রাজধানীর পলাশীর বাসিন্দা হাবিবা আকতার। কভিডের আগে একদিন শখের বসে বাসায় আসা একটি বিড়াল ছানাকে খাবার দেন। শখ থেকে সখ্য গড়ে ওঠে অল্পদিনেই। বিড়ালটি হয়ে যায় পরিবারের সদস্য। দুই বছরের মাথায় ঘরে বিড়ালের সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়ে। হাবিবার ভাষ্যমতে, শখ করে শুরু করলেও বিড়ালগুলো এখন অবসরের সঙ্গী হয়ে উঠেছে। প্রথম বিড়ালটি বাচ্চা দেয়ার পর এখন পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেড়েছে। স্বামী অফিস আর সন্তান স্কুলে চলে গেলে রাজ্যের একাকীত্ব ভর করত হাবিবার হৃদয়জুড়ে। দুই বছর আগের সে একাকীত্ব ঘুঁচে গেছে বিড়াল পোষার মাধ্যমে। কমেছে অনেক দুশ্চিন্তাও।
নিত্যদিনের ঝুটঝামেলায় ঝিমিয়ে পড়া মনে বিষণ্ণতা জেঁকে বসে। বিষণ্ণতা কাটাতে একেকজনের টনিক একেক রকম। তবে ঢাকায় বসবাসরত নাগরিকদের বিষণ্ণতা রোধে কার্যকরী টনিক পোষা প্রাণী। গবেষণাও তাই বলছে, ঢাকায় পোষা প্রাণীর মালিকরা কম বিষণ্ণতায় ভোগেন। মনোবিদরাও এ গবেষণার সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, মানুষের মন ভালো রাখতে পোষা প্রাণীর ভূমিকা অনন্য। ঢাকার মত নানান সমস্যা জর্জরিত শহরের বাসিন্দাদের জীবনে পোষা প্রাণী অনেকটা স্বস্তি এনে দেবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া একাকীত্ব কাটাতে প্রাচীনকাল থেকেই পোষা প্রাণীর কদর ছিল বলেও মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।
গেল সেপ্টেম্বর মাসে গবেষণা জার্নাল রিসার্চগেটে ‘ডিপ্রেশন এমোং পেট ওনার্স অ্যান্ড নন-পেট ওনার্স: আ কমম্প্রেহেনসিভ ক্রস-সিলেকশনাল স্টাডি ইন ঢাকা, বাংলাদেশ’ শীর্ষক একটি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়। গবেষণাপত্রে বলা হয়, ঢাকায় বসবাসরত পোষাপ্রাণীর মালিকরা পোষাপ্রাণী নেই এমন নাগরিকদের চেয়ে ৪১ শতাংশ কম বিষণ্ণতায় ভোগেন। গবেষণাটি ১৩ বছরের বেশি নানান শ্রেণী পেশার মানুষের ওপর করা হয়েছে।
দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় প্রমাণিত, মানুষের মনস্তাত্ত্বিক গঠনে পোষা প্রাণীর ভূমিকা আছে। বিশেষ করে, যেসব পরিবারে পোষাপ্রাণী আছে ওইসব পরিবারের শিশুদের জীবনযাত্রায়ও পোষাপ্রাণী ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে টিনএজার বয়স থেকে শুরু করে বার্ধক্য পর্যন্ত পোষাপ্রাণীর সঙ্গে মানুষের সখ্য বাড়ে বলে রিসার্চগেটের গবেষণায় বলা হয়েছে। মূলত টিনএজার থেকেই মানুষের ভেতর বিষণ্ণতা দানা বাঁধতে শুরু করে। যাপিত জীবনের দুঃখ-বেদনা ভুলতে মানুষ পোষা প্রাণীর সঙ্গ বেছে নেয় বলেও গবেষণায় বলা হয়েছে।
ছবি : মাসফিকুর সোহান
গবেষকরা রাজধানীর ২৮০জন বাসিন্দার ওপর গবেষণা করেছেন। এর মধ্যে ১৪০জন ছিলেন পোষা প্রাণীর মালিক। অনলাইনে পরিচালিত জরিপে অংশগ্রহণকারীরা প্রশ্নোত্তর মাধ্যমে জানান তাদের বিষণ্ণতা রোধে পোষা প্রাণীর ভূমিকা থাকা ও না থাকার বিষয়টি। গবেষণায় অংশ নেওয়া পোষাপ্রাণীর মালিকদের মধ্যে ৪৪ জন পুরুষ এবং ৯৪জন নারী। অন্যদিকে পোষাপ্রাণী নেই এমন অংশগ্রহণকারীদের ৭৩ জন পুরুষ এবং ৬৭ জন নারী। বৈবাহিক অবস্থা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রায় ৭০ শতাংশ অবিবাহিতদের অংশগ্রহণে গবেষণাটি পরিচালনা করা হয়েছে। বিষণ্ণতা বিবেচনায় ১৪০ জন পোষা প্রাণীর মালিকদের মধ্যে ৪০জন বিষাদগ্রস্ত, আর বাকি ১০০ জনই প্রফুল্লমনের অধিকারী। পোষাপ্রাণী নেই এমন অংশগ্রহাণকারীদের ক্ষেত্রে বিষণ্ণতায় আক্রান্তের সংখ্যা ৪৯জন এবং প্রফুল্ল ৯১জন। ফলাফলে দেখা গেছে, পোষাপ্রাণীর মালিকরা ৪১ শতাংশ বেশি প্রফুল্ল।
দীর্ঘ সময় ধরে যত্ন নেওয়ার মতো কোনো পোষা প্রাণী থাকলে জীবনের দুঃসময়েও ভালোবাসার অনুভূতি দেয়। এমনকি জীবনের কিছু কাঠামো তৈরিতেও ভূমিকা পালন করে। তাকে সময়মতো খাওয়ানো, গোসল করানো, বেড়াতে যাওয়ার মতো বিষয়গুলো একজন অন্যমনস্ক এবং অগোছালো মানুষকেও নিয়মতান্ত্রিক করে তোলে বলে মন্তব্য করেছেন রাজধানী গেন্ডারিয়ার বাসিন্দা আসমাউল হুসনা। তিনি বলেন, ‘আমার পোষা কুকুরটি সম্প্রতি মারা গেছে। নিজের সন্তানের মতই ছিল ও। সারা দিনের কাজ শেষে বাসায় ফিরলে কুকুরটা লেজ নেড়ে আমার সঙ্গে নানান কথা বলত। আসলে পোষাপ্রাণীর যত্নে আমরা এমনভাবে ব্যস্ত থাকি, ওই আনন্দময় ব্যস্ততায়ই আমাদের সব দুঃখ ভুলিয়ে দেয়।’
বিষণ্ণতা রোধে পোষাপ্রাণী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. কামাল উদ্দিন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বহু গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যাদের পোষা পাখি আছে তাদের বিষণ্ণতায় আক্রান্তের হার কম। আমাদের দেশেও এ নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। ঢাকায় অনেকেই পোষা পাখি রাখেন মানসিক স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে। হাতিরপুলে একজন গবেষক পোষা পাখির চিড়িয়াখানা করেছেন এ বিষয়ে গবেষণার জন্য।’
ছবি : মাসফিকুর সোহান
দুশ্চিন্তাগ্রস্ত মানুষের ক্ষেত্রে প্রাণী পুষলে ও তাদের আলিঙ্গন করলে বিষণ্ণতা কমে। সামাজিক উদ্বেগের কারণে স্বাচ্ছন্দ্য থেকে বঞ্চিত মানুষদের জন্য পোষা প্রাণীর সাহচর্য পারস্পরিক সহমর্মিতার উৎস হিসেবে কাজ করে। এ সম্পর্কে ফিকামলি তত্ত্বের জন্য পরিচিত এবং বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির প্রধান পৃষ্ঠপোষক মনোবিজ্ঞানী ড. আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, ‘বিনোদন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না। আমরা কেন টেলিভিশন দেখি, সিনেমা দেখি, নাটক দেখি; সবই তো বিনোদন। ফিকামলি তত্ত্বে আমি পাখি ও পেটকে (পোষা প্রাণী) বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছি। এর প্রধান কারণ শিশু থেকে বৃদ্ধ কেউ পাখি দেখে বিরক্ত হয় না। কোনো কোনো বিনোদনের মাধ্যম কারো কাছে ভাল লাগতে পারে; নাও লাগতে পারে। কিন্তু পাখি এমন বিনোদনের মাধ্যম যা সবার কাছেই ভালো লাগে। পাখি দেখার সঙ্গে সঙ্গে অটোনমাস নার্ভাস সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভালো লাগার কাজ করতে থাকে। এটা অডিও-ভিজুয়াল প্রোসেসে আনন্দ দেয়। এ জন্য পাখি যে পালতে হবে তা কিন্তু নয়। আমরা প্রকৃতিতে পাখি দেখে, টেলিভিশনে, মোবাইলে পাখি দেখে, পোষা প্রাণী দেখে আনন্দ বিনোদন পেতে পারি। মনকে ভালো করতে পারি। সর্বোপরি মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতির ক্ষেত্রে পাখি ও পোষা প্রাণী ইতিবাচক ভূমিকা রাখে।’