ভ্যালেন্টাইনস ডে’র ইতিহাস, কে এই সেন্ট ভ্যালেন্টাইন?

ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস এবং এর পৃষ্ঠপোষক সাধুর (Patron Saint) কাহিনী রহস্যে ঘেরা। আমরা জানি যে ফেব্রুয়ারি মাস দীর্ঘকাল ধরে রোমান্টিকতার মাস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আজকের ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে খ্রিস্টান ও প্রাচীন রোমান উভয় ঐতিহ্যের অবশিষ্টাংশ রয়েছে। কিন্তু সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কে ছিলেন এবং কীভাবে তিনি এই প্রাচীন আচারের সাথে যুক্ত হলেন?

ভ্যালেন্টাইনস ডে বা ভালোবাসা দিবস প্রতি বছর ১৪ ফেব্রুয়ারি পালিত একটি উৎসব। এবছর উৎসবটি পড়েছে ১৪ ফেব্রুয়ারি শনিবার। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে এইদিনে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের নামে বন্ধু ও প্রিয়জনদের মধ্যে ক্যান্ডি, ফুল এবং উপহার আদান-প্রদান করা হয়।

কিন্তু কে এই রহস্যময় সাধু? আর এই ঐতিহ্যগুলোই বা কোত্থেকে এলো? চলুন জেনে নেয়া যাক, বসন্তকে স্বাগত জানাতে প্রাচীন রোমান আচার 'লুপারকালিয়া' থেকে শুরু করে ভিক্টোরিয়ান ইংল্যান্ডের কার্ড আদান-প্রদানের প্রথা পর্যন্ত—ভালোবাসা দিবসের অর্থ এবং ইতিহাস সম্পর্কে।

সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের কিংবদন্তি

ভালোবাসা দিবসের ইতিহাস এবং এর পৃষ্ঠপোষক সাধুর (Patron Saint) কাহিনী রহস্যে ঘেরা। আমরা জানি যে ফেব্রুয়ারি মাস দীর্ঘকাল ধরে রোমান্টিকতার মাস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। আজকের ভ্যালেন্টাইনস ডে-তে খ্রিস্টান ও প্রাচীন রোমান উভয় ঐতিহ্যের অবশিষ্টাংশ রয়েছে। কিন্তু সেন্ট ভ্যালেন্টাইন কে ছিলেন এবং কীভাবে তিনি এই প্রাচীন আচারের সাথে যুক্ত হলেন?

ক্যাথলিক চার্চ ভ্যালেন্টাইন বা ভ্যালেন্টিনাস নামে অন্তত তিনজন ভিন্ন সাধুকে স্বীকৃতি দেয়, যাদের সবাই শহীদ হয়েছিলেন। একটি প্রাচীন জনপ্রিয় মতানুসারে, ভ্যালেন্টাইন ছিলেন তৃতীয় শতাব্দীতে রোমের একজন ধর্মযাজক। সম্রাট দ্বিতীয় ক্লডিয়াস যখন সিদ্ধান্ত নিলেন যে অবিবাহিত পুরুষরা বিবাহিতদের তুলনায় ভালো সৈনিক, তখন তিনি তরুণদের জন্য বিবাহ নিষিদ্ধ করেন। এই ডিক্রির অন্যায় বুঝতে পেরে ভ্যালেন্টাইন ক্লডিয়াসকে অমান্য করেন এবং গোপনে দম্পতিদের বিয়ে দিতে থাকেন। যখন ভ্যালেন্টাইনের এই কাজ ধরা পড়ে, তখন ক্লডিয়াস তার মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেন।

আবার কেউ কেউ মনে করেন, ইন্টারামনার (বর্তমান তের্নি, ইতালি) বিশপ সেন্ট ভ্যালেন্টাইনই হলেন এই দিবসের প্রকৃত নামদাতা। দ্বিতীয় ক্লডিয়াসের রাজত্বকালে ধর্ম ত্যাগ করতে এবং নতুন অনুসারীদের ধর্মান্তরিত করতে অস্বীকার করার জন্য তারও শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল।

অন্যান্য গল্প অনুসারে, ভ্যালেন্টাইনকে সম্ভবত রোমান কারাগার থেকে খ্রিস্টানদের পালাতে সাহায্য করার জন্য হত্যা করা হয়েছিল, যেখানে তাদের প্রায়শই মারধর এবং নির্যাতন করা হত।

জনপ্রিয় একটি মতানুসারে, একজন কারাবন্দী ভ্যালেন্টাইন নিজেই প্রথম 'ভ্যালেন্টাইন' শুভেচ্ছা পাঠিয়েছিলেন, যখন তিনি একটি তরুণীর প্রেমে পড়েন—সম্ভবত তার জেলারের মেয়ে—যে কারাবাসের সময় তার সঙ্গে দেখা করতে আসত। মৃত্যুর আগে তিনি মেয়েটিকে একটি চিঠি লিখেছিলেন এবং নিচে স্বাক্ষর করেছিলেন 'From your Valentine', যা আজও ব্যবহৃত হয়।

যদিও ভ্যালেন্টাইন কিংবদন্তির পেছনের সত্যতা অস্পষ্ট, তবে প্রতিটি গল্পই তাকে একজন সহানুভূতিশীল, বীরত্বপূর্ণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে রোমান্টিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তুলে ধরে। মধ্যযুগের দিকে এই খ্যাতির কারণেই ভ্যালেন্টাইন ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সে অন্যতম জনপ্রিয় সাধু হয়ে ওঠেন।

ভালোবাসা দিবসের উৎস: ফেব্রুয়ারিতে একটি পৌত্তলিক উৎসব

কেউ কেউ মনে করেন যে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু বা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার বার্ষিকী (যা সম্ভবত ২৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে) স্মরণে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে ভালোবাসা দিবস পালিত হয়। আবার অনেকে দাবি করেন যে, খ্রিস্টান চার্চ পৌত্তলিক উৎসব 'লুপারকালিয়া'-কে 'খ্রিস্টীয়করণ' করার প্রচেষ্টায় ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সেন্ট ভ্যালেন্টাইন দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ১৫ ফেব্রুয়ারি পালিত লুপারকালিয়া ছিল রোমান কৃষি দেবতা ফাউনুস এবং রোমের প্রতিষ্ঠাতা রোমুলাস ও রেমাসের উদ্দেশে উৎসর্গ করা একটি উর্বরতা উৎসব।

'লুপারকালিয়া' উৎসব । ছবি- সংগৃহীত

উৎসব শুরু করার জন্য রোমান যাজকদের একটি দল 'লুপারসি'র একটি পবিত্র গুহায় জড়ো হয়েছিল যেখানে শিশু রোমুলাস এবং রেমাসকে একটি নেকড়ে বা লুপা দ্বারা লালন-পালন করা হত বলে বিশ্বাস করা হত। এরপর পুরোহিতরা উর্বরতার জন্য একটি ছাগল এবং শুদ্ধির জন্য একটি কুকুর বলিদান করতেন। তারপর তারা ছাগলের চামড়া দিয়ে ফালি তৈরি করতেন, সেগুলো বলির রক্তে ডুবিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়তেন এবং নারী ও ফসলের মাঠে সেই চামড়া দিয়ে আলতো করে আঘাত করতেন।

শিশু রোমুলাস এবং রেমাস । ছবি- সংগৃহীত

ভীত হওয়ার বদলে রোমান নারীরা এই স্পর্শকে স্বাগত জানাতেন, কারণ তারা বিশ্বাস করতেন এটি আগামী বছরে তাদের সন্তান ধারণে সহায়ক হবে। কিংবদন্তি অনুসারে, দিনের শেষভাগে শহরের সমস্ত তরুণীরা একটি বড় পাত্রে তাদের নাম লিখে রাখতেন। এরপর শহরের অবিবাহিত পুরুষরা সেখান থেকে একটি করে নাম তুলে বছরের জন্য সেই নারীর সঙ্গে জুটি বাঁধতেন। এই জুটিগুলো প্রায়ই বিয়েতে রূপ নিত।

ভালোবাসা দিবসের অর্থ: রোমান্স এবং প্রেমের দিন

খ্রিস্টধর্মের প্রসারের পরেও লুপারকালিয়া টিকে ছিল, কিন্তু ৫ম শতাব্দীর শেষে পোপ জেলাসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে ঘোষণা করলে এটিকে 'অ-খ্রিস্টান' হিসেবে নিষিদ্ধ করা হয়। তবে অনেক পরে এই দিনটি নিশ্চিতভাবে প্রেমের সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল।

মধ্যযুগে ফ্রান্স এবং ইংল্যান্ডে একটি সাধারণ বিশ্বাস ছিল যে, ১৪ ফেব্রুয়ারি থেকে পাখিদের প্রজনন ঋতু শুরু হয়, যা ভালোবাসা দিবসকে রোমান্টিক হওয়ার ধারণায় যুক্ত করে। ইংরেজ কবি জিওফ্রে চসার তার ১৩৭৫ সালের কবিতা 'Parliament of Fowls'-এ সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে-কে প্রথম রোমান্টিক উদযাপনের দিন হিসেবে লিপিবদ্ধ করেন।

মধ্যযুগ থেকেই ভ্যালেন্টাইনস ডে’তে শুভেচ্ছা জানানো জনপ্রিয় ছিল। যদিও লিখিত ভ্যালেন্টাইন ১৪০০ সালের পর থেকে দেখা দিতে শুরু করে। বর্তমানে টিকে থাকা সবচেয়ে পুরনো ভ্যালেন্টাইন হলো ১৪১৫ সালে অরলিন্সের ডিউক চার্লস কর্তৃক তার স্ত্রীকে লেখা একটি কবিতা, যখন তিনি অ্যাজিনকোর্টের যুদ্ধের পর লন্ডন টাওয়ারে বন্দি ছিলেন। কয়েক বছর পর ধারণা করা হয় যে, রাজা হেনরি পঞ্চম ক্যাথরিন অব ভ্যালোইসকে একটি ভ্যালেন্টাইন নোট লেখার জন্য জন লিডগেট নামে একজন লেখককে নিয়োগ করেছিলেন।

ইতিহাসে ভালোবাসা দিবসের ঐতিহ্য

যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও কানাডা, মেক্সিকো, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং অস্ট্রেলিয়ায় ভালোবাসা দিবস পালিত হয়। গ্রেট ব্রিটেনে ১৭শ শতাব্দীর দিকে এটি জনপ্রিয়ভাবে পালিত হতে শুরু করে।

১৮শ শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ সকল সামাজিক স্তরের বন্ধু এবং যুগলদের মধ্যে ছোট উপহার বা হাতে লেখা নোট আদান-প্রদান সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ১৯০০ সালের দিকে মুদ্রণ প্রযুক্তির উন্নতির কারণে হাতে লেখা চিঠির জায়গা করে নেয় ছাপানো কার্ড। সস্তা ডাকমাশুলও ভ্যালেন্টাইন কার্ড পাঠানোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

আমেরিকানরা সম্ভবত ১৭০০ সালের শুরুর দিকে হাতে তৈরি ভ্যালেন্টাইন আদান-প্রদান শুরু করেছিল। ১৮৪০-এর দশকে এস্থার এ. হাওল্যান্ড আমেরিকায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত ভ্যালেন্টাইন কার্ড বিক্রি শুরু করেন। 'মাদার অব দ্য ভ্যালেন্টাইন' নামে পরিচিত হাওল্যান্ড ফিতা এবং রঙিন ছবি দিয়ে চমৎকার সব কার্ড তৈরি করতেন।

বাংলাদেশে ১৯৮০র দশক থেকে এ দিনটি জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে। বর্তমানে দিনটিকে ঘিরে ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে শুরু করে হোটেল, রেস্টুরেন্ট, ক্লাবগুলো নানা আয়োজন করে।

হলমার্কের তথ্যমতে, বর্তমানে প্রতি বছর ১৪ কোটি ৫০ লাখেরও বেশি ভ্যালেন্টাইনস ডে কার্ড পাঠানো হয়, যা বড়দিনের পর ভালোবাসা দিবসকে বছরের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্ড পাঠানোর উৎসবে পরিণত করেছে।

আরও