কভিড-১৯

টিকা পাওয়ার পরও পরতে হবে মাস্ক

নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর প্রধান একটি শর্ত হলো, সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। কারণ মাস্ক একদিকে যেমন নিজের সুরক্ষা দেয়, তেমনি একই সঙ্গে অন্যদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন পরতে হবে মাস্ক? এর উত্তরে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, করোনা টিকা না পাওয়া পর্যন্ত অবশ্যই এবং টিকা প্রাপ্তির পরও পরতে হবে মাস্ক।

নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কমানোর প্রধান একটি শর্ত হলো, সবাইকে মাস্ক পরতে হবে। কারণ মাস্ক একদিকে যেমন নিজের সুরক্ষা দেয়, তেমনি একই সঙ্গে অন্যদের সুরক্ষাও নিশ্চিত করে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কতদিন পরতে হবে মাস্ক? এর উত্তরে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, করোনা টিকা না পাওয়া পর্যন্ত অবশ্যই এবং টিকা প্রাপ্তির পরও পরতে হবে মাস্ক।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) ডিরেক্টর রবার্ট রেডফিল্ড জানান, ভ্যাকসিনের চেয়েও সুরক্ষা বেশি দেয় ফেস মাস্ক। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণ রয়েছে। ফেস মাস্কই আমাদের নভেল করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে সেরা রক্ষণ। দাবি নিয়ে বলছি, মাস্ক আমাকে আপনাকে অনেক বেশি সুরক্ষা দেবে। ভ্যাকসিনের চেয়েও বেশি।’

হাত থেকে মুখে সংক্রমণ ঠেকাতেও মাস্ক ব্যবহার জরুরি। ২০১৬ সালে নিউ সাউথ ওয়েলসের একটি সমীক্ষায় বলা হয়, মানুষ প্রতি ঘণ্টায় গড়ে ২৩ বার হাত দিয়ে মুখ স্পর্শ করে। ১৯১৯ সালে স্প্যানিশ ফ্লু মহামারীর আগ পর্যন্ত এই মাস্ক আমজনতার হাতে এসে পৌঁছেনি। ওই মহামারীতে পাঁচ কোটির মতো মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। আর এই করোনা মহামারীর সময় মাস্ক পাওয়া গেলেও আমরা সেটা পরছি না কিংবা পরলেও সঠিকভাবে সেটা ব্যবহার করছি না। পাবলিক হেলথ ইংল্যান্ডের ড. জেক ডানিং বলেন, ‘মাস্ক থেকে উপকার পেতে হলে সেটা পরতে হবে সঠিকভাবে এবং বদলাতে হবে নিয়মিত।’

বাংলাদেশে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক: গত জুলাই থেকেই বাংলাদেশে মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করেছে সরকার। এরপর চালু করা হয় ‘নো মাস্ক নো সার্ভিস’ এবং ‘নো মাস্ক নো এন্ট্রি’ কর্মসূচি। সবার মাস্ক পরা নিশ্চিত করার জন্য এমনকি ভ্রাম্যমাণ আদালতও চালানো হচ্ছে। তার পরও বাংলাদেশের মানুষের মুখে মাস্ক পরার হার আশাব্যঞ্জক নয়।  

সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা গত মার্চ-আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন বিভাগীয় শহরে এক জরিপ পরিচালনা করে। গত ২৭ আগস্ট প্রকাশিত এই জরিপে দেখা গেছে, দেশের ৪৮ শতাংশ মানুষ মাস্ক পরে না। অথচ মাস্ক ব্যবহার করলে করোনার ঝুঁকি কমে, এমন মত এসেছে ৯২ দশমিক ৯০ শতাংশ।

এছাড়া গত ২৭ আগস্ট ব্র্যাক, লাইফবয় ও প্রথম আলোর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত আরেকটি অনলাইন জরিপ প্রকাশ করা হয়। গত ৩১ জুলাই থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত পরিচালিত জরিপে দেখা যায়, গরম ও অস্বস্তিতে মাস্ক পরে না ৬৭ শতাংশ মানুষ। সেখানেও মাস্ক ব্যবহার করলে করোনার ঝুঁকি কমে, এমন মত এসেছে ৯২ দশমিক ৯০ শতাংশ।

আর এই শীতে বাংলাদেশে নভেল করোনাভাইরাসের হানা বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা প্রবল। আর তাই সংক্রমণ মোকাবেলায় জনসাধারণের মাস্ক পরা বাধ্যতামূলক করতে কঠোর অবস্থানে বাংলাদেশ সরকার। মাস্ক না পরলে শাস্তি হিসেবে জরিমানার পাশাপাশি জেল দেয়ার কথাও ভাবছে সরকার।

৩০ নভেম্বর মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, সবার মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে এরই মধ্যে সংশ্লিষ্টদের ‘শক্ত অবস্থানে’ যাওয়ার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে এখনো অনেকে সতর্ক হয়নি, তবে মোটামুটি একটা বার্তা যাচ্ছে যে জরিমানা হয়ে যাবে। জরিমানা দিতে হবে ৫০০ টাকা।’ তার পরও মাস্ক না পরলে জেলে যেতে হবে বলে জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

করোনার টিকা না আসা পর্যন্ত মাস্কই ভরসা: বিশ্ব এরই মধ্যে করোনা ভ্যাকসিনেশন যুগে প্রবেশ করেছে। ৫ ডিসেম্বর বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে রাশিয়া তাদের উদ্ভাবিত স্পুটনিক ভি টিকা দেয়ার মাধ্যমে করোনার টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে। এরপর ৮ ডিসেম্বর থেকে ফাইজারের উদ্ভাবিত করোনার টিকা দেয়া শুরু হয়েছে যুক্তরাজ্যে। ৪ ডিসেম্বর ফাইজারের উদ্ভাবিত করোনা টিকার অনুমোদন দেয় আরব দেশ বাহরাইন। আর কানাডা ও সৌদি আরব ফাইজারের টিকার অনুমোদন দেয় ৯ ডিসেম্বর। এসব দেশেও দ্রুতই করোনা ভ্যাকসিনেশন শুরু হবে বলে জানা গেছে।  

বাংলাদেশেও আসছে করোনার টিকা বা ভ্যাকসিন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও অ্যাস্ট্রাজেনেকা নভেল করোনাভাইরাসের যে টিকা তৈরি করছে, তার উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত আছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট অব ইন্ডিয়া। আর অক্সফোর্ডের ওই টিকার তিন কোটি ডোজ কিনতে ৫ নভেম্বর সেরাম ইনস্টিটিউট ও বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করেছে বাংলাদেশ সরকার। পরে ১৩ ডিসেম্বর ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের সঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ক্রয় চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা করোনার টিকাবিষয়ক বৈশ্বিক উদ্যোগ ‘কোভ্যাক্স’ থেকেও ভর্তুকি দামে টিকা সংগ্রহ করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।  

এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয় যে কবে বাংলাদেশে আসছে করোনা ভ্যাকসিন, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ২০২১-এর প্রথম দিকেই আসছে করোনা টিকা। কাজেই ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত আমরা স্বাস্থ্য সচেতনতায় নিজেদের সুরক্ষিত রাখব এটাই মুখ্য। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা ও জনসমাগম এড়িয়ে চলা, কিছুক্ষণ পরপর সাবান পানিতে হাত ধোয়া এবং সর্বোপরি মাস্ক পরা—এই তিন কাজ করলে করোনা সংক্রমণ প্রায় ৮০-৯০ শতাংশ কমিয়ে আনা সম্ভব বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে মানুষের জীবন ও জীবিকা সুরক্ষার জন্য ভ্যাকসিন বা টিকা প্রদান অত্যন্ত জরুরি। তবে ভ্যাকসিন না আসা পর্যন্ত মাস্কই ভরসা, এর কোনো বিকল্প নেই।  

করোনা টিকা নেয়ার পরেও মাস্ক ব্যবহার জরুরি:  করোনা টিকা চলে আসার পর টিকা নিয়েই কি কভিড-১৯ পূর্ববর্তী জীবনে ফিরে যাওয়া যাবে? আগে যেমন মাস্ক ছাড়া যেখানে সেখানে যাওয়া যেত, সেসব কি করা যাবে? উত্তর হলো, না, একেবারেই না। এখন পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকরী হিসেবে যেসব প্রতিষেধক বা টিকার খবর এসেছে, সেগুলোই শরীরে করোনা প্রতিরোধ করতে সক্ষম। টিকা নেয়া ব্যক্তি যে নভেল করোনাভাইরাস বহন করবেন না, তা বলা হয়নি কোথাও। আবার আমার চারপাশে কে টিকা নিয়েছে কিংবা কে নেয়নি, তা জানাও সহজ নয়।

টিকা নেয়া একজন ব্যক্তি হয়তো অসুস্থ হয়ে পড়বেন না বা তার কোনো লক্ষণও চোখে পড়বে না, কিন্তু তিনি নিঃশব্দে নভেল করোনাভাইরাস ছড়িয়ে দিতে পারেন। মাস্ক না পরলে এবং শারীরিক দূরত্ব না মানলে তা যে বেশি মাত্রায় হবে, বলাই বাহুল্য। সেক্ষেত্রে টিকা না পাওয়া মানুষের জন্য হবে চরম বিপদ। আমেরিকার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোলজি বিশেষজ্ঞ মিশাল টাল বলছেন, ‘বহু মানুষের ধারণা, একবার টিকা নিলে আর মাস্ক পরার দরকার হবে না। কিন্তু তাদের জানা দরকার টিকা নেয়ার পরেও মাস্ক পরা চালিয়ে যেতে হবে।’

যিনি করোনা টিকা নিলেন, তার শরীরের রক্তে করোনা প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হবে। কিন্তু ওই ব্যক্তির নাকে যদি নভেল করোনাভাইরাস প্রবেশ করে, তবে সেটা নাকের মধ্যে ফের বংশবৃদ্ধি করবে এবং হাঁচির মাধ্যমে বা নিঃশ্বাসের সঙ্গে বাহিত হয়ে অন্যের শরীরে ছড়িয়ে যাবে, যদি তিনি মাস্ক না পরেন। করোনার টিকা সাধারণত মাংসপেশিতে দেয়া হয়। টিকা নেয়ার পর শরীরের রক্তে তৈরি অ্যান্টিবডিগুলোর কিছু অংশ রক্তের মাধ্যমে বাহিত হয়ে নাকের মিউকোসায় প্রবেশ করে সেখানে পাহারা দেবে। কিন্তু অ্যান্টিবডির কতখানি অংশ নাকে আসবে এবং কত দ্রুত আসবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। 

ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমিউনোলজি বিশেষজ্ঞ মারিয়ন পেপার বলছেন, ‘এটা একটা প্রতিযোগিতা। ভাইরাস আগে সংখ্যায় বাড়বে, না প্রতিষেধক আগে তাকে কাবু করতে পারবে, তার ওপরই সবটা নির্ভর করছে।’ এ কারণে অনেক চিকিৎসাবিজ্ঞানী মাংসপেশিতে ইনজেকশনের চেয়ে নাকে দেয়া যায় এমন স্প্রের ওপর বেশি ভরসা করতে চান। ভবিষ্যতে হয়তো করোনার জন্যও এমন ন্যাসাল স্প্রে দেয়া প্রতিষেধকও চলে আসতে পারে। তবে মোদ্দাকথা এই যে করোনা টিকা নেয়ার পরেও মাস্ক খুলে ফেলা যাবে না, অন্তত গোটা বিশ্বের প্রত্যেকে যতদিন না টিকা পাচ্ছে।  

কাজেই একথা বলা যায়, টিকা না পাওয়া পর্যন্ত কিংবা টিকা দেয়ার পরেও (যতদিন না সবাই টিকা পায়) করোনার ঝুঁকি থেকে বাঁচতে হলে বাইরে চলাফেরার সময় সবার মুখে মাস্ক থাকতেই হবে। তা না হলে তেমন লাভ হবে না। আজকাল যে বাংলাদেশে করোনার সংক্রমণ আবার বাড়ছে, তার একটি কারণ হতে পারে মাস্কের ব্যাপারে গণসচেতনতার অভাব। আসুন আমরা সবাই বাইরে চলাফেরায় সবসময় মাস্ক ব্যবহার করি এবং অন্যদের মাস্ক পরতে উৎসাহিত করি। একসঙ্গে সবাই মাস্ককালচারে অভ্যস্ত না হলে কেউ রক্ষা পাব না।

 

মু. মাহবুবুর রহমান: ফার্মাসিস্ট, নিউজিল্যান্ডের মেসি ইউনিভার্সিটির পিএইচডি গবেষক

আরও