প্রশ্ন হলো, আটশ’ কোটি মানুষের পৃথিবীতে সত্যিই কি একজনই আমার জন্য ‘পারফেক্ট’?

সোলমেট বা জন্ম-জন্মান্তরের সাথী: বিজ্ঞান ও হৃদয়ের টানাপড়েন

যারা ‘গ্রোথ বিলিফ’ বা বিবর্তনে বিশ্বাসী, তারা জানে যে ভালোবাসা কোনো তৈরি জিনিস নয়। বরং এটি দুটি মানুষের বছরের পর বছর ধরে করা আপস, ক্ষমা ও ধৈর্যের ফসল। সোলমেট খুঁজে পাওয়া যায় না, বরং একে গড়ে নিতে হয়।

ভ্যালেন্টাইন'স ডে এলে আমাদের মনে এক ধরনের রোমান্টিক বিশ্বাস দানা বাঁধে—কোথাও না কোথাও আমার জন্য একজন ‘পার্ফেক্ট’ বা ‘নিখুঁত’ মানুষ অপেক্ষা করছে। প্লেটো থেকে শেক্সপিয়র, সবাই এ ‘সোলমেট’ বা আধ্যাত্মিক সঙ্গীর ধারণাকে আমাদের মগজে গেঁথে দিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আটশো কোটি মানুষের পৃথিবীতে সত্যিই কি একজনই আমার জন্য ‘পারফেক্ট’? আধুনিক বিজ্ঞান ও মনোবিজ্ঞান এ বিষয়ে কী বলছে?

মিথলজি থেকে আধুনিক মোহ

গ্রিক দার্শনিক প্লেটোর মতে, মানুষ এক সময় চার হাত-পা ও দুই চেহারার এক শক্তিশালী সত্তা ছিল। দেবরাজ জিউস তাদের দ্বিখণ্ডিত করে দেন। সেই থেকে প্রতিটি মানুষ তার ‘হারানো অর্ধেক’ খুঁজে ফিরছে। মধ্যযুগে এ ধারণা ‘কোর্টলি লাভ’ বা নিঃস্বার্থ প্রেমে রূপ নেয়, আর রেনেসাঁ যুগে শেক্সপিয়রের ‘স্টার-ক্রসড লাভার্স নামে পরিচিতি পায়। আর হলিউডের সিনেমা আমাদের শিখিয়েছে, ভালোবাসা মানেই এক অলৌকিক নিয়তি।

তবে মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক ভিরেন স্বামী বলছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, সোলমেট ধারণাটি মূলত শিল্পায়নের ফসল। মানুষ যখন তার কৃষিভিত্তিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শহরে একা হয়ে পড়ল, তখন সে একাকীত্ব থেকে বাঁচতে একজন ‘ত্রাণকর্তা’ খুঁজতে শুরু করল। আজকের ডেটিং অ্যাপগুলো সে আবেগকে এক ধরনের ‘রিলেশন-শপিং’-এ পরিণত করেছে, যা আমাদের আরো বেশি হতাশ করে তুলছে।

‘সোলমেট ট্রাপ’ বা ভাগ্যের ফাঁদ

মনোবিজ্ঞানী জেসন ক্যারল তার গবেষণায় একটি ভয়ংকর সত্য তুলে ধরেছেন, যাকে তিনি বলছেন ‘সোলমেট ট্র্যাপ’। তিনি মনে করেন, যারা মনে করে প্রেম কেবল ‘ভাগ্যের লিখন’ বা ‘ডেস্টিনি’, তারা সামান্য ঝগড়া বা মতভেদ হলেই ভেঙে পড়ে। তাদের মনে হয়, যদি সে আমার সোলমেট হতো, তবে আমাদের মধ্যে কোনো অমিল থাকতো না।

অন্যদিকে, যারা ‘গ্রোথ বিলিফ’ বা বিবর্তনে বিশ্বাসী, তারা জানে যে ভালোবাসা কোনো তৈরি জিনিস নয়। বরং এটি দুটি মানুষের বছরের পর বছর ধরে করা আপস, ক্ষমা ও ধৈর্যের ফসল। সোলমেট খুঁজে পাওয়া যায় না, বরং একে গড়ে নিতে হয়।

হৃদয়ের টান না কি পুরনো ক্ষত?

আমরা অনেক সময় যাকে ‘স্পার্ক’ বা তড়িৎ আকর্ষণ মনে করি, লাভ কোচ সোলমেট বা জন্মজন্মান্তরের সাথী: বিজ্ঞান ও হৃদয়ের টানাপড়েন সেটিকে বিপজ্জনক মনে করেন। তার মতে, অনেক সময় আমরা যে তীব্র আকর্ষণ বা ‘স্পার্ক’ অনুভব করি, তা আসলে ভালোবাসা নয়, বরং ‘ট্রমা বন্ড’। আমাদের মস্তিষ্ক অনেক সময় পুরনো কোনো পরিচিত কষ্ট বা অস্থিরতাকে ভালোবাসা ভেবে ভুল করে। যারা অবহেলা বা অনিশ্চয়তার মধ্যে প্রেম খুঁজে পান, তারা আসলে সুস্থ সম্পর্ক নয়, বরং পরিচিত এক ধরণের উদ্বেগকেই তাড়া করছেন।

গণিতের অংক: একের অধিক ‘সোলমেট’

তবে গণিত বলে প্রেম কোনো অলৌকিক লটারি নয়, বরং একটি সচেতন সিদ্ধান্ত। অর্থনীতিবিদ ড. গ্রেগ লিও কম্পিউটারে একটি সিমুলেশন চালিয়ে দেখেছেন যে, পৃথিবীতে কেবল একজন নয়, বরং হাজার হাজার 'নিখুঁত' সঙ্গী পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আপনি যার সঙ্গে আছেন, অন্য কোনো পরিস্থিতিতে অন্য কারো সঙ্গে আপনার সমান বা তার চেয়েও গভীর সম্পর্ক হওয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু তার মানে এই নয় যে বর্তমান সম্পর্কটি ব্যর্থ। স্থিতিশীল সম্পর্ক নির্ভর করে আপনি কার সঙ্গে মানিয়ে নিতে চাচ্ছেন।

ছোট ছোট যত্ন

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিনের ছোট ছোট যত্ন বা ‘এভরিডে অ্যাক্টস অফ কাইন্ডনেস’ সম্পর্ককে অনেক বেশি টেকসই করে। কোনো দামী হীরা বা বিদেশের ট্রিপ নয়, বরং: সকালে সঙ্গীকে এক কাপ চা বানিয়ে দেয়া, ঘরের টুকটাক কাজে হাত বাড়ানো, সঙ্গীর কঠিন সময়ে তার পাশে কেবল বসে থাকার মতো কার্যকলাপ পরস্পরের প্রতি সম্মান ও মায়া বাড়ায়। রোজকার একঘেয়েমি আর চাপের মধ্যেও এতে সম্পর্কের গভীরতা বাড়ে।

বিজ্ঞান বলছে, সোলমেট হওয়ার চেয়েও ‘সোলমেট হয়ে ওঠা’ গুরুত্বপূর্ণ। নিখুঁত মানুষের খোঁজে জীবন পার না করে, আপনার পাশের অসম্পূর্ণ মানুষটির ভুলগুলো মেনে নিয়ে যখন আপনি একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার শপথ নেন, তখনই বিজ্ঞান আর রোমান্স মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।

বিবিসি অবলম্বনে

আরও