এডিস মশা দমন

উলবাকিয়া ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রভাব আতঙ্কিতভাবে বেড়েই চলেছে। সমীক্ষায় দেখা যায়, ডেঙ্গুতে ২০২১ সালে সিএফআর অর্থাৎ মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং বর্তমানে ২০২৩ সালে তা শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ১৮, শূন্য

কভিড-১৯-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রভাব আতঙ্কিতভাবে বেড়েই চলেছে। সমীক্ষায় দেখা যায়, ডেঙ্গুতে ২০২১ সালে সিএফআর অর্থাৎ মৃত্যুহার ছিল শূন্য দশমিক ৩৭ শতাংশ, ২০২২ সালে তা বেড়ে হয় শূন্য দশমিক ৪৫ শতাংশ এবং বর্তমানে ২০২৩ সালে তা শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। অথচ পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার ২০২১, ২০২২ ও ২০২৩ সালে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ১৮, শূন্য দশমিক ১৩ ও শূন্য দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, যা স্পষ্টত ইঙ্গিত দিচ্ছে ভারতে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা অনেকটা প্রশমন করা গেছে। কিন্তু আমাদের এখানে তা ভয়াল রূপ ধারণ করেছে। এমনটি কেন? মোটামুটি একই জলবায়ু ও অ্যানথ্রোপজেনিক কার্যক্রমের আওতাভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও কেন এত বৈপরীত্য। আবার চীনের দিকে নজর দিলে দেখা যাবে গত জুন ২০২৩ পর্যন্ত আক্রান্ত ছিল ১০৪ জন এবং কোনো মৃত্যু ছিল না। একই অবস্থা অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, জাকার্তাসহ অন্যান্য রাষ্ট্রে। এর মূল কারণ কী? আমাদের দেশে কভিড-১৯-পরবর্তী সময় ক্রমান্বয়ে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা চরমে পৌঁছাচ্ছে। 

বিশ্বের ডেঙ্গুপ্রবণ অন্য রাষ্ট্রগুলো গতানুগতিক নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির বাইরে এসে বাহকের গতিবিধি ও প্রচলিত পদ্ধতির অকার্যকর পরিস্থিতির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও অন্যান্য প্রাণীর ক্ষতি বাদ দিয়ে যেসব টেকসই পদ্ধতি তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রয়োজন সেসব পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করেছে। আর সেই পদ্ধতির মধ্যেই রয়েছে যুক্তিযুক্তভাবে জৈবিক পদ্ধতির ব্যবহার। অর্থাৎ বায়োটিক উপাদান ব্যবহার করে বাহক মশাকে নিয়ন্ত্রণ বা এর ভাইরাস ছড়ানোর প্রবণতাকে রোধ করা। এ কাজে অত্যন্ত সফল হয়েছে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম। জৈবিক উপাদানের মধ্যে রয়েছে প্রিডেটরস, প্যারাসাইটস বা প্যাথোজেন। এ প্যারাসাইটই হলো উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া। যে ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় এন্ডোসিমবায়োন্ট। অর্থাৎ এরা মশার শরীরেই বসবাস করবে এবং মশার শারীরবৃত্তীয় কাজে প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্নভাবে ডেঙ্গু ভাইরাস পরিবহন ও রেপ্লিকেশনে বাধা দান করে উল্লেখযোগ্যভাবে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করবে।

এখন প্রশ্ন হলো কীভাবে এ ব্যাকটেরিয়া মশার শরীরে প্রবেশ করবে বা মশার শরীরে কতদিন এর অস্তিত্ব থাকবে অথবা আমরা কীভাবে এর সুফল পেতে পারি। এ ব্যাকটেরিয়াটি হলো গ্রাম নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া এবং প্রাকৃতিকভাবে ৪০-৬০ শতাংশ পোকামাকড়ের শরীরেই এর বসবাস। এরা পোষকের শরীরে সমজীবিতার মাধ্যমে বসবাস করে। এডিস মশার শরীরে এরা প্রাকৃতিকভাবে অনুপস্থিত। তবে এডিস মশার শরীরে অন্যান্য মশা বা পোকামাকড়ের মতো অনুকূল পরিবেশ আছে। তাই কোনোভাবে যদি এডিস মশার শরীরে এদের অনুপ্রবেশ নিশ্চিত করা যায় তবে অবশ্যই তারা সফলভাবে তাদের উপস্থিতিতে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ইয়েলো ফিভার প্রভৃতি অণুজীবের রেপ্লিকেশন মশক শরীরে বাধাগ্রস্ত করবে এবং রোগের বিস্তার প্রতিরোধ করবে। এডিস মশার শরীরে অনুপ্রবেশের প্রথম ধাপ হলো এডিস মশার ডিমকে এ ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত করার পর ওই ডিম থেকে যে মশা উৎপন্ন হবে তার শরীরে এ ব্যাকটেরিয়া সমজীবিতার মাধ্যমে বেড়ে উঠবে এবং বংশ বৃদ্ধি করবে। শুধু তাই নয়, ওই মশার শরীরে ভার্টিক্যাল ট্রান্সমিশনের মাধ্যমে পরবর্তী বংশধরের মধ্যে সফল ট্রান্সমিশন হবে। 

২০২০ সালে এক গবেষণায় দেখা যায়, অস্ট্রেলিয়ায় দীর্ঘ আট বছর এ ব্যাকটেরিয়া সফলভাবে অর্থাৎ ১০০ শতাংশ অবিকৃত অবস্থায় এক জেনারেশন থেকে অন্য জেনারেশনে পরিবাহিত হয়ে ৯৬ শতাংশ ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে। একইভাবে ইন্দোনেশিয়ায় দুই বছর এবং মালয়েশিয়ায় তিন বছর সফলভাবে পরিবাহিত হয়ে যথাক্রমে ৭৭ ও ৮০ শতাংশ ডেঙ্গু রোধে সক্ষম হয়েছে। আমাদের দেশে এর সফল ব্যবহার করতে হলে প্রথমেই যে চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তা হলো উন্নত গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা এবং বিজ্ঞ এন্টোমলজিস্টের যোগদান। অন্য দেশ থেকে আমদানি না করে নিজেদের পরিবেশের সঙ্গে অভিযোজিত ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করতে পারলে ১০০ শতাংশ সফলতা নিশ্চিত। এ মর্মে এখনই প্রয়োজন উন্নতমানের গবেষণাগার ও অভিজ্ঞ গবেষক। এক্ষেত্রে জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম) হতে পারে এর সূতিকাগার। এবার আসি এ ব্যাকটেরিয়া কীভাবে ডেঙ্গু ভাইরাসকে প্রতিহত করে সেই ব্যাপারে আলোচনায়।

সংক্রমিত পুরুষ মশা ও সংক্রমিত-অসংক্রমিত স্ত্রী মশার মিলনের ফলে যে মশা তৈরি হবে তার শরীরে মেটারন্যাল প্রভাব যেমন মেল কিলিং, ফেমিনাইজেশন, সাইটোপ্লাজমিক ইনকম্পাটেবিলিটি (সিআই) যা তাৎপর্যপূর্ণভাবে ভাইরাসের রেপ্লিকেশন বাধাগ্রস্ত করে। ফলে ভাইরাসের কার্যক্ষমতা বিলুপ্ত হয় এবং রোগ ছড়ানোর প্রবণতা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।

আমাদের দেশে দীর্ঘমেয়াদি টেকসই এবং পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি হিসেবে এ পদ্ধতির ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। তাই বর্তমানের ভয়াবহতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাঝে উলবাকিয়া ইন্টিগ্রেশন পদ্ধতির বাস্তবায়ন অত্যন্ত সময় উপযোগী পদক্ষেপ হবে বলে আমার বিশ্বাস।

উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া এন্ডোসিমবায়োন্ট হওয়ার কারণে প্রকৃতিতে পোষক শরীর ছাড়া টিকে থাকতে পারে না। আবার মশার স্যালাইভাতে না থাকার কারণে মানুষের শরীরেও বাহিত হয়ে রোগ সৃষ্টি করতে পারে না। ইমিউনোলজিক্যাল গবেষণা থেকে প্রমাণিত যে উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া দ্বারা সংক্রমিত মশা নিয়ে কাজ করা ব্যক্তির শরীরে মশার বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডি পাওয়া গেছে কিন্তু ব্যাকটেরিয়ার অ্যান্টিবডি নয়। তাই এটা পুরোপুরি পরিবেশবান্ধব। উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া অনুপ্রবেশ করা মশার ব্যবহার পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব বিস্তারকারী ও মশাকে প্রতিরোধী করে তোলা কীটনাশকের বিকল্প হিসেবে অত্যন্ত সফলভাবে কার্যকর হবে। 

এবার আসি উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারে অর্থনৈতিক সাশ্রয়ের ব্যাপারে। সংক্রমিত উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া ব্যবহারের মূল সুবিধা সাইটোপ্লাজমিক ইনকমপ্যাটেবিলিটি, যা মশার শরীরে ভাইরাসের রেপ্লিকেশনের প্রধান অন্তরায়। তাই বহুদিন পর্যন্ত মশাবাহিত ভাইরাস দমনে চমৎকার টেকসই পদ্ধতিই হলো এ বায়োকন্ট্রোল পদ্ধতি। সেপার্ড ও কলিগের এক গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ১২টি দেশে গড়ে ৯৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় হয় ডেঙ্গু রোগের ডায়াগনোসিস ও চিকিৎসার জন্য। লাতিন আমেরিকায় এ পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। সেখানে ৩ বিলিয়নের বেশি ব্যয় হয়। অধিকন্তু ডেঙ্গু আউটব্রেকের সময় ডেঙ্গু পরীক্ষা ও চিকিৎসা বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়ে যায়। এমনি এক ভয়াবহ পরিস্থিতিতে আমাদের দেশের মতো স্বল্পোন্নত বা উন্নয়নশীল দেশের প্রাইমারি ও সেকেন্ডারি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের অবকাঠামো ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কতটুকু জোগান সুবিধা আছে বুঝতেই পারছেন। এ কারণে ভুক্তভোগী রোগীরা বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালের শরণাপন্ন হলে সেখানে সরকারের বেঁধে দেয়া নির্ধারিত ফির চেয়ে বহুগুণ বেশি ফি গ্রহণ করে ভুক্তভোগীদের জীবন দুর্বিষহ করে তোলা হয়। এ উদ্বেগ দিন দিন বেড়েই চলেছে। তাই উলবাকিয়া ব্যাকটেরিয়া ইন্টারভেনশন পদ্ধতি অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও অত্যন্ত ফলপ্রসূ ম্যানেজমেন্ট পদ্ধতি হিসেবে গৃহীত হওয়া উচিত।

ড. মো. গোলাম ছারোয়ার: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, কীটতত্ত্ব বিভাগ 

জাতীয় প্রতিষেধক ও সামাজিক চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান (নিপসম)

আরও