ভিস্তিওয়ালা: বাংলার হারিয়ে যাওয়া জলের বাহক

রাজসিংহাসনে বসে হুমায়ুন তাঁকে প্রতিশ্রুত পুরস্কার হিসেবে মুকুট ও সিংহাসন দেন,সেই ভিস্তিওয়ালা ছিলেন “ভিস্তিওয়ালা নিজাম”। এক দিনের জন্য তিনি মুঘল সম্রাট হয়ে নিজের নামাঙ্কিত স্ট্যাম্প জারি করেন।

যখন নগরায়নের ছোঁয়ায় এই ভূখণ্ড পুরোপুরি ডুবে যায়নি, আধুনিক পানির কল ছিল কেবল কল্পনা—তখন এক মানুষ নিজের কাঁধে করে বয়ে আনতেন জীবনের অপর নাম, পানি। তারা ছিলেন ভিস্তিওয়ালা।

ইতিহাসের প্রথম ভিস্তিওয়ালা

ভিস্তিওয়ালাদের ইতিহাস বহু পুরোনো। বলা হয়, প্রথম ভিস্তি ছিলেন ৬৮০ খ্রিস্টাব্দে কারবালার প্রান্তরে আবুল ফজল আব্বাস (রা.)। ইমাম হোসেন (রা.) এর সেনাদের জন্য ইউফ্রেটিস নদী থেকে মশকে করে পানি আনতে গিয়ে তিনি তীরবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন। তার নামেই পরবর্তীতে এই সম্প্রদায় পরিচিত হয় ‘আব্বাসী’ নামে। এই ভিস্তিওয়ালারা বিভিন্ন ঐতিহাসিক যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। যুদ্ধের সময় তারা তাদের বিশেষ পানির ব্যাগ ‘মশক’ নিয়ে যোদ্ধাদের কাছে গিয়ে তাদের তৃষ্ণা নিবারণ করতো। ‘ভিস্তি’ শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে নানা মত রয়েছে। অনেকের মতে এটি এসেছে ফারসি শব্দ ‘বেহেশত’ থেকে।

ভারত ও বাংলায় আগমন

আরব থেকে আগত মানুষদের হাত ধরেই ভিস্তিওয়ালা পেশা প্রবেশ করে ভারতবর্ষে। পরে তারা উত্তর ভারত, পাকিস্তান ও নেপালে বসতি গড়ে ‘আব্বাসী’, ‘শেখ আব্বাসী’ ও ‘সাক্কা’ নামে পরিচিত হয়। মুঘল সম্রাট বাবরের পুত্র হুমায়ুনের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এক কিংবদন্তি। চৌসার যুদ্ধে প্রাণ বাঁচাতে নদীতে ঝাঁপ দিলে এক ভিস্তিওয়ালা তাকে উদ্ধার করেন। রাজসিংহাসনে বসে হুমায়ুন তাকে প্রতিশ্রুত পুরস্কার হিসেবে মুকুট ও সিংহাসন দেন, সেই ভিস্তিওয়ালা ছিলেন “ভিস্তিওয়ালা নিজাম”। এক দিনের জন্য তিনি মুঘল সম্রাট হয়ে নিজের নামাঙ্কিত স্ট্যাম্প জারি করেন। ইতিহাসে তিনি রয়ে গেলেন একদিনের সম্রাট ভিস্তিওয়ালা নিজাম হিসেবে।

ঢাকায় ভিস্তিওয়ালাদের দিন

ঊনবিংশ শতাব্দীর ঢাকায় পানির প্রচণ্ড অভাব ছিল। খাল, নদী বা কুয়োর ওপরই নির্ভর করত নাগরিকেরা। তুলনামূলকভাবে ধনী পরিবারগুলো মজুর ভাড়া করে বাড়িতে পানি আনাতেন ভিস্তিওয়ালাদের মাধ্যমে। চামড়ার তৈরি ভারী মশক কাঁধে ঝুলিয়ে তারা হাঁটতেন রাস্তা জুড়ে—ডাক দিতেন, “ভিস্তি, আবে ভিস্তি!”তাদের হাঁকে মুখর ছিল ঢাকা, কলকাতা, দিল্লির রাস্তাও। ইতিহাস বলে, বিশ শতকের বিশের দশক পর্যন্ত ঢাকায় ভিস্তিওয়ালাদের আনাগোনা ছিল।

মশক তৈরির কারিগরি

কোরবানির ছাগলের চামড়া থেকে তৈরি হতো মশক। চামড়াগুলো বিশ দিন পানিতে ভিজিয়ে, শুকিয়ে, মহিষের চর্বি ও বিশেষ মোম দিয়ে ঘষে পানি-রোধী করা হতো। একেকটি মশকে প্রায় ৩০ লিটার পানি বহন করা যেত।

ভিস্তিওয়ালাদের সামাজিক অবস্থান

এ পেশার মানুষদের আয় ছিল সামান্য। তবু মুঘল আমলে ঢাকায় গড়ে ওঠে তাদের নিজস্ব সংগঠন। ভিস্তিওয়ালাদের নিজস্ব পঞ্চায়েত ও প্রধান ছিলেন, যাঁকে বলা হতো ‘নওয়াব ভিস্তি’। তাদের বসতির এলাকা থেকেই জন্ম নেয় পুরান ঢাকার আজকের ‘সিক্কাটুলি’ নামটি।
জেমস টেলরের আ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা’ বইতেও পাওয়া যায়, ১৮৩০ সালের আদমশুমারিতে ভিস্তিদের ১০টি গৃহপল্লীর উল্লেখ।

বাংলা সাহিত্যে ভিস্তিওয়ালা

বাংলা সাহিত্যে তাদের ছায়া রয়ে গেছে রবীন্দ্রনাথ, সুকুমার রায়, শামসুর রাহমান ও হুমায়ূন আহমেদের লেখায়। রবীন্দ্রনাথের ‘জুতা আবিষ্কার’ কবিতায় “একুশ লাখ ভিস্তি পুকুরে বিলে রহিল শুধু পাঁক” — সেই চিরপরিচিত ডাকেরই প্রতিধ্বনি। শামসুর রাহমান তার স্মৃতিতে লিখেছেন—“দুবেলা পানি দিতে আসত ভিস্তি, কালো মোষের পেটের মতো ফোলা মশক পিঠে, মাথায় কিস্তি টুপি, কোমরে ভেজা গামছা।”

বিলুপ্তির ইতিহাস

১৮৭৪ সালে লর্ড নর্থব্রুক ঢাকায় ওয়াটার ওয়ার্কসের ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৮৭৮ সালে শেষ হয় প্রকল্প; দিনে দুই লাখ গ্যালন বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ শুরু হয়। এরপর ১৯৬৩ সালে ‘ওয়াসা’ প্রতিষ্ঠার পর নিরাপদ পানির যুগে ভিস্তিওয়ালাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়। ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয় এই পেশা।

আরও