যাত্রাপথে বসে থেকেও কেন ক্লান্ত হই আমরা?

মস্তিষ্কের দ্বন্দ্ব স্নায়ুতন্ত্রকে বিভ্রান্ত করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এমন অবস্থায় থাকলে তৈরি হয় একধরনের অবসন্নতা। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সোপাইট সিনড্রোম’, যেখানে দীর্ঘ যাত্রা মানুষকে নিস্তেজ ও ঘুমকাতুরে করে তোলে।

বাসের জানালা দিয়ে তাকালেই দেখা যায় দ্রুত গতিতে সবকিছুকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছি আমরা। যখন আমরা ভ্রমণ করি, কোনো ভারী কাজ নয়, কোনো কায়িক শ্রম নয়। কেবল বসে থাকা। তবু গন্তব্যে পৌঁছে মনে হয়, শরীর যেন একটু ভারী, চোখে আসে ঝিমুনি, মাথার ভেতর এক ধরনের অবসন্নতা জমে ওঠে। কোনোরকম পরিশ্রম ছাড়াই এই ক্লান্তি কোথা থেকে আসে?

মানুষের ক্লান্তি নিয়ে আমাদের প্রচলিত ধারণা বেশ সরল, কাজ করলে ক্লান্তি আসে, পরিশ্রম করলে শরীর ভেঙে পড়ে। কিন্তু ভ্রমণ এই ধারণাকে নীরবে প্রশ্ন করে। কারণ এখানে ক্লান্তি আসে এমন এক অবস্থান থেকে যেখানে শরীর ও মন দুটোই কাজ করে, কিন্তু আমরা তা টের পাই না।

বাস বা গাড়ির ভেতরে বসে থাকা মানে শরীর পুরোপুরি বিশ্রামে আছে, এমনটা ভাবা ভুল। চলমান যানবাহনের প্রতিটি ব্রেক, বাঁক, গতি ও কম্পন আমাদের শরীরের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়। মেরুদণ্ড, ঘাড়, কোমর ও পেটের পেশিগুলো অজান্তেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সমন্বয় করে চলে, যেন শরীর ভারসাম্য হারিয়ে না ফেলে। এই কাজগুলো দৃশ্যমান নয়, কিন্তু একটানা চলতে থাকে। বিজ্ঞানীরা একে বলেন ‘মাইক্রো-মাসকুলার অ্যাডজাস্টমেন্ট’। কোনো একক মুহূর্তে এটি ক্লান্তিকর মনে না হলেও, ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এই অদৃশ্য পরিশ্রম শরীরকে ধীরে ধীরে ক্লান্ত করে দেয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় দীর্ঘ সময় স্থির হয়ে বসে থাকা। হাঁটা বা স্বাভাবিক নড়াচড়ার সময় পায়ের পেশিগুলো রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করে। কিন্তু ভ্রমণের সময় সেই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। রক্ত চলাচল কিছুটা ধীর হয়ে পড়ে, অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, ফলে শরীরে একধরনের ভারী ভাব জন্ম নেয়,যাকে আমরা সাধারণ ভাষায় বলি ‘ক্লান্তি’।

শরীরের পাশাপাশি মস্তিষ্কও যাত্রাপথে বিশ্রাম পায় না। বরং উল্টোটা ঘটে। গাড়ি চলার সময় মস্তিষ্ককে একসঙ্গে বহু তথ্য প্রক্রিয়াজাত করতে হয়, চোখের সামনে বদলে যাওয়া দৃশ্য, কানে ভেসে আসা শব্দ, শরীরের নড়াচড়া, ভেতরের কানে থাকা ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণকারী ভেস্টিবুলার সিস্টেমের সংকেত। আপনি দৃশ্যত কোনো সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন না, কিছু নিয়ন্ত্রণ করছেন না, কোনো সমস্যার সমাধানও করছেন না। মস্তিষ্ক কাজ করছে, অথচ তার শ্রমের কোনো ‘আউটপুট’ নেই। এই অবস্থাকে মনোবিজ্ঞানে বলা হয় ‘লো লেগেল কগনেটিভ ওয়ার্কলোড’। যা আশ্চর্যজনকভাবে খুব দ্রুত মানসিক ক্লান্তি ডেকে আনে।

এই একঘেয়েমির কারণে অনেক সময় মস্তিষ্ক ঢুকে পড়ে এক বিশেষ অবস্থায়, যাকে বলা হয় ‘হাইওয়ে হিপনোসিস’। চারপাশের গতি ও শব্দ একঘেয়ে হয়ে গেলে মন আধা-সচেতন অবস্থায় চলে যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই অবস্থায় সতর্কতা কমে যায়, শরীর ঝিমিয়ে পড়ে, এবং ভ্রমণের শেষে ক্লান্তি আরো স্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সংবেদনগত দ্বন্দ্ব। আমাদের চোখ ও মন অনেক সময় ভিন্ন ভিন্ন বার্তা পাঠায়। ধরুন, আপনি গাড়ির ভেতরে বসে আছেন, মন বলছে আপনি চলছেন, কিন্তু চোখ যদি বই বা ফোনের পর্দায় স্থির থাকে, তখন এই দুই সংকেতের মধ্যে অমিল তৈরি হয়। এই দ্বন্দ্ব স্নায়ুতন্ত্রকে বিভ্রান্ত করে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এমন অবস্থায় থাকলে তৈরি হয় একধরনের অবসন্নতা। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সোপাইট সিনড্রোম’, যেখানে দীর্ঘ যাত্রা মানুষকে নিস্তেজ ও ঘুমকাতুরে করে তোলে।

এর সঙ্গে যোগ হয় যানবাহনের ভেতরের বাতাস। বাস বা গাড়ির কেবিন সাধারণত বন্ধ পরিবেশ। অনেক সময় সেখানে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়, বিশেষ করে জানালা বন্ধ থাকলে বা এয়ার কন্ডিশনারে রিসার্কুলেশন মোড চালু থাকলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড বেড়ে গেলে মানুষের মনোযোগ কমে যায়, মাথা ভারী লাগে, এবং ক্লান্তি দ্রুত আসে। গরম বা গুমোট পরিবেশ এই অনুভূতিকে আরো তীব্র করে তোলে।

তবে এই ক্লান্তি অনিবার্য নয়। ভ্রমণের সময় মাঝেমধ্যে শরীর নড়াচড়া করা, সম্ভব হলে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা বা হালকা স্ট্রেচ করা রক্ত সঞ্চালনে সহায়তা করে। জানালা খুলে বা তাজা বাতাস ঢুকিয়ে ভেতরের পরিবেশ বদলালে মস্তিষ্ক কিছুটা সতেজ থাকে। পর্যাপ্ত পানি পান শরীর ও মনের শক্তি ধরে রাখতে সাহায্য করে। গান, পডকাস্ট বা অডিওবুকের মতো অর্থবহ শব্দ মস্তিষ্ককে একঘেয়েমি থেকে বের করে আনে। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ভ্রমণকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় সময় না ভেবে, নিজেকে সচেতনভাবে আরাম দেয়ার সময় হিসেবে দেখলে ক্লান্তির অনুভূতিও অনেকটাই কমে যায়।

আরও