দক্ষিণ কোরিয়ার একটি চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে যাওয়া দুই বছর বয়সী নেকড়ে নেউকু-কে অবশেষে ৯ দিন পর ঘরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। টানা ৯ দিন ধরে পুরো দেশজুড়ে রীতিমতো শোরগোল ফেলে দেয়া এ নেকড়েটিকে শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ১২টা ৪৪ মিনিটে একটি এক্সপ্রেসওয়ের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। যেন বাস্তবের মাটিতে ঘটছিল এক রোমাঞ্চকর বন্যপ্রাণী-নির্ভর থ্রিলার, যার মূল চরিত্রে ছিল ছোট্ট এই নেকড়ে।
দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যঞ্চলীয় শহর দেজনের ‘ও-ওয়ার্ল্ড’ চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর নেউকু সোশ্যাল মিডিয়াতে রাতারাতি পরিচিতি পায়। তাকে নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা মিম ও ইন্টারনেটে ট্রোল। এমনকি তার নামে ‘মিম কয়েন’ও চালু করেছিলেন ভক্তরা, যেখানে তাকে ‘স্বাধীনতার প্রতীক’ হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়।
নেউকু-কে খুঁজে বের করতে মোতায়েন করা হয় শত শত উদ্ধারকর্মী
শেষমেষ অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে খোদ দেশটির প্রেসিডেন্ট লি জে মায়ুং সোশ্যাল মিডিয়ায় নেউকুর নিরাপদ প্রত্যাবর্তনের জন্য প্রার্থনা করেছিলেন।
গভীর রাতে নির্জন সড়কে নেউকু-কে এভাবে হাটতে দেখা গেছে
চিড়িয়াখানা থেকে পালানোর পর থেকেই নেউকুকে ঘিরে শুরু হয় ব্যাপক অনুসন্ধান অভিযান। শত শত উদ্ধারকর্মী, ড্রোন, ট্র্যাকিং টিম— সবকিছু নিয়েও তাকে সহজে ধরা যায়নি। কখনো পাহাড়ের ঢালে, কখনো গভীর রাতে নির্জন সড়কে নেউকুর দেখা মিলেছে। গাড়ির আলোয় রাস্তা পেরিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়তেই নেউকু রাতারাতি ‘ইন্টারনেট সেনসেশন’ এ পরিণত হয়। উদ্ধারকারীরা কয়েকবার তাকে ধরার খুব কাছাকাছি পৌঁছালেও ধুরন্ধর নেউকু প্রতিবারই জাল কেটে বা কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
আর অন্যদিকে মানুষ নেউকুর এ সাহসী অভিযানে মুগ্ধ হলেও, ভেতরে ভেতরে চিন্তিত ছিল, বন্দিজীবনে বড় হওয়া এ প্রাণী বনে টিকে থাকতে পারবে তো?
অবশেষে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে আনইয়ং-ডং এলাকায় নতুন করে বড় ধরনের অভিযান শুরু করেন উদ্ধারকারীরা। সেখানে ড্রোন দিয়ে দীর্ঘ সময় পর্যবেক্ষণের পর প্রায় ২০ মিটার দূর থেকে ‘ট্রাঙ্কুলাইজার গান’ বা চেতনানাশক বন্দুকের মাধ্যমে নেউকুর উরুতে গুলি করা হয়। প্রায় ৬ মিনিট পর সে নিস্তেজ হয়ে পড়লে উদ্ধারকারীরা তাকে খাঁচায় ভরে দ্রুত চিড়িয়াখানায় নিয়ে আসেন।
ফিরিয়ে আনার পর নেউকুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হয়
চিড়িয়াখানায় ফিরিয়ে আনার পর নেউকুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তার নাড়ির স্পন্দন ও শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক আছে। তবে সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, ৯ দিন বাইরে থাকলেও নেউকুর ওজন খুব একটা কমেনি। এমনকি তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে ঠিকমতোই খাবার খেয়েছে। যদিও মেডিকেল পরীক্ষায় তার পেটে একটি বড় মাছ ধরার বড়শি পাওয়া যায়, যা এনডোস্কোপিক সার্জারির মাধ্যমে সফলভাবে অপসারণ করা হয়েছে।
২০২৪ সালে জন্ম নেয়া এই নেউকু দক্ষিণ কোরিয়ার একটি বিশেষ প্রকল্পের অংশ। এক সময় কোরিয়ান উপদ্বীপে এই নেকড়েদের অবাধ বিচরণ থাকলেও বর্তমানে বন্য পরিবেশে এরা বিলুপ্তপ্রায়। তাই নেউকু পালিয়ে যাওয়ার পর অনেকেই ভয় পেয়েছিলেন, হয়তো নেকড়েটি বাইরের প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকতে পারবে না। তবে সব শঙ্কা কাটিয়ে নেউকু সুস্থ অবস্থায় খাঁচায় ফেরায় স্বস্তি প্রকাশ করেছে দেজন শহর কর্তৃপক্ষ।
এদিকে, কর্তৃপক্ষ সোশ্যাল মিডিয়ায় নেউকুর জন্য শুভকামনা জানানো নেটিজেনদের ধন্যবাদ জানিয়েছে।
—বিবিসি থেকে তথ্য নেয়া