ওই পর্বে দেখিয়েছি যারা চিকিৎসার জন্য বিদেশ ভ্রমণ করছিলেন তাদের কেউই উন্নত প্রযুক্তি নয়, বরং আস্থার খোঁজেই সীমানা অতিক্রম করছিলেন। সংগতই প্রশ্ন আসে, এ আস্থা আসে কোথা থেকে? অনেকেই সহজাতভাবে নতুন হাসপাতাল, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম এবং চিকিৎসা প্রযুক্তির দিকে ইঙ্গিত করেন। এগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাংলাদেশে এগুলোতে বিনিয়োগ অব্যাহত রাখা জরুরি। তবু চিকিৎসক এবং হাসপাতাল প্রশাসক হিসেবে কয়েক দশক কাটানোর পর, আমি বিশ্বাস করতে শুরু করেছি যে আস্থা কদাচিৎ কংক্রিট থেকে তৈরি হয়। এটি তৈরি হয় মানুষ দিয়ে।
গত কয়েক বছরে বন্ধুভাবাপন্ন দেশ বা আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বাংলাদেশে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করতে পারে—এমন ঘোষণা প্রায়ই জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক আশার সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের উদ্দীপনা বোধগম্য এবং এ উদ্যোগগুলোকে উষ্ণভাবে স্বাগত জানানো উচিত। বিদেশী বিনিয়োগ আধুনিক অবকাঠামোতে অর্থায়ন, উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি চালু করা, গবেষণায় সহায়তা এবং বিশেষায়িত স্বাস্থ্যসেবাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে মূল্যবান অবদান রাখতে পারে। তবে এ অংশীদারত্ব কী অর্জন করতে পারে, কী পারে না—এ বিষয়ে আমাদের বাস্তববাদী হওয়া উচিত। আমাদের জনসংখ্যার দৈনন্দিন স্বাস্থ্যসেবা দেয়ার জন্য বিদেশ থেকে বিপুলসংখ্যক ডাক্তার, নার্স, টেকনিশিয়ান বা অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবী আসবেন—এমনটা প্রত্যাশা করা উচিত নয়। এটি ব্যবহারিক নয় এবং সফল আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য অংশীদারত্ব সাধারণত এভাবে কাজও করে না। তাদের সবচেয়ে বড় অবদান স্থানীয় পেশাজীবীদের প্রতিস্থাপন করার মধ্যে নয়, বরং স্থানীয় সক্ষমতা শক্তিশালী করার মধ্যে নিহিত।
আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রকৃত ও দীর্ঘস্থায়ী মূল্য রয়েছে জ্ঞান হস্তান্তর, পেশাদার প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রযুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোতে কৌশলগত বিনিয়োগের মধ্যে। এ অংশীদারত্বগুলো আমাদের আরো ভালো হাসপাতাল তৈরি করতে, আধুনিক ব্যবস্থা চালু করতে এবং উদ্ভাবনকে ত্বরান্বিত করতে সহযোগিতা করতে পারে। কিন্তু তারা আমাদের নিজস্ব দক্ষ স্বাস্থ্যসেবা কর্মী বাহিনী গড়ে তোলার দায়িত্বকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না। ইতিহাস বলে কোনো দেশই আমদানীকৃত মানবসম্পদের ওপর নির্ভর করে একটি স্থিতিস্থাপক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলেনি। প্রতিটি সফল স্বাস্থ্য ব্যবস্থা তার নিজস্ব ডাক্তার, নার্স, টেকনোলজিস্ট, হাসপাতাল ম্যানেজার, জনস্বাস্থ্য পেশাজীবী এবং কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের শক্তির ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। বিদেশী অংশীদাররা আমাদের হাসপাতাল তৈরি করতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু কেবল বাংলাদেশই সেই মানুষগুলোকে তৈরি করতে পারে যারা এ হাসপাতালগুলোকে সত্যিকার অর্থে সফল করে তুলবে। সে কারণেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কেবল আরো হাসপাতাল নির্মাণ করা নয়। এটি হলো এ খাতে দক্ষ জনবল তৈরি, পেশাদার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত এবং সমন্বিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার উন্নয়ন, যা আমাদের স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের সেই নিরাপদ, সহানুভূতিশীল এবং উচ্চমানের সেবা প্রদানে সক্ষম করে তোলে, যা প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্য।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব কমই মনোযোগ পায়। ঐতিহাসিকভাবে, বাংলাদেশ হাসপাতালগুলোকে পেশাদার ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন আছে এমন একটি জটিল সংস্থা হিসেবে দেখার চেয়ে মূলত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখার প্রবণতা দেখিয়েছে। রোগীদের চিকিৎসা করা সবসময়ই প্রতিটি হাসপাতালের প্রাণ হয়ে থাকবে, তবে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়ন, লজিস্টিকস, ইঞ্জিনিয়ারিং, তথ্যপ্রযুক্তি, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ, কেনাকাটা, গুণগত মান নিশ্চিতকরণ, কর্মী বাহিনী পরিকল্পনা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য আন্তঃসংযুক্ত ব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করে। যখন এ ব্যবস্থাগুলো দুর্বল হয়, তখন সবচেয়ে প্রতিভাবান চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীও ধারাবাহিকভাবে সেবা দিতে হিমশিম খান।
বিশ্বজুড়ে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা এখন একটি স্বতন্ত্র বৈজ্ঞানিক এবং পেশাদার শৃঙ্খলা হিসেবে স্বীকৃত যার জন্য বিশেষ জ্ঞান, কৌশলগত নেতৃত্ব এবং ক্রমাগত উদ্ভাবনের প্রয়োজন। একটি আধুনিক হাসপাতাল চালানো ক্লিনিক্যাল দক্ষতার চেয়ে অনেক বেশি কিছু দাবি করে; এটি সুশাসন, আর্থিক দায়িত্বশীলতা, গুণগত মান উন্নয়ন, রোগীর নিরাপত্তা, পরিচালনগত দক্ষতা এবং একটি ক্রমবর্ধমান জটিল স্বাস্থ্যসেবা পরিবেশের মধ্যে বহুমুখী দলগুলোকে সমন্বয় করার ক্ষমতা দাবি করে। একে ক্লিনিশিয়ানদের গুরুত্ব কমিয়ে দেয়া ভেবে ভুল বোঝা উচিত নয়। উল্টো চিকিৎসকদের ক্লিনিক্যাল সিদ্ধান্ত নেয়ার কেন্দ্রে থাকা উচিত। তবে ক্লিনিক্যাল শ্রেষ্ঠত্ব এবং সাংগঠনিক নেতৃত্ব একই যোগ্যতা নয়। একজন বিশিষ্ট সার্জন বা চিকিৎসক কেবল ক্লিনিক্যাল সুনামের গুণেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একজন কার্যকর হাসপাতাল ব্যবস্থাপক হয়ে ওঠেন না। একইভাবে একজন অসামান্য স্বাস্থ্যসেবা নির্বাহী কখনই সঠিক ক্লিনিক্যাল বিচারবুদ্ধির জায়গা নিতে পারেন না। সবচেয়ে শক্তিশালী হাসপাতালগুলো ক্লিনিক্যাল নেতা এবং পেশাদারভাবে প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা পরিচালকদের মধ্যে প্রকৃত অংশীদারত্ব গড়ে তোলে, যেখানে প্রত্যেকে তাদের নিজস্ব দক্ষতার অবদান রাখেন। যখন এ ভূমিকাগুলো অস্পষ্ট হয়ে যায় বা একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়ই উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমরা যেভাবে আমাদের ক্লিনিক্যাল কর্মী বাহিনীকে শক্তিশালী এবং সম্প্রসারণ করে চলেছি, আমাদের পেশাদারভাবে প্রশিক্ষিত হাসপাতাল ম্যানেজারদের উন্নয়নেও সমানভাবে বিনিয়োগ করতে হবে। তবেই আমরা এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারব যেখানে ক্লিনিক্যাল শ্রেষ্ঠত্ব, পরিচালনগত দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং সহানুভূতিশীল রোগীর যত্ন হাত ধরাধরি করে কাজ করবে যাতে তারা যাদের সেবা করছে সেই মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে।
আমরা যেভাবে আমাদের স্বাস্থ্যসেবা কর্মী বাহিনী গড়ে তুলি তাও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। একটি এমবিবিএস ডিগ্রি দেশের অন্যতম সম্মানিত পেশাদার যোগ্যতা হিসেবে রয়ে গেছে এবং একজন সুপ্রশিক্ষিত সাধারণ চিকিৎসক দৈনন্দিন অনুশীলনে সম্মুখীন হওয়া বিশালসংখ্যক রোগ নির্ণয় ও পরিচালনা করতে সক্ষম। তবু আমাদের স্বাস্থ্যসেবা সংস্কৃতি প্রায়ই তরুণ ডাক্তারদের এ অনিচ্ছাকৃত বার্তা পাঠায় যে স্নাতকোত্তর স্পেশালাইজেশনই হলো পেশাদার স্বীকৃতি এবং সাফল্যের একমাত্র পথ। ফলস্বরূপ, অনেকেই ফ্রন্টলাইন চিকিৎসক হিসেবে তাদের ভূমিকার মূল্যের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। বাস্তবে কোনো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনাই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হতে পারে না যদি তার ভিত্তি—তরুণ ডাক্তার, দক্ষ নার্স, সহযোগী স্বাস্থ্য পেশাজীবী এবং একটি শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা—অবমূল্যায়িত থাকে। এ ভারসাম্যহীনতা শুধু চিকিৎসকদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক স্নাতক তৈরি হলেও দক্ষ গ্র্যাজুয়েট নার্স (বিশেষ করে অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও ক্রিটিক্যাল কেয়ারের জন্য), মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, প্যারামেডিক, পুনর্বাসন (রিহ্যাবিলিটেশন) পেশাজীবী, কেয়ারগিভার এবং পেশাদার হাসপাতাল ব্যবস্থাপক এখনো পর্যাপ্ত সংখ্যায় গড়ে উঠছে না। অথচ একটি আধুনিক হাসপাতাল শুধু চিকিৎসকদের ওপর নির্ভর করে চলতে পারে না।
স্বাস্থ্যসেবায় নেতৃত্ব কোনো পদবি বা ক্ষমতার নাম নয়; এটি মানুষকে একটি অভিন্ন লক্ষ্যকে ঘিরে একত্রিত করার ক্ষমতা। এটি বিভিন্ন পেশার মধ্যে সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তোলে, প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্তকে উৎসাহিত করে এবং সর্বোপরি ব্যক্তিগত বা প্রাতিষ্ঠানিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে রোগীর কল্যাণকে স্থান দেয়। সুশাসনও সমানভাবে অপরিহার্য। স্বচ্ছ নিয়োগ, মেধাভিত্তিক পদোন্নতি, ক্রমাগত পেশাদার উন্নয়ন, নৈতিক প্রকিউরমেন্ট বা কেনাকাটা, আর্থিক জবাবদিহিতা ও দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত নেয়া কোনো প্রশাসনিক বিলাসিতা নয়, এগুলো হলো সেই অদৃশ্য ভিত্তি যার ওপর জনসাধারণের আস্থা তৈরি হয়। স্বাস্থ্যসেবা দলের প্রতিটি সদস্যের প্রতি সম্মান ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ।
চিকিৎসা শিক্ষারও বিবর্তন ঘটাতে হবে। আগামীর স্বাস্থ্যসেবা পেশাজীবীদের অবশ্যই বৈজ্ঞানিক জ্ঞান এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রয়োজন হবে, তবে তাদের যোগাযোগ দক্ষতা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা, দলগত কাজ, নীতিশাস্ত্র, নেতৃত্ব এবং স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনার বোঝাপড়াও তৈরি করতে হবে। সহানুভূতিকে এখন আর কেবল ব্যক্তিগত গুণ হিসেবে দেখা উচিত নয়, এটিকে একটি পেশাদার যোগ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া উচিত। অন্যান্য জাতির অভিজ্ঞতা উৎসাহব্যঞ্জক শিক্ষা দেয়। সিঙ্গাপুর, তার সীমিত জমি এবং প্রাকৃতিক সম্পদ সত্ত্বেও, সুশৃঙ্খল শাসন, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং অটল জবাবদিহির মাধ্যমে বিশ্বের অন্যতম সম্মানিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। বাংলাদেশে প্রতিভাবান চিকিৎসক, দক্ষ সার্জন, নিবেদিতপ্রাণ নার্স, যোগ্য বিজ্ঞানী বা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ স্বাস্থ্যকর্মীদের কোনো অভাব নেই।
হাসপাতাল কংক্রিট দিয়ে নির্মাণ করা যায়। প্রযুক্তি অর্থ দিয়ে কেনা যায়। কিন্তু বিশ্বাস কেনা যায় না; তা অর্জন করতে হয়। সততা, দক্ষতা, সহমর্মিতা এবং অগণিত সহৃদয় কাজের মধ্য দিয়েই সেই বিশ্বাস ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে—যার প্রকৃত মূল্য কোনো বার্ষিক প্রতিবেদন, কোনো পরিসংখ্যান বা কোনো সূচক কখনই সম্পূর্ণভাবে ধারণ করতে পারে না। বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে প্রয়োজনীয় প্রেসক্রিপশন আর কোনো নতুন যন্ত্র নয়, আরেকটি ভবনও নয়; বরং প্রযুক্তির সঙ্গে মানবিকতার, দক্ষতার সঙ্গে সহমর্মিতার এবং চিকিৎসার সঙ্গে আস্থার পুনর্মিলন। একটি প্রাচীন চীনা প্রবাদে বলা হয়, ‘একটি গাছ লাগানোর সবচেয়ে ভালো সময় ছিল ২০ বছর আগে। দ্বিতীয় সেরা সময় হলো আজ।’ বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও কথাটি সমান সত্য। আস্থা, মানবিকতা, দক্ষ নেতৃত্ব এবং শক্তিশালী মানবসম্পদ গড়ে তোলার কাজ হয়তো আরো অনেক আগে শুরু হওয়া উচিত ছিল। তবু আজও খুব দেরি হয়ে যায়নি। হয়তো আজই বাংলাদেশের স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত পুনরাবিষ্কারের সময়।
ডা. রুবাইউল মোরশেদ: স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ, লেখক এবং উদারতা ও নৈতিক নেতৃত্ব বিষয়ের গবেষক