চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লড, ডিপসিকের মতো উৎপাদনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (জেনারেটিভ এআই) প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বৃহৎ ভাষা মডেল বা লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের (এলএলএম) ব্যবহার বেড়েছে। এছাড়া বিষয়ভিত্তিক বিশেষ এলএলএম টুলও দেশে দেশে স্বাস্থ্যসেবা, ব্যবসা, প্রকৌশল, শিক্ষা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, সামরিক বাহিনীসহ প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে এমনকি সরকারি বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেয়ায় ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। দাপ্তরিক বিবিধ কার্যক্রমে এলএলএমের সুবিধা নেয়ার যে চল সর্বত্র শুরু হয়েছে, তার সঙ্গে তাল মেলাতে পৃথিবীর অনেক দেশের আইন ও বিচার বিভাগও এসব প্রযুক্তি কাজের সুবিধার জন্য আত্মীকরণ করছে। বিশ্বজুড়ে আইনজীবী ও স্ব-প্রতিনিধিত্বকারী মামলাকারী (যারা নিজেদের মামলা আইনজীবীর সহায়তা ছাড়া নিজেরাই আদালতের সামনে উপস্থাপন করেন) ছাড়াও বিচারক ও আদালতের কর্মীরা প্রশাসনিক ও বিচারিক নানা কার্যক্রমে এ রকম বিভিন্ন এলএলএম সিস্টেম প্রয়োগ করে নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক কার্য সম্পাদন করছেন।
চীন, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনাসহ বেশকিছু দেশের আইন ও বিচার ব্যবস্থায় মামলার জট কমাতে এবং মামলাকারীদের ন্যায়বিচার প্রাপ্তির অভিজ্ঞতা সহজ ও উন্নত করতে চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়ায় কীভাবে এলএলএম ও অন্যান্য এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিপরীতে যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জ্যামাইকা, পাকিস্তান, ইতালি, স্পেন, ভারতের কিছু অঙ্গরাজ্যসহ অপরাপর কিছু দেশ মূল বিচারিক সিদ্ধান্ত নেয়া বা রায় দেয়া ছাড়া শুধু প্রশাসনিক বা প্রস্তুতিমূলক কাজ অর্থাৎ পূর্বনজির বা তথ্য অনুসন্ধান, বৃহৎ নথি সংক্ষিপ্তকরণ, আইনি শব্দের অর্থ খোঁজা, অনুবাদ, রায়ের পাঠযোগ্যতা বাড়ানো ইত্যাদি নিত্যনৈমিত্তিক কাজ সম্পাদনের জন্য একটি সহায়ক সরঞ্জাম হিসেবে এলএলএম প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে বলে অবস্থান নিয়েছে। যদিও এসব দেশের বিচারকরা আদালতে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে এখন এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন না, বা কম্পিউটার সরাসরি নির্ধারণ করে দিচ্ছে না যে কোন মামলায় কে জিতবে বা কে হারবে। তবুও আদালতে বিচারের জন্য প্রস্তুতিমূলক, রুটিন বা গৌণ কার্যক্রমে এলএলএম প্রযুক্তির এ রকম ‘নির্দোষ’ ব্যবহার বিচারকদের বিচারিক মনস্তত্ত্বকে প্রভাবিত করার বিপুল সম্ভাবনা রাখে। এর ফলে পরবর্তী সময়ে তাদের নেয়া মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
এজন্য আদালতে বিচার করার প্রস্তুতিমূলক কাজে এসব বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ব্যবহার করার প্রাতিষ্ঠানিক অনুমতির ফলে বিচারকরা তা পুনঃপুনঃ প্রয়োগ করলে সেটি নানা মানসিক পক্ষপাত তৈরি করতে পারে। যেমন হিউরিস্টিক, অটোমেশন পক্ষপাত (অটোমেশন বায়াস), জ্ঞানীয় অফলোডিং (কগনিটিভ অফলোডিং), অ্যাংকরিং, ফ্রেমিং প্রভাব ইত্যাদির মতো বিভিন্ন মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের কারণে এলএলএম উদ্ভূত আউটপুট চূড়ান্ত রায়ে প্রভাব বিস্তার করার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
হিউরিস্টিক হলো একটি মানসিক সংক্ষিপ্তকরণ পদ্ধতি, যা দ্রুত সমস্যা সমাধান করতে বা সিদ্ধান্ত নিতে ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে অটোমেশন পক্ষপাত হলো স্বয়ংক্রিয় সিস্টেম, সিদ্ধান্তসহায়ক টুল বা এআইয়ের সুপারিশের ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করার একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা; এমনকি যখন সেগুলো ভুল হয় বা অন্যান্য প্রমাণের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তখনো ব্যবহারকারী এ পক্ষপাতের কারণে তা সঠিক বলে মনে করেন। আবার জ্ঞানীয় বা কগনিটিভ অফলোডিং হলো কোনো কাজের জন্য প্রয়োজনীয় মানসিক প্রচেষ্টা কমাতে বাহ্যিক সরঞ্জাম ব্যবহার করার মানসিক প্রবণতা বা অভ্যাস। অন্যদিকে অ্যাংকরিং হলো একটি জ্ঞানীয় বা মানসিক পক্ষপাত যেখানে একজন ব্যক্তি সিদ্ধান্ত নেয়ার সময় প্রাথমিক কোনো তথ্যের (অ্যাংকর) ওপর অতিরিক্ত নির্ভর করেন। আর ফ্রেমিং ইফেক্ট হলো ভিন্ন এক ধরনের জ্ঞানীয় পক্ষপাত, যেখানে তথ্য কীভাবে উপস্থাপন করা হয় (ফ্রেম করা হয়) তার ওপর ভিত্তি করে মানুষের সিদ্ধান্ত বদলে যায়।
বিচারিক কাজে মানুষের নানা সীমাবদ্ধতা, কাজের অতিরিক্ত চাপ, ক্লান্তি এবং কিছু ক্ষেত্রে সীমিত সম্পদ দিয়ে সময়মতো সিদ্ধান্ত দেয়ার প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশনার কারণে এমনকি বিচারকরা প্রস্তুতিমূলক কাজে এলএলএম ব্যবহার করলেও উল্লিখিত মনস্তাত্ত্বিক সমস্যাগুলো দেখা দিতে পারে। যার ফলে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত না নেয়া হলেও প্রাথমিক গবেষণা, তথ্য বা নজির অন্বেষণ কিংবা শব্দের অর্থ খোঁজা, অনুবাদ, সংক্ষিপ্তকরণ প্রভৃতি প্রস্তুতিমূলক কাজে ব্যবহারের ফলে এআই উদ্ভূত আউটপুট ব্যবহারকারী বিচারকের মানসে প্রভাব বিস্তার এবং এর ফলে মূল রায় প্রভাবিত করার ব্যাপক সম্ভাবনা তৈরি করে। ফলে এ সমস্যা শেষ পর্যন্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, রায়ে বিচারকদের যৌক্তিক ও উপযুক্ত কারণ দর্শানোর আইনি দায়, সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা ও সততা, আইনের শাসন, সমতার নীতি ইত্যাদি ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতিগুলোকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে।
নিরপেক্ষ ও যেকোনো ধরনের প্রভাবমুক্ত বিচার নিশ্চিত করার জন্য বিচারকদের এ জ্ঞানীয় এবং মানসিক দিকগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাত্ত্বিকভাবে হলেও মানব বিচারকদের বিচারিক সিদ্ধান্ত নেয়ায় যেকোনো রকমের পক্ষপাতিত্ব পরিহার ও নিয়ন্ত্রণের প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। পাশাপাশি তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সবচেয়ে নিরপেক্ষ ব্যক্তিদের অন্যতম হিসেবেও গণ্য করা হয়। বিচারকরা সাধারণত মামলার নথি পড়ে পক্ষদ্বয়ের মধ্যে বিদ্যমান বিরোধের বিষয়গুলো চিহ্নিত করেন; উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও যুক্তি বিশ্লেষণ করে এবং প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়ের সংশ্লেষে রায় প্রদানের কারণ উৎপাদন এবং প্রদর্শনের জন্য ব্যক্তিগতভাবে মানসিক, জ্ঞানীয় ও বুদ্ধিবৃত্তিক কাজে জড়িত থাকেন। সেখানে কোনো জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তিসমৃদ্ধ এলএলএম টুল যদি বিচারিক সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে প্রস্তুতিমূলক কাজে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সে যন্ত্র দ্বারা উপস্থাপিত একটি প্রাথমিক সুপারিশ, সংক্ষিপ্তসার বা পূর্বনজিরের তালিকা বিচারকদের বিচারিক কাজে জ্ঞানীয় সম্পৃক্ততার সূচনা বিন্দু হিসেবে কাজ করার প্রবল সম্ভাবনা রাখে।
অন্যদিকে যখন একজন বিচারক আইনি পরিভাষার অর্থ, দীর্ঘ আইনি নথির সারসংক্ষেপ, নজির শনাক্তকরণ ইত্যাদির মতো কাজে কোনো এলএলএমকে দিয়ে আউটসোর্স করেন, তখন তিনি এক অর্থে তার বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব সে প্রযুক্তির ওপর হস্তান্তর করে দেন। এ রকমভাবে প্রযুক্তির কাছে বিচারকের জ্ঞানীয় দায়িত্ব হস্তান্তর করার ফলে ওই বিচারকের দেয়া রায়ে উল্লিখিত আইনি যুক্তি এবং চূড়ান্ত রায় সম্পূর্ণরূপে বোঝা দুরূহ হতে পারে। তখন দেখা যাবে, বিচারক তার মূল জ্ঞানীয় কাজকে এড়িয়ে এলএলএম প্রযুক্তি কর্তৃক সৃষ্ট আউটপুট ঠিক আছে কিনা কেবল তাই যাচাই-বাছাই বা পরিবর্তন করার কাজে অধিক মনোনিবেশ করবেন। এ চর্চা বিচারকের প্রথাগত দায়িত্বের রূপান্তরও ঘটিয়ে দিতে পারে।
শুধু প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে এলএলএম সিস্টেম ব্যবহার করা এবং পরবর্তী সময়ে সেই সিস্টেমের প্রভাব ছাড়া বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়া মনস্তাত্ত্বিকভাবে বেশ বড় একটি চ্যালেঞ্জ। যদিও বিচারকদের সাধারণত নিরপেক্ষ, চিন্তাশীল এবং যেকোনো প্রভাব থেকে মুক্ত থাকার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়া হয়; তথাপি জ্ঞানীয় এবং আচরণগত বিজ্ঞান প্রমাণ করে যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণকারীই এ রকম বৈজ্ঞানিক যন্ত্র প্রতিনিয়ত ব্যবহার করার পদ্ধতিগত জ্ঞানীয় পক্ষপাত থেকে মুক্ত নন। কয়েক দশকের আচরণগত গবেষণা প্রমাণ করে যে পেশাগত দক্ষতা উল্লিখিত মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো, যেমন হিউরিস্টিক, অ্যাংকরিং, ফ্রেমিং বা অটোমেশন পক্ষপাতের প্রতি সংবেদনশীলতা দূর করে না। বিচারকরাও অন্যান্য বিশেষজ্ঞ পেশাজীবীর মতো বিভিন্ন সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেন। তাই এলএলএমের মতো আধুনিক প্রযুক্তির অন্তর্নিহিত প্ররোচনামূলক বৈশিষ্ট্য, যা এর তথ্যগত বা আইনি নির্ভুলতা নির্বিশেষে মানুষের মতো যুক্তি ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আউটপুট তৈরি করে তা সহজেই যেকোনো মানুষের সিদ্ধান্ত নেয়ার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে।
সুতরাং এটি স্বাধীন যুক্তিবোধের মৌলিক ও অপরিবর্তনীয় বিচারিক কর্তব্যের সঙ্গে একটি গভীর দ্বন্দ্ব তৈরি করে। তার অর্থ হলো, এর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং এ জ্ঞানীয় দুর্বলতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান, প্রশিক্ষণ ও উপলব্ধি ছাড়া, আদালতে এমনকি এলএলএম প্রযুক্তিকে একটি গৌণ বা সহায়তাকারী সরঞ্জাম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও তা অনিচ্ছাকৃতভাবে বিচারকের সেই অপরিহার্য বিচার-বিবেচনামূলক প্রক্রিয়াকেই দুর্বল করে সমগ্র বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে দিতে পারে এবং তার ফলে আদালতের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যেতে পারে।
ক্রমবর্ধমান প্রযুক্তিচালিত বিচার ব্যবস্থা বিচারকদের উল্লিখিত জ্ঞানীয় সীমাবদ্ধতাগুলো কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে বাধা সৃষ্টি করে কিনা তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা এখন অত্যন্ত জরুরি। কারণ বিচার ও মানুষের আইনগত অধিকারের ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব রয়েছে। এ ধরনের পক্ষপাত নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা আদালতের কাছ থেকে ন্যায়বিচার পাওয়ার বাদী-বিবাদীদের অধিকারকে সরাসরি বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
রাইসুল সৌরভ: আয়ারল্যান্ডের গলওয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিচারিক সিদ্ধান্তে এআইয়ের ব্যবহার বিষয়ক ডক্টরাল গবেষক; সহযোগী অধ্যাপক (শিক্ষা ছুটিতে), আইন বিভাগ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি (ডিআইইউ); আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট; আইন ও বিচার বিশ্লেষক