঘোড়া যেহেতু বন্য পরিবেশে শিকারি প্রাণীর হাত থেকে বাঁচতে অভ্যস্ত, তাই পরিবেশের যেকোনো বিপদের সংকেত বা ভয়ের গন্ধ বুঝতে পারাতা তাদের সহজাত প্রবৃত্তি। আগামীতে গবেষকরা পরীক্ষা করে দেখবেন যে মানুষের দুঃখ বা বিরক্তির মতো আবেগগুলোও ঘোড়া একইভাবে বুঝতে পারে কি না।
—সিএনএন