ইঁদুর থেকে বিশ্ব আতঙ্ক

হান্টা ভাইরাসের আদ্যোপান্ত, বিস্তার ও ভয়

একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরে এ রোগ ছড়ানোর ঘটনা নেই বললেই চলে

একটি পরিত্যক্ত গুদামঘর। মেঝেজুড়ে ইঁদুরের মলমূত্র আর নোংরা আবর্জনার স্তূপ। বহুদিন ধরে বন্ধ থাকা সেই ঘরটি পরিষ্কার করতে বুক ভরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে ভেতরে ঢুকলেন এক ব্যক্তি। ঘরের মেঝে ঝাড়ু দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই জমে থাকা শুকনো ধুলাবালি আর ইঁদুরের মলমূত্রের কণা বাতাসে উড়ে মিশে গেল তার নিঃশ্বাসে। ব্যস, অলক্ষ্যেই ঘটে গেল অঘটন।

এর কয়েকদিন পর হঠাৎ করেই শুরু হলো তীব্র জ্বর আর গা কাঁপানো মাথাব্যথা। সাধারণ ফ্লু মনে করে যখন তিনি বিশ্রামে গেলেন, তখনই রোগটি তার আসল রূপ দেখাতে শুরু করল। শরীরজুড়ে শুরু হলো তীব্র ব্যথা, সেই সঙ্গে যোগ হলো দমবন্ধ করা মারাত্মক শ্বাসকষ্ট। দ্রুতই তার ফুসফুসে পানি জমতে শুরু করল এবং চিকিৎসকরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অবস্থার চরম অবনতি ঘটল। পরে ল্যাব পরীক্ষায় ধরা পড়ল— তিনি আসলে কোনো সাধারণ জ্বরে নন, বরং প্রাণঘাতী ‘হান্টা ভাইরাসে’ আক্রান্ত হয়েছেন।

না, এটি কোনো সত্য ঘটনা নয়। এটি একটি কাল্পনিক দৃশ্যপট। তবে হান্টা ভাইরাস মানবদেহে ঠিক কীভাবে প্রবেশ করে এবং কতটা নিঃশব্দে ফুসফুসকে অকেজো করে দেয়, তার প্রতিটি লক্ষণ ও বাস্তব ভয়াবহতা এই গল্পের ছকেই লুকিয়ে আছে। ইঁদুরের ডেরা থেকে ছড়িয়ে পড়া এই নীরব ঘাতকের ইতিহাস এবং এর বিস্তার আজ বিশ্বজুড়ে এক বড় আতঙ্কের নাম।

বিশ্বজুড়ে বহু বছর ধরেই ভাইরাসটি নীরবে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। করোনার মতো মানুষ থেকে মানুষে সহজে না ছড়ালেও এর মৃত্যুঝুঁকি অনেক বেশি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল, গুদামঘর, বন এলাকা কিংবা ইঁদুরের উপদ্রব বেশি— এমন জায়গায় ভাইরাসটি বড় ঝুঁকি তৈরি করে।

যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ভাইরাসের নামকরণ

ভাইরাসটির ইতিহাসের পেছনে লুকিয়ে আছে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের গল্প। ১৯৫০ এর দশকে কোরিয়ান যুদ্ধের সময় প্রথম এ রোগের প্রকোপ দেখা যায়। এ সময় শত শত সেনা হঠাৎ জ্বর, রক্তক্ষরণ ও কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত হতে থাকেন। পরে দক্ষিণ কোরিয়ার হান্টান নদীর আশপাশে ছড়িয়ে পড়া এ রহস্যজনক রোগের উৎস খুঁজে পান বিজ্ঞানীরা। নদীর নাম থেকেই ভাইরাসটির নাম হয় ‘হান্টান ভাইরাস’। পরে এ থেকেই আবার ‘হান্টা ভাইরাস’ নামটি পরিচিতি পায়।

কীভাবে মানুষের শরীরে ঢোকে

হান্টা ভাইরাস মূলত বিভিন্ন প্রজাতির ইঁদুর বা বন্য ইঁদুরের শরীরে বাসা বাঁধে। এ ভাইরাসের প্রধান বাহক হলো ডোরাকাটা মেঠো ইঁদুর বা ‘স্ট্রাইপড ফিল্ড মাউস’। মানুষ সাধারণত এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয় বাতাসে ভেসে থাকা অদৃশ্য কণার মাধ্যমে। ইঁদুরের শুকনো মল-মূত্র, লালা কিংবা তাদের বাসার ধূলিকণা যখন বাতাসে ওড়ে, তখন সাধারণ মানুষ অসতর্কভাবে শ্বাস নেয়ার মাধ্যমে তা ফুসফুসে টেনে নেয়। এছাড়া ইঁদুরের কামড় খেলে বা শরীরের কোনো কাটা ক্ষতস্থানে ইঁদুরের মলমূত্র সরাসরি লাগলে ভাইরাসটি মানবদেহে প্রবেশ করে। একজন মানুষ থেকে অন্য মানুষের শরীরে এ রোগ ছড়ানোর ঘটনা নেই বললেই চলে।

সাধারণত ইঁদুরের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এ ভাইরাসটি সংক্রমিত হয়

লক্ষণ শুরু হয় কীভাবে

হান্টা ভাইরাসের সংস্পর্শে আসার ১ থেকে ৮ সপ্তাহের মধ্যে মানুষের শরীরে লক্ষণগুলো প্রকাশ পেতে শুরু করে। শুরুর দিকে ভাইরাসের ধরন নির্বিশেষে সবার ক্ষেত্রেই সাধারণ কিছু লক্ষণ দেখা দেয়। যেমন— উচ্চ মাত্রার জ্বর, প্রচণ্ড মাথাব্যথা, মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা ও পরিপাকতন্ত্রের নানা সমস্যা যেমন তীব্র পেটে ব্যথা, বমি বমি ভাব কিংবা অনবরত বমি হওয়া।

প্রাথমিক এ লক্ষণগুলোর পর রোগটি ভাইরাসের ধরন অনুযায়ী দুটি ভিন্ন ধাপে বা রূপে মোড় নিতে পারে—

এইচসিপিএস ধাপে যা হবে: রোগটি যদি ফুসফুসকে আক্রমণ করে তবে প্রাথমিক লক্ষণগুলোর পর এটি খুব দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। এ ধাপে রোগীর তীব্র কাশি ও মারাত্মক শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। একই সঙ্গে ফুসফুসের ভেতরে তরল বা পানি জমতে থাকে এবং রোগী তীব্র শকের শিকার হয়।

এইচএফআরএস ধাপে যা হবে: রোগটি যদি রক্তক্ষরণ ও কিডনি বিকল করার রূপ নেয় তবে এর পরবর্তী ধাপগুলোয় রোগীর রক্তচাপ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। সেই সঙ্গে সারা শরীরে রক্তক্ষরণজনিত নানা জটিলতা দেখা দেয় এবং শেষ পর্যন্ত কিডনি সম্পূর্ণ অকেজো বা বিকল হয়ে পড়ে।

মৃত্যুহার এত বেশি কেন?

বিশেষজ্ঞদের মতে, হান্টা ভাইরাসের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো এটি দ্রুত শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলোকে আক্রান্ত করে। বিশেষ করে ফুসফুস, কিডনি ও রক্তনালিতে মারাত্মক ক্ষতি হয়।

রোগটি প্রথম দিকে সাধারণ ভাইরাল জ্বর মনে হওয়ায় অনেক সময় চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। আবার নির্দিষ্ট কোনো অনুমোদিত টিকাও নেই। ফলে রোগীর শারীরিক অবস্থা দ্রুত খারাপ হয়ে যেতে পারে। হান্টান ভাইরাসে মৃত্যুহার প্রায় ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কী বলছে

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হান্টা ভাইরাস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ ও দূষিত পরিবেশ থেকে সতর্ক থাকা।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছেন, ইঁদুরের মলমূত্র ঝাড়ু দিয়ে পরিষ্কার না করে জীবাণুনাশক ব্যবহার করতে হবে। কারণ ঝাড়ু দিলে ভাইরাসযুক্ত ধুলা বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। এছাড়া পরিত্যক্ত ঘর ব্যবহারের আগে অন্তত আধাঘণ্টা খোলা রেখে বাতাস চলাচলের সুযোগ দিতে বলা হয়েছে।

এছাড়া আন্তর্জাতিক চিকিৎসা গাইডলাইন অনুযায়ী, হান্টা ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট স্থায়ী প্রতিষেধক বা মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) অনুমোদিত কোনো ভ্যাকসিন নেই। ফলে লক্ষণভিত্তিক এবং নিবিড় হাসপাতালের সেবাই এ রোগের একমাত্র ভরসা। আক্রান্ত রোগীকে সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখা এবং হাসপাতালে তরল ব্যবস্থাপনা (স্যালাইন ও ইলেক্ট্রোলাইট ব্যালেন্স) নিয়ন্ত্রণ করা খুব জরুরি। অনেক সময় রোগীর শ্বাসকষ্ট ও শক কমাতে অক্সিজেন সাপোর্ট কিংবা তীব্র কিডনি জটিলতায় ডায়ালাইসিসের প্রয়োজন হয়। তাই কড়া নির্দেশনা হলো, রোগীকে আকাশপথে বা ঝাঁকুনিপূর্ণ যানবাহনে স্থানান্তর করা যাবে না। কারণ এতে অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ আরো বেড়ে গিয়ে রোগীর মৃত্যু হতে পারে।

বাংলাদেশর বর্তমান পরিস্থিতি: আমরা কতটা ঝুঁকিতে আছি?

বাংলাদেশে বড় আকারে হান্টা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের তথ্য তেমন নেই। তবে দেশের গ্রামাঞ্চল, খাদ্যগুদাম ও ইঁদুরপ্রবণ এলাকায় ঝুঁকি পুরোপুরি উড়িয়েও দেয়া যাচ্ছে না।

এছাড়া আমাদের দেশে অনেক সময় অজ্ঞাত কারণে তীব্র জ্বর বা কিডনি বিকল হওয়ার ঘটনা ঘটে, যার সঠিক কারণ ল্যাব পরীক্ষার অভাবে আড়ালেই থেকে যায়। তাই আপাতত সচেতনতাই আমাদের বাঁচার প্রধান উপায়।

আরও