কোচোয়ান পেশার ইতিবৃত্ত: আভিজাত্য থেকে অস্তিত্বের সংকটে

আজকের দিনে ঘোড়ার গাড়ি কেবল শখের বস্তু মনে হলেও, অতীতে এটি বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হতো। রাজকীয় যাতায়াত থেকে পণ্য পরিবহন সবখানেই ছিল ঘোড়ার গাড়ির আধিপত্য। রাজা, জমিদার এবং ব্রিটিশ আমলাদের প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। দ্রুত চিঠি বা পার্সেল পৌঁছানোর জন্য 'ডাক-গাড়ি' ব্যবহৃত হতো ঘোড়ার গাড়ি, যা চালাতেন অত্যন্ত সাহসী কোচোয়ানরা।

প্রযুক্তির এ আধুনিক যুগে পৃথীবির উন্নত দেশগুলোতে দেখা যায় গাড়ি চলছে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। তবে বিবর্তনের এ যাত্রায় বেহারা, গাড়িয়াল এর মতো আরেকটি পেশার অবদান অনস্বীকার্য। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হয়তো আজ পরিচিতও নয় একসময়ের সেই ঐতিহ্যবাহী পেশা কোচোয়ান সম্পর্কে। একসময় শহরের সকাল শুরু হতো ঘোড়ার টগবগ শব্দে। রোদে চকচকে রাস্তায় ধীরে এগিয়ে যেত ঘোড়ার গাড়ি, লাগাম হাতে কোচোয়ান। একটি পেশা, একটি জীবনধারা, একটি সময়ের প্রতীক।

কোচোয়ানের ইতিহাস ও বিশ্বব্যাপী বিস্তার

'কোচোয়ান' শব্দটি এসেছে মূলত হাঙ্গেরীয় শব্দ 'Kocsi' (কোসি) থেকে। ১৫শ শতাব্দীতে হাঙ্গেরির কোস (Kocs) গ্রামে প্রথম উন্নত মানের যাত্রীবাহী ঘোড়ার গাড়ি তৈরি শুরু হয়। সেখান থেকেই এ গাড়ি চালকদের 'কোচোয়ান' বা 'Coachman' বলা শুরু হয়। বাংলায় এ গাড়ির চালকদের বলা হতো কোচোয়ান বা সহিস।

বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে ইউরোপে ১৭শ থেকে ১৯শ শতাব্দী পর্যন্ত কোচোয়ানদের ব্যাপক চাহিদা ছিল। লন্ডনের রাস্তা থেকে প্যারিসের অলিগলি—সবখানেই ঘোড়ার খুরের শব্দে রাজত্ব করতেন তারা। সে সময় এটি ছিল অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ পেশা। একজন দক্ষ কোচোয়ানকে কেবল গাড়ি চালাতে জানলেই হতো না, বরং ঘোড়ার চরিত্র বুজতে পারা এবং দীর্ঘপথের ক্লান্তি দূর করার কৌশলও জানতে হতো।

তবে ঘোড়ার গাড়ির ইতিহাস আরো পুরনো। প্রাচীন মিশরীয়, গ্রীক এবং রোমানরা রথকে যুদ্ধ, দৌড় প্রতিযোগিতা এবং শোভাযাত্রার জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করত। এগুলো ছিল গতি এবং মর্যাদার প্রতীক। কেল্টিক সভ্যতার কবরস্থান থেকে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে দুই চাকার ঘোড়ার গাড়ির নিদর্শন পাওয়া গেছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে ইউরোপে প্রাচীনকালেই এ যান ব্যবহারের প্রচলন ছিল। ব্রোঞ্জ যুগে ইউরোপে চার চাকার ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়। প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানে পাওয়া এসব গাড়ির কাঠামো বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাকা ও অববাহনের মতো মৌলিক নির্মাণকৌশল তখনই সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। ঘোড়ার গাড়ির উল্লেখ আছে মহাভারতেও।

ঘোড়ার গাড়ির গঠন স্থান, কাল ভেদে ভিন্ন ছিল। কোথাও দেখা যেত দুই চাকার হালকা গাড়ি, কোথাও আবার চার চাকার ভারী কাঠামো। কোনো গাড়িতে দু’পাশে রঙিন কাচের জানালাসহ আবৃত আসন—যেখানে বসে যাত্রী নিজেকে আড়াল করতে পারতেন শহরের কোলাহল থেকে। আবার কোথাও ছিল সম্পূর্ণ খোলা আসন, বাতাস আর পথের দৃশ্য সরাসরি ছুঁয়ে যেত যাত্রীকে। চাকাগুলো ছিল বড় আকারের, শক্ত কাঠের তৈরি। এই বৃহৎ চাকাই ছিল কাঁচা-পাকা রাস্তা পেরোনোর ভরসা। শব্দে, গঠনে ও গতিতে এগুলো শহরের পরিবেশে এক আলাদা ছন্দ তৈরি করত।

বাংলায় কোচোয়ানদের আগমন

বাংলার যাতায়াত ব্যবস্থায় কোচোয়ানদের আগমন ঘটে মূলত ব্রিটিশ আমলে। ইংরেজরা তাদের নিজস্ব আভিজাত্য বজায় রাখার জন্য বিলেত থেকে ঘোড়ার গাড়ি এবং সেই সাথে দক্ষ চালক বা কোচোয়ানদের নিয়ে আসে। আঠারো শতকের শেষের দিকে কলকাতায় প্রথম ঘোড়ার গাড়ি বা 'ফিটন' চালু হয়।

১৯ শতকের মাঝামাঝি ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে জন্ম নেয় একটি আলাদা পেশাজীবী শ্রেণি—কোচোয়ান। স্থানীয় অনেকেই একে পেশা হিসেবে গ্রহণ করেন। ঢাকাই কোচোয়ানদের একটা নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষা গড়ে উঠেছিল। ঢাকায় কোচোয়ানরা সাধারণত উর্দুভাষী ছিলেন, তাদের কথাবার্তা, পোশাক ও আচরণে ফুটে উঠত এক বিশেষ নগর সংস্কৃতি।

ঢাকা শহরে ঘোড়ার গাড়ি সবচেয়ে পরিচিত ছিল ‘টমটম’ নামে। তবে এই নামই শেষ কথা নয়। অঞ্চলভেদে একই বাহনের পরিচয় বদলেছে। কোথাও এটি টাঙ্গা, কোথাও জুড়িগাড়ি, আবার কোথাও এক্কা গাড়ি নামে পরিচিত। নামের এই ভিন্নতা আসলে স্থানীয় ভাষা, ব্যবহার আর সংস্কৃতির প্রতিফলন।

অভিজাত বাহন থেকে গণপরিবহন

ঘোড়ার গাড়ির সূচনা ছিল রাজা-জমিদারদের চলাচলের জন্য। দুটি ঘোড়ায় টানা গাড়িতে বসতেন একজন বা দুজন অভিজাত ব্যক্তি। সুঠাম, সুদর্শন ঘোড়াগুলো ছিল তখনকার আভিজাত্যের অংশ।

ব্রিটিশ শাসনামলের মাঝামাঝি, আনুমানিক ১৮৫৬ সালের দিকে পুরান ঢাকায় ঘোড়ার গাড়ির প্রচলন শুরু হয়। প্রথমে জমিদার ও ধনী শ্রেণির বাহন হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি রূপ নেয় গণপরিবহনে। ব্রিটিশ আমলে ‘টমটম’ নামে পরিচিত এই বাহন তখন নগর যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।

ঢাকায় মূলত দুই ধরনের ঘোড়ার গাড়ি চালু ছিল—ঠিকা ও ব্যক্তিগত। ঠিকা গাড়ির কোচোয়ানদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ ছিল পুরোনো। তবে ব্যতিক্রম ছিল নবাব পরিবারের কোচোয়ানরা। তারা ছিলেন ভদ্র, রসিক ও মর্যাদাশীল। নবাববাড়ির কোচোয়ানদের দেখাদেখি সাধারণ কোচোয়ানরাও যাত্রী আকর্ষণে রঙিন পোশাক পরতে শুরু করেন। ঘোড়ার গাড়ি তখন কেবল বাহন নয়, এক ধরনের চলমান দৃশ্যমান সংস্কৃতি।

উনিশ শতকের শেষভাগে ঘোড়ার গাড়ির ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়। অভিজাত পরিবারের সন্তানদের পাশাপাশি ইডেন কলেজের ছাত্রীদের যাতায়াতেও এটি ব্যবহৃত হতে থাকে।

কোন কোন কাজে ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহৃত হতো?

আজকের দিনে ঘোড়ার গাড়ি কেবল শখের বস্তু মনে হলেও, অতীতে এটি বহুমুখী কাজে ব্যবহৃত হতো। রাজকীয় যাতায়াত থেকে পণ্য পরিবহন সবখানেই ছিল ঘোড়ার গাড়ির আধিপত্য। রাজা, জমিদার এবং ব্রিটিশ আমলাদের প্রধান বাহন ছিল ঘোড়ার গাড়ি। দ্রুত চিঠি বা পার্সেল পৌঁছানোর জন্য 'ডাক-গাড়ি' ব্যবহৃত হতো ঘোড়ার গাড়ি, যা চালাতেন অত্যন্ত সাহসী কোচোয়ানরা। ভারী পণ্য এক শহর থেকে অন্য শহরে নিতে ঘোড়া বা গরুর গাড়িই ছিল একমাত্র ভরসা। বিয়ের পালকির বিকল্প হিসেবে ধনাঢ্য মুসলিম ও হিন্দু পরিবারগুলোতে ঘোড়ার গাড়ির চল ছিল। বিশ শতকের শুরুর দিকে ঢাকা ও কলকাতার সাধারণ মানুষের ভাড়ায় চালিত যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম ছিল এটি।

কোচোয়ান পেশার বিলুপ্তির কারণ

কালের চাকা ঘুরতে ঘুরতে কোচোয়ান পেশাটি আজ যেন ইতিহাসের প্রদর্শনী কক্ষে জায়গা নিতে চলেছে। যে পেশা একদিন শহরের গতি নির্ধারণ করত, আজ তার অস্তিত্ব টিকে আছে স্মৃতি আর হাতে গোনা কয়েকটি ঘোড়ার গাড়িতে। এই বিলুপ্তির পেছনে রয়েছে সময়, প্রযুক্তি আর নগর জীবনের একাধিক বাস্তব কারণ। মোটর ইঞ্জিনের আবিষ্কার নগর পরিবহনে আমূল পরিবর্তন আনে। বাস, ট্যাক্সি ও প্রাইভেট কারের বিস্তারে ঘোড়ার গাড়ির প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই কমে যায়। দ্রুত, নিরবচ্ছিন্ন চলাচলের সামনে ধীরগতির বাহন পিছিয়ে পড়ে। যান্ত্রিক যান শুধু দ্রুতই নয়, দীর্ঘমেয়াদে তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ীও। অল্প সময়ে বেশি দূরত্ব অতিক্রম করার সক্ষমতা মানুষের পছন্দ বদলে দেয়। ফলে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ঘোড়ার গাড়ি প্রতিযোগিতায় টিকতে পারেনি। আধুনিক শহরের রাস্তাগুলো আর আগের মতো প্রশস্ত ও শান্ত নেই। যানজট, ট্রাফিক নিয়ম ও সময়ের তাগিদে ধীরগতির ঘোড়ার গাড়ি হয়ে ওঠে অপ্রাসঙ্গিক। অনেক শহরে যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ঘোড়ার গাড়ি নিষিদ্ধও করা হয়। ঘোড়ার খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার খরচ সময়ের সঙ্গে বেড়েছে। তার ওপর শহরে আস্তাবলের সংকট কোচোয়ানদের জন্য পেশাটি টিকিয়ে রাখা কঠিন করে তোলে। জীবিকার তাগিদে অনেকেই বাধ্য হন ভিন্ন পেশায় যেতে।

বর্তমান অবস্থা

সময় বদলেছে, শহর বদলেছে। ঢাকার রাস্তা থেকে ঘোড়ার গাড়ি প্রায় হারিয়ে গেলেও পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত এখনো ১০ থেকে ১২টি টমটম নিয়মিত যাত্রী বহন করে। সিদ্দিকবাজার, চানখাঁরপুল, আলাউদ্দিন রোডসহ আশপাশের এলাকায় আরও ২০ থেকে ২৫টি ঘোড়ার গাড়ি বিশেষ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হয়। ভেটেরিনারি হাসপাতালের সামনে আলাউদ্দিন রোডে নাজির কোচোয়ানের ঘোড়ার গাড়ি আজও জনপ্রিয়। বর্তমানে পুরান ঢাকা এবং বিয়ের মতো রাজকীয় অনুষ্ঠান ছাড়া কোচোয়ানদের দেখা মেলা ভার। গ্রামাঞ্চলের কোথাও কোথাও এখনো ঘোড়ার গাড়ি দেখা গেলেও কোচোয়ানদের সেই ঐতিহ্য আর নেই। তবে তারা আজও আমাদের লোকজ সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।

যেমন কোচোয়ানের জায়গা দখল করেছে মোটরচালিত যান, তেমনি একদিন হয়তো গাড়ির চালকের পেশাও হারিয়ে যাবে স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির হাতে। সময়চক্র থেমে থাকে না। তবে প্রতিটি হারিয়ে যাওয়া পেশা শহরের ইতিহাসে রেখে যায় তার ছাপ।

আরও