জঙ্গলের ভয়ঙ্কর প্রাণী বাঘ, ভাল্লুক, হাতি, সাপের কথা তো আপনি জানেনই। কিংবা নিদেনপক্ষে জঙ্গলের ম্যালেরিয়ার জীবাণুবাহী মশার ভয়ে আপনি কাবু হয়ে থাকতেই পারেন। কিন্তু জঙ্গলের ভয়ঙ্কর আরেকটি প্রাণী হলো অতি ক্ষুদ্র এক পরজীবী, যার নাম এঁটুলি, বানানান্তরে আঁটুলি। ইংরেজিতে সাধারণ নাম Tick কিংবা Deer Tick (Ixodes scapularis)। এ জাতের পোকাকে হার্ড টিক বলা হয়, যা Ixodidae পরিবারের; সেজন্য কেউ কেউ এদের টিক পোকাও বলে থাকেন। জঙ্গলে কাজে, কিংবা বেড়াতে গেলে সম্ভাবনা থাকে যে, তারা আপনার শরীরে ভর করে চলে আসতে পারে।
এরা এক প্রকারের পরজীবী— তাই প্রাণীবিজ্ঞানীরা এদের পোকা বলতে নারাজ; বরং তাদের বিচারে এরা মাকড়শার গোত্রের। একটি প্রাপ্তবয়স্ক এঁটুলির আটটি পা থাকে। কালো পায়ের এ পরজীবী ডিম থেকে লার্ভা পর্যায়ে গেলে একটা ছোট্ট বিন্দুর আকারের হয়, তার থেকে একটু বড় হলে সরিষার দানার মতো হয়, আর পূর্ণবয়স্ক এঁটুলি সর্বোচ্চ একটা আপেলের বীজের আকারের হয়। বেঁচে থাকার জন্য এদের স্তন্যপায়ী প্রাণী, পাখি কিংবা উভচরদের মত পোষকের শরীরে আশ্রয় নিতে হয়, আর তারপর পোষকের রক্ত চুষে টিকে থাকে। এঁটুলি নিজে ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত হলে তার কামড়ে পোষক, বিশেষত মানুষ ঐ ক্ষতিকর রোগে আক্রান্ত হতে পারে।
বাংলাদেশ ছাড়াও উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, মেক্সিকোর কিছু অংশেও এদের প্রাদুর্ভাব প্রবল। বাংলাদেশে প্রতি বছর কত মানুষ এ পোকার আক্রমণের স্বীকার হন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই। প্রসঙ্গত বলে নেয়া উচিত, সিলেট এবং অন্য স্থানীয় ভাষায় গবাদি পশুকে আক্রান্তকারী আটালি/আঠালি/আটাইল বলে যে পোকা দেখা যায়, তাও এঁটুলিরই একটি প্রজাতি: ব্রাউন ডগ টিক (Rhipicephalus sanguineus)।
এঁটুলি জঙ্গলের শুকনো স্থানে থাকে। ভেজা স্থান, ঝিরি/ছড়া ইত্যাদি জলমগ্ন স্থানের আশেপাশে এরা থাকে না। শুষ্ক মৌসুমে এদের বিচরণ, উষ্ণতা ভালোবাসে। বৃষ্টির পরে কিংবা বর্ষায় এরা থাকে না। বাড়ির আশেপাশেও জংলা স্থানে পোষকের বিচরণ থাকলে সেখানেও এরা থাকতে পারে। মানুষ কিংবা গৃহপালিত প্রাণীরা সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে জঙ্গলে কিংবা জংলা স্থানে গেলে এদের দ্বারা আক্রান্ত হয়ে থাকে।
মানুষের মধ্যে বনজীবী, বনে অভিযাত্রী বা বন্যপ্রাণ বিশেষজ্ঞরা প্রায়শই তাদের দ্বারা আক্রান্ত হন এবং এ পরজীবীর পোষক হয়ে ওঠেন। জঙ্গলে, সবসময় যে স্থির বসে থাকলেই তারা পোষকের শরীরে উঠে আসবে, বিষয়টা কিন্তু সেরকম না। অনেক সময় চলতি পথেও কাপড়ের সঙ্গে এঁটে গিয়ে এরা শরীরে উঠে পড়ে। তবে এরা লাফ দিতে পারে না, বাতাসে ভেসে বেড়ায় না, কিংবা গাছের ওপর থেকে গায়ে পড়ে না। এরা হাঁটু কিংবা কোমরসমান উচ্চতার গাছপালায় কিংবা জঙ্গলের মেঝেতে পাতার তলায় থাকে, সেখান থেকেই শরীরে আসে। শুরুতে পোষকের শরীরের রক্ত চুষে খেয়ে টিকে থাকে আর ধীরে ধীরে তারা কানের লতি, শরীরের উষ্ণ অংশ যেমন বোগল, শরীরের নিম্নাংশ ইত্যাদি স্থানে গিয়ে আশ্রয় নেয়। সেখানে তারা চামড়া ভেদ করে মাথা ঢুকিয়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ রক্ত চুষে খেতে থাকে।
মশার মতোই রক্ত শুষে বেঁচে থাকা পরাশ্রয়ী জীবন পর্যন্ত ঠিকই ছিলো। কিন্তু এরা মারাত্মক হয়ে উঠে যখন পোষকের শরীরে ডিম পাড়ে এবং বংশবৃদ্ধি শুরু করে, আর মারাত্মক রোগ ছড়ায়। তিন প্রকারের এঁটুলি প্রায় ১৫ রকমের রোগ ছড়াতে পারে। এঁটুলির কামড়ে চুলকানি আর ব্যাথা খুবই সাধারণ বিষয়, তাও প্রায় সপ্তাহখানেক পর তা টের পাওয়া যায়।
ব্যাকটেরিয়া-আক্রান্ত এঁটুলির মাধ্যমে ছড়ানো রোগের মধ্যে লাইম রোগ (Borrelia burgdorferi) অন্যতম, যেক্ষেত্রে আক্রান্ত ব্যক্তি চুলকানি, ব্যাথা ইত্যাদি পর্ব পার করে চিকিৎসা না করালে সংক্রমণ বাড়ে। এ রোগে জ্বর, মাথাব্যথা, ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। সংক্রমণ আরো মারাত্মক হলে জটিল আকার ধারণ করে। সেক্ষেত্রে চোখের, মস্তিষ্কের, কিংবা হৃদযন্ত্রের সমস্যা, মুখমণ্ডল অবশ হয়ে যাওয়াসহ মারাত্মক সব পরিণতিও হতে পারে।
এঁটুলি থেকে বাঁচার উপায় হলো এদের ঠেকিয়ে রাখা। জঙ্গলের কাছে বাড়ি হলে জঙ্গল আর বাড়ির মাঝে স্পষ্ট ফাঁকা স্থান রাখা— যাতে জঙ্গল আর বাড়ির মাঝে একটা দূরত্ব তৈরি হয়। স্থানটি পরিষ্কার রাখা এবং ঐ অংশে ইঁদুর, হরিণ ইত্যাদি প্রাণীর উপদ্রব নিয়ন্ত্রণ করা।
জংলা স্থানে গেলে, ফুলহাতা শার্ট-প্যান্ট পরে, ডীট কিংবা পার্মেথ্রিনসমৃদ্ধ পোকানিরোধক ঔষধ মেখে যাওয়া; আক্রান্ত স্থান থেকে ফিরে এসে জামা-কাপড় ছেড়ে নিতে পারলে সবচেয়ে ভালো।
পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক জানিয়েছেন, জঙ্গলে সারাদিন ব্যবহৃত পোষাক পরে রাতে না ঘুমানো উচিৎ। তাছাড়া সম্ভব হলে, প্রতিদিন জঙ্গল থেকে ফিরে কাপড় ফ্রিজে রেখে দিলে এতে থাকা এঁটুলি মারা যায়।
অনেকে মনে করেন, কেরোসিন মেখে নিলে এদের আক্রমণ থেকে রেহাই পাওয়া যায়। তবে ইনাম আল হক কেরোসিনের ব্যাপারটা উড়িয়ে দিয়ে বললেন, এদের আক্রমণ ঠেকাতে শরীরের নিম্নাংশে অ্যারোসল স্প্রে করা যেতে পারে (সচেতন থাকুন, মশা মারার অ্যারোসল প্রশ্বাসের সঙ্গে শরীরে যাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতির কারণ)। তিনি আরো বলেন, ওডোমসও (ডীটসমৃদ্ধ পোকা নিরোধক মলমবিশেষ) ভালো কাজ করে।
একজন কাঠুরে আমাকে জানিয়েছেন, সরিষার তেলের বোতলে সাদা পাতা (তামাক পাতা) ভিজিয়ে দুয়েকদিন রেখে দিলে যে নির্যাস তৈরি হয়— তা শরীরের নিম্নাংশে মেখে জঙ্গলে গিয়ে উপকার পেয়েছেন। বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ মনিরুল খান যে গুল (তামাক পাতার বড়ি) মেখেও কিঞ্চিৎ উপকার পেয়েছেন তা জানা যায় তার লেখা বইতে। তবে এখানে বর্ণিত কোনো পদ্ধতিই শতভাগ নিশ্চয়তা দেয় না।
এঁটুলির দ্বারা আক্রান্ত হয়ে গেলে, শরীরের প্রতিটা ইঞ্চি গভীর পর্যবেক্ষণ করলে হয়তো তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। তবে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা অনেক সময়ই সম্ভব হয় না। যখনই ধরা পড়ে, চোখা সরু চিমটা দিয়ে চামড়ার যথাসম্ভব কাছাকাছি অংশে এদের শরীর ধরে খাড়া টান দিলে এরা শরীর থেকে উঠে আসবে।
ইনাম আল হক জানিয়েছেন, ডাক্ট টেপ/স্কচটেপ দিয়ে পোকা চেপে ধরে টান দিলেও সহজে ছাড়ানো যায় তাদের। কারণ চিমটা দিয়ে ছাড়াতে গেলে শরীর ভেঙে গিয়ে ত্বকের গভীরে আটকে থাকলে সেই অংশ ক্ষতস্থানকে বিপদজনক করে তুলতে পারে। আক্রান্ত স্থান সাবান-পানি কিংবা অ্যালকোহলজাতীয় উপাদান দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। আক্রান্ত স্থানে ইনফেকশন, কিংবা জ্বর, শরীরের জোড়ায় ব্যাথা ইত্যাদি উপসর্গ দেখা দিলে জরুরিভিত্তিতে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
পৃথিবীতে মানুষ ছাড়াও উপকারী-অপকারী প্রচুর প্রাণী, অণুজীব রয়েছে। আমার জন্য যা অপকারী, প্রাকৃতিক পরিবেশে তারও নানান উপকার আছে। যেমন এঁটুলি অনেক পাখির খাদ্য। আবার তাদের কারণেই হয়তো ইঁদুর, হরিণ, কিংবা অন্য পোষকদের অবাধ বৃদ্ধি রহিত হয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। তাই এঁটুলিকে প্রকৃতিরই একটু অবিচ্ছেদ্য উপাদান গণ্য করে আমাদের এ বিষয়ে সাবধান থাকা উচিত। আর জঙ্গলে গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে যাওয়া উচিত। সর্বোপরি এদের ব্যাপারে সচেতনতাই পারে এদের ক্ষতি থেকে আমাদের বাঁচাতে। প্রকৃতি টিকে থাক তার আপন মহিমায়।
তথ্যসূত্র
১. ব্রিটানিকা এনসাইক্লোপিডিয়া
২. ইনাম আল-হক — অবসরপ্রাপ্ত উইং কমাণ্ডার, পাখি বিশেষজ্ঞ, অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী, পর্বতারোহী, লেখক, সংগঠক
৩. "ট্রেকিংয়ে হাতেখড়ি" - সালেহিন আরশাদী, অদ্রি
৪. পাহাড়ি কাঠুরে এনামউদ্দিনের সাক্ষাৎকার
৫. Blacklegged (Deer) Tick — University of Rhode Island
৬. James E. Keirans, H. Joel Hutcheson, Lance A. Durden, J.S.H. Klompen, Ixodes (Ixodes) scapularis (Acari: Ixodidae): Redescription of all Active Stages, Distribution, Hosts, Geographical Variation, and Medical and Veterinary Importance, Journal of Medical Entomology, Volume 33, Issue 3, 1 May 1996, Pages 297–318, https://doi.org/10.1093/jmedent/33.3.297