অস্ট্রেলিয়ায় ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটিতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থীই পড়াশোনা করতে যায়। দক্ষিণ এশীয় শিক্ষকও রয়েছেন অনেক। এ কারণে ভারতীয় শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ভর্তি হওয়ার পর কারিশমা লুথরিয়াও বেশ উৎফুল্ল ছিলেন। কিন্তু সে উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ল, যখন তাকে শুনতে হলো ‘তোমার জাত কি?’
মুম্বাইয়ের মেয়ে কারিশমা লুথরিয়া কখনো স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি ভারতবর্ষ থেকে বহু দূরে অস্ট্রেলিয়াতে এসেও ব্রাহ্মণ্যবাদের দেখা পাবেন তিনি। মুম্বাইয়ের সুবিধাভোগী উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হিসেবে বর্ণাশ্রম প্রথার অভিশাপ তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। সুতরাং এ নিয়ে কখনো মাথা ঘামানোর প্রয়োজন পড়েনি তার। এমনকি নিজে কোন জাতের অন্তর্ভুক্ত সে বিষয়েও কখনো তার মনে প্রশ্ন জাগেনি।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতে ‘দলিত লাইভস ম্যাটার’ আন্দোলনের আগ পর্যন্ত বিষয়টি কখনো তার ভাবনাতেও আসেনি। তবে এ ভাবনা খুব একটা গভীরও ছিল না। এ কারণেই অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে আসার পর এমন প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বেশ আশ্চর্যই হয়েছিলেন কারিশমা লুথরিয়া। তিনি এর উত্তরও দিতে পারেননি। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক তাকে বলেছিলেন, ‘তোমার যেহেতু কখনো নিজের জাত নিয়ে মাথা ঘামাতে হয়নি, তার মানে তুমি অবশ্যই উচ্চবর্ণের’।
এবার বিষয়টি নিয়ে সত্যি সত্যিই মাথা ঘামাতে শুরু করলেন কারিশমা লুথরিয়া। অস্ট্রেলিয়ার মতো দূর দেশেও কি কারণে দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে বর্ণাশ্রম বা ব্রাহ্মণ্যবাদের চর্চা থেকে গেল, সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে লাগলেন। এ বিষয় নিয়ে যাদের নানা ধরনের সরাসরি অভিজ্ঞতা হয়ে, তাদেরও খুঁজে খুঁজে কথা বলা শুরু করলেন তিনি।
সনাতনী ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুবর্ণ ধরা হয় ব্রাহ্মণদের। এরা প্রাচীনকাল থেকে বংশানুক্রমিকভাবে পৌরোহিত্য ও ধর্মশাস্ত্রের অধ্যাপনার সঙ্গে জড়িত। প্রাচীন যোদ্ধা ও শাসকদের বংশধরদের বলা হয় ক্ষত্রিয়। বর্ণাশ্রম প্রথায় ব্রাহ্মণদের পরেই তাদের অবস্থান। এর পরের স্তরে রয়েছে বৈশ্যরা, যারা বংশানুক্রমিকভাবে কৃষি, বাণিজ্য ও ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সবচেয়ে নিচুবর্ণের মানুষ ধরা হয় শুদ্রদের। এ বর্ণের মানুষদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হয়েছে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে ‘উচ্চ তিন বর্ণের’ সেবা করার দায়িত্ব। শুদ্রদের মধ্যেও সবচেয়ে খারাপ অবস্থা দলিতদের। বংশানুক্রমিকভাবে মেথর, ডোম বা এ ধরনের পেশার কাজ করে আসা মানুষদের ধরা হয় দলিত হিসেবে।
গত শতকের শুরু থেকে বৈষম্যপূর্ণ এ প্রথার বিরুদ্ধে অনেকেই সোচ্চার হয়েছেন। তারপরেও এ প্রথার বিলোপ ঘটানো যায়নি। বরং দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বাসিন্দাদের হাত ধরে তা ছড়িয়ে পড়েছে অন্যান্য অঞ্চলেও। তামিল, পাঞ্জাবি, নেপালি, ভুটানি — দক্ষিণ এশিয়া থেকে যাওয়া প্রায় সব জাতির মানুষের মধ্যেই প্রবাসে কমবেশি এ ধরনের চর্চা দেখা যায়।
বিষয়টি নিয়ে মেলবোর্নভিত্তিক শিক্ষাবিদ ও চলচ্চিত্র নির্মাতা ড. ভিক্রান্ত কিশোরের সঙ্গে কথা বলেছেন কারিশমা লুথরিয়া। ড. কিশোর তাকে বলেছেন, দক্ষিণ এশীয়রা যেখানে গিয়েছে, সেখানেই সঙ্গে করে বর্ণাশ্রম প্রথাও নিয়ে গিয়েছে।
তার ভাষ্যমতে, অস্ট্রেলিয়ায় এখনো এমন অনেক দক্ষিণ এশীয়ের দেখা পাওয়া যায়, যারা নিজের ‘উচ্চবর্ণের’ পরিচয় নিয়ে গর্বিত। এমনকি তাদের কাউকে কাউকে গাড়ির নাম্বার প্লেটেও বিষয়টি উল্লেখ করতে দেখা যায়।
মানবসম্পদ বিশেষজ্ঞ অপর্না রামটিকে একজন দলিত বংশোদ্ভূত। বতর্মানে দলিত অধিকার নিয়ে কাজ করছেন। তিনি জানালেন, অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ এশীয়দের মধ্যে একে অপরের ‘জাত’ জানতে চাওয়ার প্রবণতা খুব বেশি। তাদের মধ্যে প্রথম পরিচয়ই হয় একে অপরের পারিবারিক উপাধি জানতে চাওয়ার মধ্য দিয়ে।
তিনি বলেন, অন্য ব্যক্তিটি আসলে কোন জাতের, এটি বোঝার জন্যই তারা পারিবারিক উপাধি জানতে চায়।
নেপালি দলিত সান কুমার গাজমির অস্ট্রেলিয়ায় আসার পর নিজের নামের শেষাংশই বদলে ফেলেছেন। স্বদেশী নেপালিদের সঙ্গে মিশতে গিয়ে যাতে জাতপাতের বৈষম্যের শিকার হতে না হয়, সেজন্যই এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
সান কুমার এখন অস্ট্রেলিয়ায় একটি ফাস্ট ফুড রেস্তোরাঁ চালাচ্ছেন। তার মনে আছে, প্রথম যখন তিনি অস্ট্রেলিয়ায় আসেন; তখন তার স্বদেশীরা প্রথম পরিচয়েই তার পারিবারিক উপাধি নিয়ে রীতিমতো হাসাহাসি করেছে।
তিনি বলেন, অনেক নেপালিকেই আমি আমার নামটি খুবই অস্বাভাবিক গলায় উচ্চারণ করতে শুনেছি। বিষয়টি বেশ বিব্রতকর। কারণ নামের এ শেষাংশ নিয়ে অনেক দুঃখজনক স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা আছে আমাদের।
সান কুমার গাজমির জানালেন, যাদের নাম এ উপাধিতে শেষ হয়েছে নেপালে তাদের অন্য কারো বাসায় ঢোকারই অধিকার নেই। অস্ট্রেলিয়াতে এসেও তাকে এ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে।
তিনি বলেন, তারা ঘরে কুকুর, বিড়াল অনেক কিছুই ঢুকতে দেয়। কিন্তু যাদের নাম এ উপাধিতে শেষ হয়েছে; সেসব মানুষকে ঘরের ভেতরে যেতে দেয়া হয় না।
অনেকটা একই অভিজ্ঞতা রয়েছে মেলবোর্নভিত্তিক চলচ্চিত্রনির্মাতা গিরিশ মাকওয়ানারও। অস্ট্রেলিয়ায় দক্ষিণ এশীয় পরিবারে বাড়িভাড়া নিতে গিয়ে বেশ বাজে পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন তিনি। তার নিজের ভাষায়, ‘বাড়িওয়ালা জানতে চাইলো, আপনি কোত্থেকে এসেছেন? আপনার জাত কি? উত্তর পাওয়ার পর তারা আমাকে অনেকটা ভদ্রভাবেই বের করে দিল’।
পরে গিরিশ মাকওয়ানা জানতে পারেন, ওই বাড়িওয়ালা আরো পাঁচ ভাড়াটেকে নিলেও শুধু তাকেই প্রত্যাখ্যান করেছে। কারণ গিরিশ মাকওয়ানা একজন দলিত।
তবে জাতপাতের বৈষম্য থেকে সুরক্ষা পেতে হলে সম্পদ বড় একটি ঢাল হিসেবে কাজ করে। এ কারণে উচ্চআয়ের পেশার মানুষ হওয়ার কারণে অপর্না রামটিকের মতো দলিত সম্প্রদায়ভুক্তদের এ নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হয় না বললেই চলে। তার নিজের ভাষায়, কারো শুধু একটি ভালো বাড়ি আর ভালো পরিবার থাকলেই হবে। কেউই তখন আর তার জাত সম্পর্কে প্রশ্ন করবে না।
ঠিক একই কারণে উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে কারিশমা লুথারিয়ারও জানার প্রয়োজন পড়েনি, বর্ণাশ্রম অনুযায়ী তার জাত আসলে কি হবে। ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির এ শিক্ষার্থী মূলত ভারতীয় সিন্ধি সম্প্রদায়ের মেয়ে। এ সম্প্রদায়ে জাতপাতের চেয়ে শ্রেণিপরিচয়ই গুরুত্ব পায় বেশি। এ কারণে তার পিতাও আসলে স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেননি। তবে কারিশমার বাবার অনুমান, বর্ণাশ্রম অনুযায়ী তারা হয়তো জাতে বৈশ্য। কারণ তাদের পরিবার ঐতিহ্যগতভাবেই ব্যবসায়ী।
উচ্চবর্ণের নেপালীরা বিশ্বকর্মা সম্প্রদায়ের মানুষকে অচ্ছ্যুত্ হিসেবে গণ্য করে থাকে। এ সম্প্রদায়ের বিরখা দিয়ালি এখন কেয়ার্নসের বাসিন্দা। কারিশমা লুথরিয়াকে তিনি বলেন, কেয়ার্নসে বর্ণাশ্রমভিত্তিক বৈষম্য অনেক বেশি। আমাদের স্পর্শ করা কোনো কিছুতে ব্রাহ্মণরা খায় না। এমনকি আমাদের তাদের বাড়িতে প্রবেশেরও অধিকার নেই।
২০১২ সালে বিরখা দিয়ালির শ্বশুরের মৃত্যু হয়। গোটা কেয়ার্নসেনর একজন পুরোহিতও সে সময় তার শ্বশুরের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া করাতে রাজি হয়নি। তিনি বলেন, আমরা ভেবেছিলাম ব্রাহ্মণ পুরোহিতরা আমাদের ঘরে না ঢুকেই এ অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার কাজ করাতে পারবেন। কিন্তু তারা তাতেও সাড়া দেয়নি। শেষ পর্যন্ত অ্যাডিলেডের একজন পুরোহিত রাজি হয়েছিলেন। তবে তিনিও কাজ সেরেছেন ফোনে নির্দেশনা দেয়ার মাধ্যমে। আমার মনে হচ্ছিল, সে সময় আমার শ্বশুরের নয় আমার নিজেরই মৃত্যু হয়েছে।
বিরখা দিয়ালির স্ত্রী পবিত্র দিয়ালির ভাষ্যমতে, এ ধরনের ঘটনা অস্ট্রেলিয়ায় বিচ্ছিন্ন নয়। তিনি বলেন, একদিন আমি এক জায়গায় উচ্চবর্ণের কয়েকজনের সঙ্গে বসে পড়েছিলাম। আমি যতক্ষণ সেখানে ছিলাম, তারা পানি পর্যন্ত স্পর্শ করতে চায়নি।
(এবিসিডটনেটে সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ভারতীয় শিক্ষার্থী কারিশমা লুথরিয়ার একটি নিবন্ধ প্রকাশ হয়। ওই নিবন্ধ অবলম্বনে)