জীবনের শেষ তিন দশক বাকরুদ্ধ ও নিথর অবস্থায় কাটিয়েছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। এর পর ১৯৭৬ সালের আজকের দিনে চিরবিদায় নেন তিনি। আর দৈহিকভাবে জাতীয় কবির প্রস্থান ঘটলেও সৃষ্টি, চেতনা ও কর্মের বিচারে বাঙালির হৃদয়ে অক্ষয় ও অমর হয়ে আছেন। সাম্রাজ্যবাদ, শোষণ, অন্যায় ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে অগ্নিঝরা লেখনীর মাধ্যমে তিনি ধূমকেতুর মতো আবির্ভূত হয়েছিলেন, যা বাংলাদেশের যেকোনো বাঁকবদলে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।
বাংলা সাহিত্যের এই মহানায়ক জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছেন চরম শারীরিক অসহায়ত্ব ও বেদনার মধ্য দিয়ে। অসুস্থতার কারণে দীর্ঘ সময় তিনি হারিয়ে ফেলেছিলেন বাকশক্তি ও স্বাভাবিক জীবনযাপনের সক্ষমতা।
১৯৪০ সালে কবিপত্নী প্রমীলা দেবী পক্ষাঘাতগ্রস্ত হন। স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য কবি বিপুল অর্থ ব্যয় করেন। কিস্তিতে কেনা গাড়ি, বালিগঞ্জে এক ভক্তের দেওয়া জমি, বইয়ের স্বত্ব (কপিরাইট) এবং রেকর্ড করা গানের রয়্যালটি—এক এক করে প্রায় সবকিছু বিক্রি ও শেষ করে দিলেও স্ত্রীকে পুরোপুরি সুস্থ করে তুলতে পারেননি।
১৯৪২ সালের ১০ জুলাই নিজেই গুরুতর ও দুরারোগ্য মস্তিষ্কের রোগে আক্রান্ত হন নজরুল। ‘দৈনিক নবযুগ’ পত্রিকায় সাংবাদিকতার সময় তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ধীরে ধীরে তাঁর বাকশক্তি হারিয়ে যেতে থাকে। ওই বছরের ১৭ আগস্ট ছোটভাইতুল্য সুফী জুলফিকার হায়দারকে লেখা এক চিঠিতে কবি নিজের মর্মান্তিক অবস্থার কথা তুলে ধরেন।
চিঠিতে তিনি লেখেন— ‘প্রিয় হায়দার, ...রক্তচাপ নিয়ে শয্যাগত। অত্যন্ত কষ্টের সাথে এই চিঠি লিখছি। ঘরে অসুস্থতা, ঋণ, পাওনাদারদের তাগাদা, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত দুশ্চিন্তা। ...নিজের চিকিৎসার খরচ চালাতে পারছি না। ...এটিই হয়তো তোমাকে লেখা আমার শেষ চিঠি। ...আমার কথা বলা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বহু কষ্টে দু-একটি শব্দ উচ্চারণ করি, তাও সারা শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা দেয়। হয়তো কবি ফেরদৌসীর মতো আমিও আমার জানাজার দিনে টাকা পাব; কিন্তু আমার আত্মীয়দের তা গ্রহণ করতে নিষেধ করে দিয়েছি।’
শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি ১৯৪২ সালের শেষ দিকে তাঁর মানসিক ভারসাম্যও নষ্ট হতে থাকে। এরপর দীর্ঘ তিন দশক তিনি প্রায় নিথর ও বাকরুদ্ধ অবস্থায় কাটান।
নজরুলের চিকিৎসার শুরুতেও নানা সীমাবদ্ধতা ছিল। মূলত হোমিওপ্যাথি ও আয়ুর্বেদিক চিকিৎসা দেয়া হলেও তার অবস্থার উন্নতি হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে সে সময় তাকে উন্নত নিউরোসার্জারির জন্য ইউরোপে পাঠানোও সম্ভব হয়নি। ১৯৫২ সাল পর্যন্ত কবি ও তাঁর পরিবার কলকাতায় অনেকটা নিভৃত জীবন কাটান।
১৯৫২ সালে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের উদ্যোগ এবং ‘নজরুল চিকিৎসা কমিটি’র প্রচেষ্টায় কবি ও তার স্ত্রীকে চার মাসের জন্য রাঁচির একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়।
এরপর ১৯৫৩ সালের মে মাসে নজরুলকে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে নেয়া হয়। সেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রাসেল ব্রেইন, উইলিয়াম সেজিয়েন্ট ও ম্যাককিস্ক তার চিকিৎসা করেন। এয়ার এনসেফালোগ্রাফি এক্স-রেতে দেখা যায়, কবির মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব সংকুচিত হয়ে গেছে। চিকিৎসকদের মধ্যে ড. ম্যাককিস্ক ‘ম্যাককিস্ক অপারেশন’ নামে একটি অস্ত্রোপচারের প্রস্তাব দিলেও ড. রাসেল ব্রেইন তাতে সম্মতি দেননি।
পরে জার্মানির বন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউরোসার্জন অধ্যাপক রোঁয়েন্টগেন এবং ভিয়েনার চিকিৎসকরাও ওই অস্ত্রোপচারের বিরোধিতা করেন। তাঁরা সেরিব্রাল অ্যানজিওগ্রাফি করার পরামর্শ দেন।
১৯৫৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ভিয়েনায় নোবেলজয়ী চিকিৎসক জুলিয়াস ওয়েগনার-জাউরেগের অন্যতম ছাত্র ড. হ্যান্স হফের অধীনে নজরুলকে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ড. হফ নিশ্চিত করেন, কবি ‘পিকস্ ডিজিজ’ নামের একটি নিউরনঘটিত সমস্যায় আক্রান্ত। এর ফলে তাঁর মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল ও পার্শ্বীয় লোব সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল।
পরবর্তী সময়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। তবে চিকিৎসকেরা মোটামুটি একমত হন, রোগটি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোনো অস্ত্রোপচার বা চিকিৎসার মাধ্যমে কবিকে আর স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়।
১৯৫৩ সালের ২৭ ডিসেম্বর কলকাতার দৈনিক যুগান্তর-এ ড. অশোক বাগচির লেখা ‘ভিয়েনায় নজরুল’ শীর্ষক প্রবন্ধে তার চিকিৎসার বিস্তারিত তথ্য প্রকাশিত হয়। এর আগে ১৪ ডিসেম্বর রোম হয়ে কবি পরিবার দেশে ফিরে আসে। পরে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায় নিজে ভিয়েনায় গিয়ে ড. হ্যান্স হফের কাছ থেকে নজরুলের চিকিৎসা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পারেন।
নিজে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েও কবিপত্নী প্রমীলা দেবী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অসীম মমতায় নজরুলকে আগলে রেখেছিলেন। কবির পুত্রবধূ কল্যাণী কাজীর স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে সেই কঠিন দিনগুলোর এক মানবিক ছবি।
তিনি লিখেছেন— ‘মা জীবিত থাকতে অধিকাংশ দিন নিজ হাতে বাবাকে খাইয়ে দিতেন। খাওয়া শেষে হাত-মুখ মুছিয়ে দিতেন। মধ্যরাতে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হলেও মা একা একা লুডো, তাস বা চায়নিজ চেকার্স খেলতেন। কারণ বাবা তো একটানা ঘুমাতেন না; যাতে বাবা জেগে উঠলে একা বাইরে না যান, সেজন্য মা পাহারা দিতেন এবং মাঝে মাঝে ডেকে বলতেন— “চলে এসো, বাইরে যেও না, শুয়ে পড়ো।”’
দুজনের জীবনের শেষ অধ্যায় যেন ছিল অসুস্থতা, দারিদ্র্য, নিঃসঙ্গতা ও পারস্পরিক নির্ভরতার এক দীর্ঘ করুণ কাহিনি।
১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালের ২৪ মে রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের বিশেষ উদ্যোগ এবং ভারত সরকারের বিশেষ অনুমতিতে কবিকে সপরিবারে স্বাধীন বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়।
১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সমাবর্তনে নজরুলকে সম্মানসূচক ডি.লিট ডিগ্রি দেয়া হয়। ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ সরকার তাকে পূর্ণ নাগরিকত্ব দেয়। একই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারি তাকে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।
১৯৭৪ সালে কবির কনিষ্ঠ পুত্র ও বিখ্যাত গিটারবাদক কাজী অনিরুদ্ধের মৃত্যু পরিবারটির জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে।
১৯৭৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে নজরুলের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। তিনি তীব্র জ্বর ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হন। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাকে ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে ভর্তি রেখে পরম যত্নে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওই বছরের ২৯ আগস্ট (বাংলা ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের ১২ ভাদ্র, রবিবার) সকাল ১০টা ১০ মিনিটে পিজি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম।
প্রতি বছর ১২ ভাদ্র কবিকে বিশেষভাবে স্মরণ করা হয়। বাংলা ও ইংরেজি ক্যালেন্ডারের তারিখ গণনার পার্থক্যের কারণে ১২ ভাদ্র সাধারণত ২৯ আগস্টের বদলে ২৭ আগস্ট পড়ে।
কাজী নজরুল ইসলাম তার বিখ্যাত গানে আকুল আবেদন জানিয়েছিলেন—
‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই
যেন গোরে থেকেও মুয়াজ্জিনের আজান শুনতে পাই।’
কবির মরদেহ ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেয়া হয়। সেখানে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তৎকালীন সূত্রগুলো জানায়, জানাজায় সর্বস্তরের প্রায় ১০ হাজার মানুষ অংশ নেন। জানাজা শেষে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম, প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান, নৌবাহিনী প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম এইচ খান, বিমানবাহিনী প্রধান এয়ার ভাইস মার্শাল এ জি মাহমুদ এবং মেজর জেনারেল দস্তগীরসহ সামরিক বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কাঁধে তুলে জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কবির মরদেহ সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণে নিয়ে যান।
চিরবিদ্রোহী কবির প্রয়াণে বাংলাদেশে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়। প্রতিবেশী ভারতের আইনসভায়ও কবির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়।
কবির মৃত্যুর পর ভারতে বসবাসরত জ্যেষ্ঠ পুত্র কাজী সব্যসাচী তৎকালীন বাংলাদেশ সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, যেন কবির মরদেহ ভারতে নিয়ে তার পৈতৃকভিটা চুরুলিয়ায় সমাহিত করা হয়। অবশ্য ২০১১ সালে চুরুলিয়া থেকে প্রমীলা দেবীর সমাধির মাটি এনে কবির সমাধির ওপর ছড়িয়ে দেওয়া হয়। একই কমপ্লেক্সে রয়েছে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, পটুয়া কামরুল হাসান, ফ্যাসিবাদী রাজনীতিবিরোধী সংগঠক শরিফ ওসমান হাদিসহ কয়েকটি কবর।
স্থপতি মাজহারুল ইসলামের নকশায় ২০০৯ সালে কবির সমাধিস্থলকে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় সমাধিসৌধে রূপ দেয়া হয়।