পারমাণবিক বিস্ফোরণের যে চিহ্ন আমরা অজান্তেই শরীরে বয়ে বেড়াই

২০১০ সালে ইতালির একটি হ্রদে উদ্ধার হওয়া একটি লাশের মৃত্যুকাল 'বোমা স্পাইক' ব্যবহার করে শনাক্ত করা হয়েছিল।

১৯৫০-এর দশকে ব্যাপক পরিমাণে ওপেন এয়ার পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা পরিবেশের গঠন বদলে দেয়। কার্বন-১৪ এর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। যা পরবর্তীকালে পানি, গাছ, পশুপাখি এবং খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এই ‘বোমা স্পাইক’ সরাসরি ক্ষতিকর নয়। বরং, গত কয়েক দশকে এটি হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানীদের জন্য এক মূল্যবান উপাদান।

এই বছরের ১৬ জুলাই পূর্ণ হলো নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে প্রথম পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার ৮০ বছর। ‘ট্রিনিটি’ নামে পরিচিত সেই বিস্ফোরণ শুধু যুদ্ধনীতিকে পাল্টেই দেয়নি, পৃথিবীর রসায়নেও রেখে গেছে চিরস্থায়ী এক ছাপ—যা এখনো বিরাজমান আমাদের দাঁত, চোখ, এমনকি মস্তিষ্কেও। এই ছাপের নাম ‘বোমা স্পাইক’ বা ‘বোমা পালস’। এটি মূলত একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর বাতাসে ছড়িয়ে পড়া কার্বন-১৪ আইসোটোপ, যা ধীরে ধীরে প্রবেশ করেছে প্রাণীজ ও উদ্ভিদকোষে, এবং আজও বহন করছে আমাদের দেহ।

১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই, মানবসভ্যতা প্রবেশ করে পারমাণবিক যুগে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটন প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা নিউ মেক্সিকোতে প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালান। বিস্ফোরণের পর ছাই ও সাদা ধূলিকণায় ঢাকা পড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল। তৎকালীন এক গোপন নথি অনুসারে এখন জানা গেছে, তেজস্ক্রিয় কণা প্রায় ২,৭০০ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল।

১৯৫০-এর দশকে ব্যাপক পরিমাণে ওপেন এয়ার পারমাণবিক বোমা পরীক্ষা পরিবেশের গঠন বদলে দেয়। কার্বন-১৪ এর পরিমাণ দ্বিগুণ হয়ে যায়। যা পরবর্তীকালে পানি, গাছ, পশুপাখি এবং খাদ্যচক্রের মাধ্যমে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। এই ‘বোমা স্পাইক’ সরাসরি ক্ষতিকর নয়। বরং, গত কয়েক দশকে এটি হয়ে উঠেছে বিজ্ঞানীদের জন্য এক মূল্যবান উপাদান। এটি দিয়ে এখন বয়স নির্ধারণ, ব্রেন সেল পরিবর্তন বিশ্লেষণ, বন্যপ্রাণী চোরাচালানের উৎস শনাক্তকরণ, এমনকি পুরনো ওয়াইনের সঠিক উৎপাদন সালও নির্ধারণ করা যায়। এমনকি এই ছাপকে বিবেচনা করা হচ্ছে একটি নতুন ভূতাত্ত্বিক যুগ—অ্যানথ্রোপোসিন ঘোষণার ভিত্তি হিসেবে।

ফরেনসিক বিজ্ঞানের জগতেও বিপ্লব এনেছে ‘বোমা স্পাইক'। দাঁত, হাড়, চুল কিংবা চোখের লেন্স বিশ্লেষণ করে জানা যায় একজন ব্যক্তি কবে জন্মেছেন বা মারা গেছেন।

অস্ট্রেলিয়ার গবেষক সেন্টেইন জনস্টোন-বেলফোর্ড ও সোরেন ব্লাউ এক পর্যালোচনায় উল্লেখ করেছেন, ২০১০ সালে ইতালির একটি হ্রদে উদ্ধার হওয়া একটি লাশের মৃত্যুকাল 'বোমা স্পাইক' ব্যবহার করে শনাক্ত করা হয়েছিল।

২০০৪ সালে ইউক্রেনে একটি গণকবরে পাওয়া চুলের নমুনা বিশ্লেষণ করে, নাৎসি যুদ্ধাপরাধের সময়কাল নির্ধারণেও এই পদ্ধতি কার্যকর ছিল। এছাড়া, ২০০৫ সালে সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউটের জীববিজ্ঞানী কির্সটি স্পাল্ডিং আবিষ্কার করেন, বোমা স্পাইক ব্যবহার করে মানব কোষের বয়স নির্ধারণ সম্ভব। তার গবেষণা থেকে জানা যায়, শরীরের ফ্যাট কোষ বা এডিপোসাইটস সারাজীবন ধরে পুনঃসৃষ্টি হয়—যা স্থূলতা নিরাময়ে দেখিয়েছে নতুন পথ।

২০১৩ সালে স্পাল্ডিং দেখান, মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস অঞ্চলে প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও নিউরন তৈরি হয়। এক সময় ভাবা হতো এটি অসম্ভব।

এক নতুন প্রস্তাবিত ভূতাত্ত্বিক যুগ হচ্ছে ‘অ্যানথ্রোপোসিন’— যার মূল ভিত্তি মানব কর্মকাণ্ড। ২০১৬ সালে গবেষকদের একটি দল সিদ্ধান্ত নেয়, ১৯৫০-এর দশকে শুরু হওয়া কার্বন-১৪ স্পাইক এবং অন্যান্য পারমাণবিক চিহ্ন হতে পারে এই যুগের সূচনার ‘গোল্ডেন স্পাইক’।

তারা কানাডার অন্টারিওর ক্রফোর্ড লেকের তলদেশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। সেখানে বোমা স্পাইক, প্লুটোনিয়ামের নির্দিষ্ট চিহ্ন এবং অন্যান্য মানবসৃষ্ট স্তর বিদ্যমান। ২০২৪ সালের মার্চে আন্তর্জাতিক সংস্থা এই যুগকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকৃতি জানালেও সে আলোচনা এখনো চলছে।

আজ যারা বেঁচে আছেন এবং ১৯৫০ বা তার পরে জন্মেছেন, তাদের শরীরে এই পারমাণবিক ছাপ থেকে যাবে হাজার হাজার বছর। ভবিষ্যতের প্রত্নতাত্ত্বিকরা যদি একদিন আমাদের দেহাবশেষ বিশ্লেষণ করেন, তারা হয়তো বুঝতে পারবেন এটি এক ব্যতিক্রমী যুগ—যখন মানুষ পারমাণবিক শক্তি দিয়ে নিজের মতো করে প্রকৃতি পাল্টাতে শুরু করেছিল।


বিবিসি অবলম্বনে

আরও