আরেকটি বাস্তবতা হলো, কোনো কোনো ভুক্তভোগী রোগী সপ্তাহের পর সপ্তাহ নিজের দেশের কাঙ্ক্ষিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অ্যাপয়েন্টমেন্টের অপেক্ষায় থাকেন। কিন্তু নানা কারণে সময়মতো তাদের কাছে পৌঁছতে পারেন না। বেশির ভাগ রোগী কেবল অন্য দেশে উন্নত প্রযুক্তি থাকার কারণে ভ্রমণ করেননি। তাদের সিদ্ধান্তগুলো মূলত স্বাস্থ্যসেবা যাত্রার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তাদের অভিজ্ঞতার দ্বারা আকৃতি পেয়েছিল। তারা যা খুঁজছিলেন তা কেবল একটি সফল অপারেশন বা একটি উন্নত মেশিন ছিল না। তারা হাসপাতালে প্রবেশের মুহূর্ত থেকে বাড়ি ফেরার দিন পর্যন্ত আস্থার সন্ধান করছিলেন। কারণ তারা এমন কিছু পাওয়ার আশা করেন, যা তারা দেশে অনুপস্থিত বলে ভয় পান—আস্থা।
প্রথম পর্বে আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার সংকট কেবল হাসপাতালের সংখ্যা, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি বা চিকিৎসকদের দক্ষতার ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর কেন্দ্রে রয়েছে এমন এক সংকট, যা অনেক কম দৃশ্যমান, কিন্তু অনেক বেশি গভীর—পারস্পরিক সম্মান, সহৃদয়তা ও আস্থার সংকট। প্রশ্ন থেকেই যায়, এসব কি কেবল ব্যক্তিগত মতামত, নাকি একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি? এক দশকেরও বেশি আগে এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই আমি একটি গবেষণা পরিচালনা করি। উদ্দেশ্য ছিল, কেন এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী হচ্ছেন, সে কারণগুলো বোঝা। আজ এত বছর পর ফিরে তাকিয়ে বিস্মিত হই—গবেষণার অনেক পর্যবেক্ষণ এখনো কতটা প্রাসঙ্গিক।
বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার সিদ্ধান্ত শুধু বিদেশী হাসপাতালের প্রচার কার্যক্রমের ফল নয়। রোগীর স্বজনদের অভিজ্ঞতা, ছড়িয়ে পড়া সুপারিশ এবং সামগ্রিক সেবার অভিজ্ঞতাও এ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রোগীদের মধ্যে আস্থার যাত্রা শুরু হয় হাসপাতালের প্রথম সংস্পর্শ থেকেই—হোক তা রিসেপশন বা জরুরি বিভাগ। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীরা জানিয়েছেন, হাসপাতালে পৌঁছে তারা উদ্বিগ্ন, বিভ্রান্ত ও অনিশ্চয়তায় ভুগতেন। ঠিক সে মুহূর্তেই হাসপাতালের সঙ্গে তাদের প্রথম অভিজ্ঞতা অনেক সময় নির্ধারণ করে দিত, তাদের মনে আস্থা তৈরি হবে, নাকি সে আস্থায় প্রথম ফাটল ধরবে। প্রায় তিন-চতুর্থাংশ উত্তরদাতার মতে, রোগী গ্রহণ ও যথাযথ দিকনির্দেশনার ব্যবস্থা সন্তোষজনক ছিল না। আবার বিপুলসংখ্যক মানুষ মনে করেছে (প্রতি ১০ জনে আটজন) জরুরি বিভাগ তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত ও কার্যকর সেবা দিতে পারেনি! গুরুতর অসুস্থ প্রিয়জনকে নিয়ে হাসপাতালে আসা একটি পরিবারের জন্য প্রথম কয়েক মিনিটই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ কয়েক মিনিটেই অনেক সময় ঠিক হয়ে যায়। তারা আশার আলো দেখতে শুরু করবে, নাকি নীরবে আস্থা হারিয়ে ফেলবে। অস্ত্রোপচার-পরবর্তী সেবাও ছিল সমান গুরুত্বপূর্ণ। দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি উত্তরদাতা অস্ত্রোপচারের পর পরিচর্যা ও ফলোআপ সেবায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তাদের কাছে চিকিৎসা অপারেশন থিয়েটারে শেষ হয়ে যায় না। তারা চেয়েছেন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, আশ্বস্ত করা, ধারাবাহিক যোগাযোগ ও অবিচ্ছিন্ন সেবা। সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পর্যবেক্ষণটি শুধু প্রযুক্তি বা দক্ষতা নিয়ে ছিল না।
অনেক উত্তরদাতা খোলাখুলিভাবে স্বীকার করেছেন বাংলাদেশের চিকিৎসকদের জ্ঞান, দক্ষতা ও পরিশ্রম নিয়ে তাদের কোনো প্রশ্ন নেই। কিন্তু তারা আরো কিছু চেয়েছেন। তারা এমন চিকিৎসক চেয়েছেন, যিনি রোগীর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনবেন, সহজ ভাষায় রোগ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করবেন, ধৈর্যসহকারে প্রশ্নের উত্তর দেবেন এবং চিকিৎসার সিদ্ধান্ত গ্রহণে রোগীকেও অংশীদার করবেন। চিকিৎসা-জ্ঞান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সহমর্মিতা, আন্তরিক যোগাযোগ এবং সম্মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
রোগ নির্ণয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থার প্রশ্নও গবেষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উত্তরদাতা রেডিওলজিক্যাল ও ইমেজিং পরীক্ষার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, আর দুই-পঞ্চমাংশেরও বেশি ল্যাবরেটরি রিপোর্টের নির্ভুলতা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। আরো তাৎপর্যপূর্ণ হলো, প্রায় ১০ জনে নয়জন রোগী জানিয়েছেন, বিদেশে পৌঁছে তাদের আগের অনেক পরীক্ষাই পুনরায় করাতে হয়েছে। ফলে শুধু অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ই নয়, অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি, চিকিৎসা বিলম্ব ও মানসিক চাপও বেড়েছে। এ সন্দেহ পুরোপুরি যৌক্তিক ছিল কিনা, সেটি ভিন্ন প্রশ্ন। কিন্তু মানুষ যখন মনে করে দেশের পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করা যায় না, তখন সে ধারণাটিই জনআস্থাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য যথেষ্ট।
রোগীর সবচেয়ে কঠিন সময়ে স্বাস্থ্যসেবার সামগ্রিক সহজপ্রাপ্যতাও ছিল একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। প্রায় ৭০ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন, বিশেষ করে জরুরি পরিস্থিতিতে প্রয়োজনের সময় তারা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা সহজে পান না। অনেকেই জানিয়েছেন, এমন সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের অভাব রয়েছে, যেখানে একই ছাদের নিচে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ, রোগ নির্ণয়, হাসপাতালে ভর্তি, অস্ত্রোপচার এবং পরবর্তী ফলোআপ সেবা পাওয়া যায়—বিশেষ করে অফিস সময়ের বাইরে, সরকারি ছুটির দিন কিংবা উৎসবের সময়। ফলে গুরুতর অসুস্থতার মধ্যেও অনেক রোগীকে এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ছুটে বেড়াতে হয়েছে; হাতে করে বহন করতে হয়েছে একগাদা চিকিৎসা-সংক্রান্ত নথিপত্র।
বিদেশে চিকিৎসার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে একটি বিষয় বারবার উঠে এসেছে। অনেকেরই মনে হয়েছে, হাসপাতালের রিসেপশন থেকেই তাদের শুধু একজন রোগী হিসেবে নয়, বরং নিজের চিকিৎসা প্রক্রিয়ার একজন সচেতন অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। চিকিৎসকের পরিপাটি কর্মপরিবেশ ও সুশৃঙ্খল চেম্বারও তাদের দৃষ্টি এড়ায়নি। তবে এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি উত্তরদাতা স্বীকার করেছেন চিকিৎসা পদ্ধতিতে মৌলিক কোনো পার্থক্য ছিল না; একই ধরনের চিকিৎসা বাংলাদেশেও পাওয়া সম্ভব ছিল। পার্থক্যটি ছিল পরিবেশে, সেবা ব্যবস্থাপনায়, কর্মীদের পেশাদারত্বে এবং সর্বোপরি রোগীদের মধ্যে যে আস্থা তৈরি করতে পেরেছিল তাতে।
অবশ্য বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার অন্যান্য অভিজ্ঞতা মোটেই সহজ ও স্বস্তিদায়ক ছিল না। ভিসা সংগ্রহ, বিদেশে অবস্থান ও যাতায়াত সব মিলিয়ে অসুস্থ মানুষের জন্য পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। প্রায় অর্ধেক উত্তরদাতা এ অভিজ্ঞতাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে দুরূহ বলে বর্ণনা করেছেন। প্রায় ৮০ শতাংশ উত্তরদাতার মতে, বিদেশে চিকিৎসা নেয়া ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। চার-পঞ্চমাংশেরও বেশি এটিকে শারীরিকভাবে ক্লান্তিকর ও মানসিকভাবে চাপপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন, বিশেষ করে যারা শিশুদের নিয়ে ভ্রমণ করেছিলেন।
ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাও অনেক সময় চিকিৎসকদের সঙ্গে কার্যকর যোগাযোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বিশেষ করে জটিল চিকিৎসাবিষয়ক আলোচনা করতে গিয়ে। ভাষা চিকিৎসার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রোগী যদি নিজের কষ্ট, উপসর্গ ও উদ্বেগ স্পষ্টভাবে প্রকাশ করতে না পারেন, কিংবা চিকিৎসক যদি তা পুরোপুরি বুঝতে না পারেন, তবে চিকিৎসার গতিপথও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রভাবিত হতে পারে। তার পরও প্রায় তিন-চতুর্থাংশ উত্তরদাতা মনে করেছেন, এ কষ্ট সার্থক ছিল। কারণ তাদের অভিজ্ঞতায় সেখানে তারা তুলনামূলক আরো সংগঠিত, অধিক রোগীকেন্দ্রিক, বাংলাদেশের তুলনায় অপেক্ষাকৃত স্বস্তিদায়ক এবং সর্বোপরি আস্থাভিত্তিক একটি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা পেয়েছিলেন।
গবেষণায় আরো দেখা গেছে, মানুষ শুধু প্রচলিত নয়, অনেক বিরল ও জটিল রোগের চিকিৎসার জন্যও বিদেশে গেছেন। সময় বদলেছে, স্বাস্থ্যসেবায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়েছে। তবু আজকের বাস্তবতার সঙ্গে গবেষণার সময়কার চিত্র মিলিয়ে দেখলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অনেক বিশেষজ্ঞের মত একই—কিছু বিশেষায়িত ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আরো সক্ষমতা গড়ে তোলা জরুরি। এর মধ্যে রয়েছে শিশুদের জটিল হৃদরোগ ও হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার, মস্তিষ্কের জটিল অস্ত্রোপচার (নিউরোসার্জারি), লিভার প্রতিস্থাপন, রেটিনার জটিল রোগের চিকিৎসা, স্টেম সেলভিত্তিক চিকিৎসা এবং আরো কিছু উচ্চমাত্রার বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা। অর্থাৎ বিদেশমুখী হওয়ার সিদ্ধান্ত অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট রোগ বা বিশেষায়িত চিকিৎসার প্রয়োজন থেকেই আসে। বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবা দেশের মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সহযোগিতা আরো জোরদার করতে হবে, আধুনিক প্রযুক্তি ও সর্বশেষ চিকিৎসাজ্ঞান দেশে আনতে হবে এবং একই সঙ্গে আমাদের মেধাবী চিকিৎসকদের সে দক্ষতা অর্জন ও বিকাশের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এ পথেই দেশীয় সক্ষমতা গড়ে উঠবে এবং বিদেশনির্ভরতা ধীরে ধীরে কমবে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে মানবসম্পদ কাঠামো নতুন করে পর্যালোচনা করা জরুরি। শুধু অবকাঠামো বা যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগ করলেই হবে না; সমান গুরুত্ব দিতে হবে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা, তাদের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মীদের সুষম বণ্টনের ওপর। একটি শক্তিশালী স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত ইট-পাথর বা প্রযুক্তির ওপর নয়, মানুষের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। বিদেশে চিকিৎসা নিতে গেলেই যে সবাই সুস্থ হয়ে ফেরেন, এমন নয়। তা সত্ত্বেও একটি বড় অংশের রোগী ও তাদের স্বজনদের সন্তুষ্টি কেবল চিকিৎসার ফলাফলের ওপর নির্ভর করে না। বরং বিদেশী স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সম্পর্কে তাদের ইতিবাচক মনোভাব এবং সামগ্রিক চিকিৎসা অভিজ্ঞতাও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
অধিকাংশ রোগী বিদেশে কোথায় চিকিৎসা নেবেন, সে সিদ্ধান্ত বিজ্ঞাপন বা সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে নেননি। তারা ভরসা করেছেন মানুষের অভিজ্ঞতার ওপর। বন্ধুস্বজন ছিলেন তথ্যের সবচেয়ে বড় উৎস। এরপর ছিলেন পূর্ববর্তী রোগীরা, সমাজের পরিচিতজন এবং তুলনামূলকভাবে কম সংখ্যায় স্থানীয় চিকিৎসক বা মেডিকেল এজেন্টদের পরামর্শ। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু মানুষকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে উৎসাহিত করে, এমন অনেক মৌলিক কারণ এখনো প্রায় একই রয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে যাওয়া মানুষের সংখ্যা কেবল আরো হাসপাতাল নির্মাণ বা আরো আধুনিক যন্ত্রপাতি কেনার মাধ্যমে কমানো যাবে না। সেটি সম্ভব হবে তখনই, যখন আমরা পুনর্গঠন করতে পারব মানুষের হারিয়ে যাওয়া আস্থা—সহমর্মিতাপূর্ণ সেবা, নির্ভরযোগ্য রোগনির্ণয়, কার্যকর যোগাযোগ, সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং সর্বোপরি নৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে।
ডা. রুবাইউল মোরশেদ: স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, লেখক এবং উদারতা ও নৈতিক নেতৃত্ব নিয়ে গবেষক
[বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার পুনরাবিষ্কার সিরিজের দ্বিতীয় পর্ব]